বঙ্গভঙ্গ থেকে ভাষা আন্দোলন- ইতিহাসের সূচনা ও সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

A historical building called Curzon Hall at Dhaka University.
A historical building called Curzon Hall at Dhaka University. Photo 159903825 © - Dreamstime.com

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ভবন কার্জন হল। যা পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি। এই ভবনটি নির্মাণ করা হয় ঢাকা কলেজের ব্যবহারের জন্য। তবে বর্তমানে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অনুষদের কিছু শ্রেণিকক্ষ পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন এটি ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন ১৯০৪ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি। বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্যে রমনা এলাকায় যেসব স্থাপনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তাদের মধ্যে অন্যতম। দানী লিখেছেন, ‘কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল টাউন হল হিসেবে’।

কলেজের পাঠাগার

কিন্তু শরীফউদ্দীন আহমদ এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন এ ধারণাটি ভুল। তার হিসাব অনুযায়ী এটি নির্মিত হয় ঢাকা কলেজের পাঠাগার হিসেবে।  নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেন ভাওয়ালের রাজকুমার। ১৯০৪ সালের ঢাকা প্রকাশ লিখেছিল_ “ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে ‘কার্জন হল’ নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন।” ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা কলেজের ক্লাসগুলো নেয়া হতে থাকে কার্জন থেকে। এরপর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে কার্জন হল অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের জন্য। যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থাপত্যের খুঁটিনাটি

পুরো ঢাকায় কার্জন হলের সমকক্ষ কোন ঐতিহাসিক স্থাপনা, এই স্থাপনার মত সম্ভবত অক্ষত আর নেই। এটি একমাত্র স্থাপনা যার প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার স্থাপনা অর্থাৎ রূপ ধরে রেখেছে। এই স্থাপনাটি তে আমরা দেখতে পাই পাশ্চাত্য ও ইসলামিক স্থাপত্য রীতির এক সুন্দর সমন্বয়। এই ভবনের উত্তরদিকে সামনের অংশের অশ্বখুরাকৃতি এবং খাঁজকাটা খিলানের অংশ প্রত্যক্ষ করলে বুঝা যায় এখানে কিভাবে ইউরোপ ও মুঘল স্থাপত্য রীতির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। ভবনটিতে লাল রং ব্যবহার করা হয়েছে মুঘল আমলের লাল বেলেপাথর এর পরিবর্তে।

আর অলংকৃত বন্ধনী, গম্বুজ বিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন, বিশেষকরে মাঝের অংশগুলি ১৫৭০ থেকে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সম্রাট আকবরের রাজধানী প্রাসাদ সমৃদ্ধ নগরদুর্গ ফতেহপুর সিক্রির ছোট কিন্তু সুপরিচিত দীউয়ান-ই-খাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুটি নগরই নতুন রাজধানী ছিল। অসুস্থ বাগান আর নির্মিত ইটের দ্বিতল ভবনের রয়েছে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় হল। বর্তমানে বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সাথে পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাশে রয়েছে সংযোজিত কাঠামো, অসংখ্য কক্ষ সমৃদ্ধ এবং চারপাশ দিয়ে বারান্দা ঘেরা।

ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী

ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে ও স্মৃতি নিয়ে কার্জন হল দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৪৮ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এখানেই ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এবং তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ এই ঘটনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে জিন্নাহর ঘোষণার প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ভাষা আন্দোলন শুরুর ইতিহাসের সাথে এভাবেই জড়িয়ে যায় কার্জন।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভবনটি শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নয় এর পাশাপাশি অন্যান্য দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে। এখানে প্রতিদিনই মানুষ এসে ভিড় করে আড্ডা দেয়, জমায়েত হয় নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সর্বক্ষণ প্রাণচঞ্চল থাকায় ভবনের পাশে রয়েছে ফজলুল হক মুসলিম হল ও শহীদুল্লাহ হল আর মাঝে এক মনোরম পুকুর স্থাপত্যটি কে দিয়েছে আলাদা আবেদন।