বঙ্গের আঞ্চলিক স্থাপত্যে কিভাবে এল ইসলামীয় প্রভাব?

বাংলাদেশে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে মুসলমান শাসনের একাধিপত্য ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের (অবিভক্ত বাংলা) শিল্পরীতির সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্য-শিল্পের একধরনের সংমিশ্রণ। বলা যায়, এই সময়ে বাংলায় কাঠামো নির্মাণের মূল গঠনভঙ্গি ছিল ইসলামি রীতি অনুসারে। আর বাইরের কারুকার্য ও কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলার লৌকিক রীতির প্রভাব চোখে পড়বে।

প্রথমেই যে বিষয়টি বলে নেওয়া প্রয়োজন ইমারতে ইটের ব্যবহার বাংলার স্থাপত্যরীতির একটি বৈশিষ্ট্য। লক্ষ্য করলে দেখতে পাব বাড়ি এবং বেশিরভাগ মন্দির ঢালু ধাঁচে প্রধানত তৈরি করা হত, এর পিছনে অবশ্য যুক্তি ছিল। বাংলাদেশে বর্ষাকালে কিংবা অন্যান্য সময়ের প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। বেশি বৃষ্টিতে জল যাতে দাঁড়াতে না পারে সেই জন্যই এই প্রকার কাঠামো তৈরি করা হয়ে থাকত। এতে ইমারতগুলোর ক্ষয় অপেক্ষাকৃত কম হত, গঠন-সৌন্দর্য বজায় থাকত অনেক বছর পর্যন্ত। এই বিশেষ নির্মাণ পদ্ধতির নাম ছিল বাংলা। অঞ্চলের নামানুসারেই যে এই ধরনের নাম দেওয়া হয়েছে তা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। পুরনো অনেক মন্দিরেরই কাঠামো এই ধাঁচেই তৈরি হয়ে থাকত সেই সময়ে। এমনই দুটি কাঠামো পাশাপাশি জুড়ে দিলে তাকে জোড় বাংলা বলা হত। 

পরে অবশ্য এই রীতির সঙ্গে নতুন রীতির অনেক সংযোজন ঘটেছে। চাল বা চালাভিত্তিক মন্দির বানানোর রীতিটি বাংলায় বহু প্রাচীন এবং এখনও এই পদ্ধতিটি অনুসৃত হয়ে থাকে। মন্দিরের মাথায় অবস্থিত চালার সংখ্যার উপর ভিত্তি করে মন্দিরগুলোর নামকরণের রেওয়াজ ছিল যেমন- একচালা, দো-চালা, আট চালা ইত্যাদি। আবার পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পাই ইসলামীয় স্থাপত্যের ধাঁচে চালাগুলোর মাথায় কোনটাতে খিলান, কোনটাতে আবার গম্বুজ যুক্ত করা হয়েছে।

আমরা বলতে পারি বাংলার গৌড় এবং পাণ্ডুয়াকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক স্থাপত্য বিকাশের প্রবণতা বেড়েছিল। এই স্থাপত্য এবং শৈল্পিক নিদর্শনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ঠিক কতগুলো অবিকৃত এবং অবশিষ্ট রয়েছে সেটাই এখন প্রশ্ন। বর্তমানে টিকে থাকা ইমারতগুলোর মাঝে পানডুয়ার একলাখি মাজারকে বাংলায় ইসলামী স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সবচেয়ে প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়। সম্ভবত, হুগলি জেলার মোল্লা সিমলার একটি ছোট মসজিদ এখলাখি মাজার থেকেও প্রাচীন। নির্মাণকাজ সম্ভবত ১৩৭৫ সালে শুরু হয়েছিল। একলাখি মাজারে এমন কিছু বিষয় চোখে পড়ে, যার সঙ্গে বাঙালি স্থাপত্যের মিল আছে। যেমন, ঈষৎ বক্র কার্নিসের ব্যবহার, বৃহৎ গোলাকার বাট্রেসের ব্যবহার এবং বাঁকা টেরাকোটা ইট দিয়ে ইমারত সাজানো। এরকম স্থাপত্যশৈলী ছোট সোনা মসজিদেও (আনুমানিক ১৫০০) দেখা যায়, যেটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে পাথর, যেটি বাংলায় কদাচিৎ দেখা যায়। কিন্তু, মসজিদটির স্থাপত্যরীতি ও গম্বুজের মিশ্রণ গ্রাম বাংলার কুঁড়েঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়। পরবর্তীতে এই রীতির ব্যবহার দেখা যায় হিন্দু মন্দিরেও। এই মন্দিরগুলোর বেশিরভাগ দেওয়ালে পোড়ামাটির বা টেরাকোটার কাজ চোখে পড়বে। বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরেই শুধুমাত্র নয় টেরাকোটার কাজ ছড়িয়ে রয়েছে অন্যান্য অঞ্চলে।

বিস্তৃত আলোচনার জন্য বাংলায় ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসকে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি।

প্রথম পর্যায়- এই সময়পর্বে (১২০১-১৩৩৯ খ্রি) বাংলার রাজধানী গৌড় ছিল। ত্রিবেণীতে জাফর খানের সমাধির ভগ্নাবশেষ এবং বসিরহাট অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্তূপ ছাড়া আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই। সুতরাং এই সময়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন অনেক কম।

দ্বিতীয় পর্যায়- দ্বিতীয় পর্যায়ের সময় ১৩৩৯-১৪৪২খ্রি পর্যন্ত। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের মধ্যে আমাদের চোখে পড়বে মালদয়ের পাণ্ডুয়ায় সিকান্দর শাহের বানানো আদিনা মসজিদ। যার কথা আমরা আগেই বলেছি। এইখানে আর কয়েকটি তথ্য উল্লেখ করা হল। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৪০০ ফুট ও ১৩০ ফুট । মসজিদের উপরের অংশের খিলান ও গম্বুজ প্রধানত ইট দিয়ে তৈরি। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে – মুসলিম স্থাপত্যের প্রথম পর্যায়ের উপকরণ গুলি হিন্দু স্থাপত্য থেকে নেওয়া হয়েছে । আদিনা মসজিদের সামনের উপ কাঠামো নির্মাণের পাথর বা দেওয়ালের অভ্যন্তরে খোদাই করা পাথর, মূর্তি ইত্যাদি অন্য কোন স্থাপত্য থেকে নেওয়া হয়েছে। এইভাবেই ইসলামিয় স্থাপত্যের সঙ্গে কখনও হিন্দু স্থাপত্যশৈলী কখনও আবার এর ঠিক বিপরীত ধারাটি ধরা পড়ছে বিভিন্ন শিল্পকৃতিতে, উভয়ের মধ্যে একধরনের অভূতপূর্ব সহাবস্থান চোখে পড়ে। এছাড়াও হুগলি জেলাতে ছোট পাণ্ডুয়ার মসজিদ ও মিনার এবং গৌড়ের শেখ আকি সিরাজের সমাধি এই সময়কালের স্থাপত্যশিল্পের গৌরবময় নিদর্শন। 

তৃতীয় পর্যায়ের (১৪৪২-১৫৩৯) স্থাপত্যশৈলীতেও ইন্দো-ইসলামীয় প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাণ্ডুয়াতে সুলতান মহম্মদ শাহর সমাধি এই ধাঁচে তৈরি। উচ্চায় বেশি নয়। বরং টেরাকোটার গম্বুজ ও অর্ধগোলাকৃতি আকৃতির জন্য এটি বাংলার উন্নত ইন্দো-ইসলামিয় স্থাপত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। বরবকশাহের সময়ে নির্মিত গৌড়ের দাখিল দরওয়াজাকেও এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাঁতিপাড়া মসজিদ, গুম্মত মসজিদ ও লোটান মসজিদও এই সময়ে তৈরি হয়েছে। স্থাপত্যকলায় নির্মিত অন্যান্য ইমারতগুলো হল নয় গম্বুজ মসজিদ, ষাট গম্বুজ মসজিদ,  (১৪৫৯ সালে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন) এবং মসজিদের শহর বাগেরহাটের অন্যান্য ইমারতগুলো।বাগেরহাট হল একটি পরিত্যক্ত শহর, যেটি জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিভাগের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্গত। এইসব ইমারতগুলো কিছু স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যেমন, প্রচুর দরজা ও মিহরাবের ব্যবহার। ষাট গম্বুজ মসজিদে ২৬ টি দরজা বিদ্যমান (১১ টি সামনে, ৭ টি করর দুই পাশে এবং একটি পিছনে)। এটি মাসজিদটিতে আলো ও বাতাস প্রবেশ বাড়িয়েছে। ১৪৮৮ সালে তৈরি ২৬ মিটার দৈর্ঘ্য ফিরোজ মিনারের কথাও উল্লেখ করতে হয়। ইট ও টেরাকোটার কাজ ছাড়া এই মিনারটি সাদা ও নীল রং-এর চকচকে টালি দিয়ে অলংকৃত। এই প্রসঙ্গে আরও একটি জিনিস উল্লেখ করতে হয়, ১৫২৬ সালে তৈরি বড় সোনা মসজিদ গৌড়ের সবথেকে বড় মসজিদ। 

(তথ্যবহুল এই প্রতিবেদনটি পড়ার শেষে পাঠকেরা অবশ্যই মন্দির এবং মসজিদগুলোর নির্মাণ কাজ দেখতে পারেন, সেখানে অবশ্যই চোখে পড়বে দুটি শিল্পরীতির পারস্পরিক সহাবস্থান)

তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক অন্যান্য মাধ্যম