বন্ধুত্বে ব্রেক-আপ? বন্ধুবিচ্ছেদের যন্ত্রণা লাঘব করবেন কী উপায়ে?

পরিবার Contributor
break-up-breakup-broken-14303

জীবনের এক একটা মোড় এমন আসে যখন খুব প্রিয় বন্ধুর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় আমাদের। পরিবারের বাইরের অনেক মানুষ আমাদের কাছে হয়ে ওঠে, পরিবার থেকে তাঁদের আর আলাদা করা যায় না। কিন্তু নিয়তির ফেরে অনেকেরই সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয় না। হয় দুজনের ভাবনা চিন্তার পরিসর আলাদা হয়ে যায়, অথবা মতান্তর মনান্তরে পরিণত হয়। জীবন থেকে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ চলে গেলে অপরিসীম শূন্যতা তৈরি হয়। আল্লা’তালার বাণী স্মরণ করেই সেই শূন্যতা থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি।

বিচ্ছেদের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ

কোনও কারণ ছাড়া বন্ধুবিচ্ছেদের যন্ত্রণা অত্যন্ত গভীর। আমরা যখন কারোর বন্ধুত্ব স্বীকার করি বা কাউকে বন্ধু বানাই তখন হৃদয়য়ের অন্তঃস্থল থেকেই তাঁর প্রতি ভালবাসা ও শুভকামনা থাকে। আমরা জীবনের পথে তাকে নিয়ে চলতে চাই, জীবনের ছোট ছোট আনন্দ দুঃখ ভাগ করে নিতে চাই। এমনকি আল্লা’তালার প্রতি আমাদের বিশ্বাসের ভাগীদারও আমরা করতে চাই সেই বন্ধুকে।

আল্লাহ আমাদের ভাবনা চিন্তা এরকমভাবেই তৈরি করেছেন, এভাবে মানুষকে ভালবাসার ক্ষমতা আসলে তাঁরই দান। সুতরাং, দুঃখ বা শূন্যতার মধ্যে এটা বুঝতে হবে এই ঘটনার পিছনের আল্লাহর কোনও মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। একজন সহি মুসলমান মাত্রই জানা উচিৎ যে আল্লাহর দেখানো পথেই বান্দা রিজিক প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ চান তাঁর প্রত্যেক উপাসক এই পথ একা পার করুন, কারণ জীবনের কিছু কিছু যুদ্ধ একদম একা লড়তে হয়। জীবনে যখন এই পথে পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয় তখন আল্লাহ সচেতন ভাবেই আমাদের প্রিয় বন্ধুর থেকে আমাদের আলাদা করে দেন।

এছাড়াও অনেকসময় এমন হয় যে আপাত দৃষ্টিতে আমরা যাকে বন্ধু মনে করি সে হয়ত পরবর্তীকালে আমাদের জীবনে কোনও ক্ষতি করতে পারে। মহান আল্লাহ ভবিষ্যতদ্রষ্টা, তাই জন্যই আমাদের জীবন থেকে সেই বন্ধুকে বা বন্ধুদের তিনি সরিয়ে নেন। এক ভাবে দেখলে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় আমাদের জীবনের একটি ঘটনাও আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত হয় না। আমরা যখন একা আল্লাহর উপাসনার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করি তখন আমাদের অন্তরে সঠিক বিশ্বাস, অনুভূতি, ধর্মপথে জীবন যাপনের ইচ্ছা ও যা আমাদের ধর্মে হারাম তার থেকে সরে আসার পবিত্র ইচ্ছা জেগে ওঠে। অর্থাৎ এটা বলা যায়, চলার পথে একা হয়ে যাওয়া আসলে আল্লাহর আশীর্বাদের সমান।

আল্লাহ নির্দেশিত পথে যদি আমরা ভাবি তাহলে একজন সহি মুসলমান ও তার প্রিয় বন্ধুর সম্পর্কের দুটি দিক দেখা যায়,

প্রথম,

সেই মানুষটি নিজে।

দ্বিতীয়,

সেই মানুষটির সঙ্গে তার বন্ধুর সম্পর্কের মাত্রা। এই দুই দিকের উপর নির্ভর করেই বন্ধুবিচ্ছদের যন্ত্রণা সামলানো যায়।

এই ব্যাপারে মহান আল্লাহ আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

প্রথমত,

নিজের ধর্ম বিশ্বাসের উপর নজর দিতে হবে। শুধু ধর্ম বিশ্বাস নয়, জাগতিক পরিবেশের প্রতি বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর নজর দিতে হবে। যেকোনো সন্দেহ বা ধন্দের সময় আল্লাহর বাণী স্মরণ করতে হবে। প্রাত্যহিক কুরআন পড়ার অভ্যাস করতে হবে। দিনে পাঁচ বার নমাজ আদায় করলে আল্লাহর বরকত আপনার উপর বর্ষিত হবে। তবে, সকাল ও বিকাল আথকার ভুলে গেলে দিনে পাঁচ বার নমাজ পড়ার সুফল অতটাও জোরদার হবে না। নবী রসুল সাঃ-র মতে, ‘আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১)

দ্বিতীয়ত,

বন্ধুবিচ্ছেদের বিষয়ে প্রথমেই যেটা ভাবতে হবে তা হল জীবনের সমস্তকিছু একরকম থাকে না। আমাদের জীবন আসলে সরাইখানা, এখানে মানুষ আসে, দু মুহূর্ত বিশ্রাম করে এবং আবার চলে যায়। তাই কোনও মানুষের উপর নিজের ভাল থাকার ও আনন্দের বরাত দিলে শেষ পর্যন্ত কষ্টই পেতে হয়। তাই যে মুহূর্তে আপনি অনুভব করবেন যে আল্লাহর থেকেও কোণও মানুষ আপনার প্রিয় হয়ে উঠছে, সে মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে আহস্রয় নেবেন। কারণ জীবনের পথে আল্লাহই আপনার হাত কখনও ছাড়বেন না।

তৃতীয়ত,

বন্ধুবিচ্ছেদের যন্ত্রণার সুরাহা হাত ছেড়ে দেওয়া বন্ধুর কাছ থেকে আসবে না, বরং স্বয়ং আল্লা’তালাই আপনার যন্ত্রণার উপশম করবেন। আল্লাহর কাছে মনের শান্তি প্রার্থনা করুন, আল্লাহর সেবক হিসেবে নিজেকে নিয়োগ করুন। দেখবেন আল্লাহর অপরিসীম করুণা আপনার উপর বর্ষিত হচ্ছে।

চতুর্থত,

পৃথিবীর সমস্ত মানসিক যন্ত্রণার শান্তিস্থল কুরআন। মনের সব প্রশ্ন , অশান্তি, সবকিছুর উত্তর আল্লাহর কৃপায় কুর-আনের পাতা উল্টোলেই পাওয়া যায়। কুরআনের আশ্রয় নিন। কুরানের কাছে সমর্পণ করা মানে আল্লাহর কাছেই সমর্পণ করা।

পঞ্চমত,

বন্ধুবিচ্ছেদের মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন, তবে সেই পদ্ধতিতে নিজেকে কখনও দোষারোপ করবেন না। চেষ্টা করুন যদি বন্ধু আলোচনা করতে চায়, যদি সে রাজি না হয় তাহলে সম্পর্কটি শেষ হিসাবে স্বীকার করে নিলেই আপনার পক্ষে ভাল।

ষষ্ঠত,

বন্ধু বিচ্ছেদের পিছনে গুনাহর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আল্লাহ বলেন, বন্ধুবিচ্ছেদের পিছনে কোনও এক বন্ধুর অসৎ উদ্দেশ্যই কারণ হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘সৎ সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে আতর বিক্রয়কারী এবং কামারের হাপরের ন্যায়। আতর ওয়ালা তোমাকে নীরাশ করবে না; হয় তুমি তার কাছ থেকে ক্রয় করবে কিংবা তার নিকট সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাপর, হয় তোমার বাড়ি জ্বালিয়ে দিবে, নচেৎ তোমার কাপড় পুড়িয়ে দিবে আর নাহলে দুর্গন্ধ পাবে।’ (বুখারী, অধ্যায়, ক্রয়-বিক্রয়, নং২১০১)

শেষ পর্যন্ত এটা মনে রাখা উচিৎ যে মহান আল্লাহ আমাদের ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন, তাই আমাদের প্রিয় বন্ধু আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না।