পরিবার পরিকল্পনা কীভাবে করবেন বর্তমান সমাজে?

কুরআন ২০ জুন ২০২০ Contributor
পরিবার
© Odua | Dreamstime.com

আজকের যুগ ছোট পরিবারের যুগ। এখনকার দিনে একান্নবর্তী পরিবার বা একাধিক সন্তানের ধারণাগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কারণগুলোও স্বাভাবিক, পিতা মাতা দুজনেই আজ পরিবারের আর্থিক দায়ভার গ্রহণ করেছে, অফিস যাচ্ছে অথবা বাড়িতেই কাজ করছে। ছেলে মেয়েদের সামলানোর সময় বড় কম তাই একাধিক সন্তান তো দূরের কথা একটা সন্তানের কথা ভাবতেও কষতে হয় হাজারটা অঙ্ক। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা জিনিসপত্রের মূল্য স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত মানের জীবনকেও বেশ খরচসাপেক্ষ করে তুলছে, এতে একজনের আয়ে সংসার চলা সম্ভব নয় তাছাড়া নারীদের মধ্যেও আত্মনির্ভর হওয়ার আকাঙ্খাও উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবার পরিকল্পনার সহজ পাঠঃ

এই অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিমরা এই বিষয়ে এসে কিছুটা ইতস্তত বোধ করেন। ইসলামে পরিবার পরিকল্পনা হালাল বা জায়েজ কিনা, যদি জায়েজ হয় তাহলে কোন পদ্ধতি জায়েজ তা নিয়ে অনেকেই সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারেন না।

গত বছর নভেম্বরে জার্মান রেডিও ডয়েচলান্ডফুঙ্ককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জন্মহার কমিয়ে আনায় বাংলাদেশের দুর্দান্ত সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন জার্মান মন্ত্রী গ্যার্ড ম্যুলার। তিনি বলেন গত পাঁচ দশক ধরে ১৬ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি এক্ষেত্রে উদাহরণ। যা থেকে শিক্ষা নিতে পারে আফ্রিকার দেশগুলি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিবার পরিকল্পনায় উৎসাহ দেওয়া হয়। তবে ইসলামের আলোকে এই পন্থা কতটা যুক্তিযুক্ত সে সাপেক্ষেও বক্তব্য রাখা হয়েছে।

‘আলফাতওয়াহ’ গ্রন্থের লেখক এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেক্টর আলেম ইমাম শেখ মাহমুদ শালতুত বলেছেন, অস্থায়ী পদ্ধতিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ আবার স্থায়ীভাবে করাও জায়েজ যদি সামাজিক বা প্রাকৃতিক কারণ প্রতিকূল হয়।

ফাতওয়াঃ

মালয়েশিয়ার জাওহার- এর মুফতি আলহাজ আব্দুল জলীল এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত ফাতওয়াটি প্রদান করেন।
“ স্থায়ী পদ্ধতি ছাড়া ঔষধ কিংবা গর্ভনিরোধক উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে জন্মবিয়ন্ত্রণ করা জায়েয। যদি দু’জন অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেন তাহলে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণও জায়েয”।

আল্লামা ইউসুফ আল-কারদাবী বতমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ মনীষীর গ্রহণযোগ্য একটি বিখ্যাত কিতাব “আল্ হালালু ওয়াল হারামু ফিল ইসলাম” (পৃষ্ঠা: ২৬০-২৬৫) থেকে আলোচ্য প্রশ্নের উত্তর এখানে উদ্ধৃত করা হল—

যে অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা জায়েয—

বিশেষ প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ জায়েয হতে পারে। একটি প্রয়োজন হচ্ছে, মায়ের জীবন বা স্বাস্থ্যের ওপর যদি রোগ বা প্রসবকালীন সংকটের দরুণ হুমকি দেখা দেয়, তাহলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এ সংকট বা হুমকির কথা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানা যাবে, কিংবা কোন বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিদ তা বলে দেবে। আল্লাহ্ নিজেই বলেছেন—
“ তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না (সুরা -২, আয়াত ১৯৫ )।

অন্যত্র তিনি বলেছেন—
“তোমরা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অতীব দয়াবান (সুরা -৪, আয়াত -২৯) ।

পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রধানত তিনটি শর্তকে মাথায় রাখতে হয়।

জননীর স্বাস্থ্য

সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য প্রধান হলো জননীর স্বাস্থ্য। গর্ভে সন্তান ধারণ করার জন্য স্বাস্থ্য হওয়া উচিত উত্তম, সমস্ত প্রকার শারিরীক গুণে সমৃদ্ধ। তা না হলে গর্ভধারণ কালে, প্রসবের সময় বা তারপরে জননী অসুস্থ হয়ে পরতে পারে, প্রাণসংকটও অস্বাভাবিক নয়। একই ভাবে নবজাতকের স্বাস্থ্যও খারাপ হতে পারে, অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার হওয়া সম্ভব। এই অবস্থা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অস্থায়ী বা স্থায়ী গর্ভনিয়ন্ত্রণ করতে হব। কারণ আল্লাহতায়ালা অবশ্যই চাইবেন না স্বেচ্ছায় আপনি নিজেকে বা নিজের পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করুন।

এ ক্ষেত্রে শিশুর স্বাস্থ্যর কোথায় মাথায় রাখতে হবে, দৃগ্ধপোষ্য শিশুর  মায়ের আবার গর্ভসঞ্চার হলে শিশুর পক্ষে তা ক্ষতিকর হতে পারে। তখন মায়ের দুধের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ফলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে।

নবী করীম (স.) উম্মতের জন্যে সামষ্টিকভাবে কল্যাণকর কার্যাদি করার হিদায়াত দিতেন। আর যে সব কাজের ফলে উম্মতের ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশংকা করতেন, তা পরিহার করে চলতে বলতেন।

আধুনিক কালের গর্ভ্ বন্ধকরণে যেসব নব উপায় বা পন্থা উদ্ভাবিত হয়েছে তা প্রয়োগ ও ব্যবহার করে কল্যাণের দিকটার সংরক্ষণ সম্ভব। আর রাসূলে করীম (সা.) তা-ই চেয়েছিলেন। অর্থাৎ দুগ্ধপায়ী শিশুকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো। আর দুগ্ধ সেবনকালে স্ত্রী সঙ্গম নিষিদ্ধকরণে যে বিপর্যয় ঘটার আশংকা, তা থেকেও তিনি উম্মতকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

নবী করীম (সা.) নারীদের অধিকারের ওপর সে সময়ই এতটা গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, যখন দুনিয়ার মানুষ নারীর অধিকার বলতে কোন বস্তুর সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে, পরিবার পরিকল্পনা ইসলামী শরীআতে জায়েয। আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হাদীস থেকে দেখা যায়—-
“তোমরা তোমাদের সন্ত্রানদের গোপন পন্থায় ধ্বংস করবে না”।

অর্থনৈতিক সমস্যা

সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার লালনপালন এবং সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা পিতামাতার আবশ্যিক কর্তব্য। এখানে কোনো ফাঁকি চলবে না। যদি কারও সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয় অথবা সে কোনো সমস্যায় পরে সন্তানের জন্য সুবন্দোবস্ত করতে, তাহলে তা না করাই উচিত। বৈষয়িক অসুবিধা, সমস্যা ও অনিশ্চয়তা – অসহায়ত্বের ফলে মানুষ সন্তানাদির কারণে হারাম জিনিস গ্রহণ ও অবৈধ কাজে লিপ্ত হওয়ার পরিণতি দেখা দিতে পারে। আল্লাহ বলেছেন—
“ আল্লাহ্ তোমাদের সহজ স্বচ্ছলতা কামনা করেন এবং তিনি কষ্ট ও কাঠিন্য কামনা করেন না” (সুরা-২, আয়াত-১৮৫) ।

“ আল্লাহ্ তোমাদের উপর সংকীর্ণতা বা অসুবিধা চাপিয়ে দিতে চান না” (সুরা -৫, আয়াত-৬)।

সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অবস্থা

বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশের জনঘনত্ব চোখ কপালে তোলার মতো। বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১২৬৫ জন মানুষ বসবাস করেন যা প্রশাসন বা স্বাস্থ্য কোনো দিক থেকেই আশার কথা বলে না। যার জন্য সরকার থেকে দুটি সন্তানের নীতি নিয়েছে এতে জনসংখ্যায় নিয়ন্ত্রণে থাকবে আবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রত্যেকে সুযোগ পাবে।

প্রত্যেকেরই এই নীতি মেনে চলা উচিত, এতে যেমন নিজেরাও স্বচ্ছলতার সাথে বাঁচতে পারবে তেমন দেশের পক্ষেও তা সুখকর হবে।