বসরা থিয়েটার: যা নাট্যকেন্দ্র থেকে হয়ে উঠেছিল ইসলামী দুর্গ

মধ্য প্রাচ্য ১৪ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
বসরা থিয়েটার
Ancient Roman time town Bosra in Syria. Theater details. © Walther.k | Dreamstime.com

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৮০০ বছরের রোমান শাসনের অন্যতম নিদর্শন হল বসরা থিয়েটার। এককালে আরবি রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল বসরা। শুধু তাই নয়, মক্কায় পবিত্র হজে যাওয়ার রাস্তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই শহর। সেই কারণেই, বসরা থিয়েটার রোমান ও ইসলামী স্থাপত্যের এক অনুপম নিদর্শন হয়ে রয়েছে।

বসরা থিয়েটার ও তার ইতিহাস

প্রাথমিকভাবে বসরা শহর নাবাতিয় রাজবংশের শাসনের অন্যতম প্রধান শহর ছিল। এই নাবাতিয় রাজবংশের রাজধানী ছিল পেত্রা, যা ইসলামী স্থাপত্যের এক নিখুঁত উদাহরণ। ২ অব্দে রোমান শাসক ত্রাজান নাবাতিয় সাম্রাজ্যের দখল নিলে বসরা সিরিয়ার রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী হয়ে ওঠে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ত্রাজান বসরাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। মধ্য প্রাচ্যের মরুভূমির বুকে তিনি তুলে আনতে চেয়েছিলেন একটুকরো রোমকে। আর সেই প্রয়াস দেখা যায় এই থিয়েটার ও অন্যান্য স্থাপত্যে।

সম্রাট ত্রাজান এই থিয়েটার স্থাপন করেছিলেন কারণ তিনি বসরাকে রোমের মত সংস্কৃতি মনস্ক করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর শাসনেই বসরাতে নাট্য ও সঙ্গীতের এক অনবদ্য জোয়ার আসে। নাবাতিয়দের শাসনকালে রাজ্যবিস্তারের প্রতি ঝোঁক ছিল বসরার মানুষদের। কিন্তু ত্রাজানের শাসনে তাঁরা নিজেদের অন্তরের সৌকর্য সম্পর্কে অবহিত হয়।

ইসলামের সূচনা

বাইজান্টিয়াম শাসনের সময় বসরা থিয়েটারের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর কারণ, তৎকালীন চার্চের বক্তব্য ছিল নৃত্য গীত ও নাট্যচর্চা অনুচিত। এরপরেই সপ্তম শতকে পারস্যের সাসানিয় সাম্রাজ্য দখল করে এই শহর।

যদিও পরবর্তীতে রোমানরা এই অঞ্চল পুনরায় দখল করে, কিন্তু তা অল্প সময়ের জন্য। অতঃপর ৭৫০ অব্দে এখানে মহান আব্বাসীয় বংশের রাজত্ব শুরু হয়। এই সময়েই বসরা থিয়েটার ও অন্যান্য বেশ কিছু রোমান স্থাপত্যকে দুর্গে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দামাস্কাস ও বসরা সংযোগকারী রাস্তাকে রক্ষা করার জন্য যে রক্ষাকারী দুর্গসমূহ বানানো হয়েছিল, বসরা থিয়েটার তার মধ্যে অন্যতম। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শহর ধ্বংস হয়ে গেলেও বসরা থিয়েটার এখনও অটুট।

বসরা থিয়েটার ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ নাট্যচর্চাকেন্দ্র 

সিরিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমে আধুনিক বসরা শহরের বাইরে অবস্থিত এই থিয়েটার। এটির ক্ষেত্রফল প্রায় ৩১০ ফুট বা ১০০ মিটার। এককালে, যখন এখানে নাট্যচর্চা হত, একেবারে ১৫০০০ লোক এখানে বসে তা দেখতে পারত। ঐতিহাসিক ও প্রত্নবিদদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এর থেকে বৃহৎ থিয়েটার আর একটিও নেই।

ব্যাসল্ট পাথরের তৈরি এই থিয়েটারের স্থাপত্য এক্কেবারে রোমান স্থাপত্যের মতো। কিন্তু পার্থক্য হল, রোমান স্থাপত্য সাধারণত শ্বেতপাথরের তৈরি হয়। বসরা থিয়েটারের পাথরের রং কালো ও ছাই। এছাড়া এটি তৈরি করতে কংক্রিটেরও ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যন্য রোমান থিয়েটারের সঙ্গে বসরা থিয়েটারের পার্থক্য এটাই যে এটি অষ্টকোণী নয়। অর্থাৎ আধুনিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। বরং, প্রাচীন হেলেনিয় স্থাপত্যের মতো এটি অর্ধগোলাকৃতি।

স্টেজের পিছনের দেওয়ালটি প্রায় তিন তলা সমান উঁচু পাথরের থাম দ্বারা গঠিত। প্রসেনিয়াম স্টেজের একেবারে এক প্রান্তে। আর যে পোডিইয়ামের উপর প্রাচীন নাট্যশিল্পীরা অভিনয় করতেন, এখনও থিয়েটারে পা রাখলে তা দেখা যায়।

থিয়েটারের বিবরণ

থিয়েটারটি মূলত তিনভাগে বিভক্ত। এই তিনটি অংশ যথাক্রমে, অডিটোরিয়াম, স্টেজ বা পোডিয়াম ও বসার সিঁড়ি। রোমানরা তাঁদের স্থাপত্য সবসময় সমতলভূমির উপর তৈরি করত। বসরা থিয়েটারও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁদের স্থাপত্যরীতি অনুসারে তাঁরা এই থিয়েটারের ছাদও খোলা রেখেছিল, কিন্তু মুসলমান শাসকরা এটিকে সামরিক কেন্দ্র বানানোর পর ছাদ ঢেকে দেওয়া হয়।

বর্তমানে, এই থিয়েটার দ্বাদশ শতকের আয়ুবিদ সাম্রাজ্যের এক দুর্গের সন্নিহিত। আয়ুবিদ শাসকের মিলিটারি কেন্দ্রে এটি দুর্গের মূল অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হত।

বর্তমানে বসরা শহরটিকে হেরিটেজ তকমা দেওয়া হয়েছে। ২০১১ এর গৃহযুদ্ধের সময় এই শহরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ থেকে আবার দর্শকের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এই বিখ্যাত বসরা থিয়েটার।