শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

বস্তুবাদে সায় দেয় না ইসলাম: একটি আলোচনা

pepi-stojanovski-MJSFNZ8BAXw-unsplash
Fotoğraf: Pepi Stojanovski-Unsplash

অষ্টাদশ শতকে লেখা ওয়েলথ্ অব নেশনস- গ্রন্থে পুঁজিবাদকে সর্বপ্রথম বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করেন অ্যাডাম স্মিথ। পুঁজিবাদের পিছন পিছন আসতে থাকা সাম্রাজ্যবাদ, যাকে লেনিন পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর বলেছেন, এরও প্রধান প্রবক্তা তিনিই ছিলেন। সেই কুখ্যাত সাম্রাজ্যবাদ যার রক্তমাখা হাতে আধুনিক দুনিয়ার উন্নত দেশগুলির অর্থনীতির চাকা প্রগতিশীল। কিন্তু প্রশ্ন হলো সারাবিশ্বকে গ্রাস করলেও ইসলামিক দুনিয়ায় এটি কতটা গ্রহণযোগ্য? পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধর্ম হিসেবে মুসলিম প্রভাব যেকোনো বিষয়েই প্রাধান্য পায়। সেই সূত্রেই খুরশিদ আহমেদের লেখা The Challenge of Global Capitalism: An Islamic Perspective বইটির সাহায্যে পুঁজিবাদ ও ইসলামের মৌলিক সাদৃশ্য ও পার্থক্যের কিছু আলোচনা করা যাক।

আহমেদ পুরো বিষয়টিকে পর্যালোচনা করে বলেছেন, পুঁজিবাদিদের এই ব্যাপক প্রসার, স্বেচ্ছাচারিতা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকের শোষণ ও সর্বোপরি সামগ্রিক নৈতিকতার উপর যে লাগামছাড়া প্রভাব তা যেনতেন প্রকারেন কমাতে হবে। নাহলে শুধু যে শ্রমিক তার শ্রমের দাম পাবে না তাই নয়, চূড়ান্ত আর্থিক বৈষম্য, সামাজিকতা, মানবিকতা, নৈতিকতা সবই হ্রাস পাবে।

শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপের অর্থনীতি নির্ভর করত সেই পুরোনো ভূমিদাস প্রথা, সামন্তব্যবস্থা ইত্যাদিতে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে কলকারখানা গড়ে উঠল, শ্রমব্যবস্থা সৃষ্টি এবং সমাজে সৃষ্টি হলো শ্রমিক ও মালিক শ্রেণী। কার্ল মার্কসের ভাষায় যাদের বলা হয় বুর্জোঁয়া ও প্রলেতারিয়েত। এই প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা মানুষরা কলকারখানায় মালিক শ্রেণীর জন্য সম্পদ সৃষ্টি করতে থাকে। সরকার স্বীকৃত ব্যক্তিগত মালিকানার জোরে এই মালিকদের কাছে সবই হয়ে যায় সহজলভ্য। এর সাথে আসে প্রযুক্তি যা শ্রমের মূল্য আরও কমিয়ে দেয়। সবমিলিয়ে সমাজব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হলেও পুঁজিবাদ মানবাধিকার ও জীবনধারণের নূন্যতম প্রয়োজনগুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এর পিছনে সরকার ও রাজনীতির হস্তক্ষেপ পরিষ্কার ছিল।

আহমেদের মতে পুঁজিবাদের এই উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি সমাজে যে চরম অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করছে তা আত্মঘাতী হতে পারে। হয়তো অজ্ঞাতেই খুরশিদ উদ্দেশ্য করছেন মার্কসেরই বিপ্লব তত্বকে যা বলেছিল, ক্রমাগত নিপীড়নের দ্বারা শ্রমিকশ্রেণী বিপ্লব করবে এবং সৃষ্টি হবে নতুন সমাজ। আহমেদ যুক্তিতে বলেন, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেও পিছনে ফেলে চলে যাচ্ছে কোটিপতিদের দরজায়। ফলত কোটিপতিরা স্বর্গসুখে বসবাস করলেও, গরীব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সামর্থ্য দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে মালিক শ্রেণীকে উৎপাদন করতে হচ্ছে আরও কম মূল্যের দ্রব্য, তারমানে শ্রমিকের পাওনাও কমে যাচ্ছে। এই সামগ্রিক নড়বড়ে ব্যবস্থায় শ্রমিক অভ্যুত্থান অবশ্যম্ভাবি হয়ে পরে। যুক্তি হিসাবে এটা কতটা অকাট্য তা ভবিষ্যৎ প্রমাণ করবে।

এবার আসা যাক ইসলামীয় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে। পুরো পুঁজিবাদি ব্যবস্থাই দাঁড়িয়ে আছে যে দর্শনের উপর তার নাম বস্তুবাদ, এবং ইসলাম একটা ধর্ম হিসাবে ভাববাদী। অর্থাৎ গোড়াতেই গন্ডগোল। ইসলামীয় অর্থব্যবস্থা ব্যবসার ক্ষেত্রে স্পষ্টীকরণ করে দিয়েছে যেখানে শোষণ এমনকি সুদ ব্যবস্থাও হারাম। যে পুঁজিবাদি মালিকশ্রেণী ভাবে তারাই সর্বশক্তিমান এবং সমস্ত নিয়মের সৃষ্টিকর্তা তাদের ইসলামে জায়গা নেই। ইসলাম বলে সমস্ত সম্পদই মহান আল্লাহের এবং তুমি তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে এই সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছো। অর্থের সমবন্টনের জন্য ইসলামে জাকাত ও গরীবকে সাহায্য করার জন্য ফিতরা ও সদকা ব্যবস্থা আছে ইসলামে। এটা স্বাভাবিক যে ধর্ম মতে কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চললে তা মুনাফার চেয়ে জীবনধারণের মানকে বেশী গুরুত্ব দেবে। ইসলাম যে পুঁজির পথে চলবেনা এতে আশ্চর্য্যের কিছু নেই।

সুতরাং একথা বলা যেতেই পারে পুঁজিবাদ এ পৃথিবীর বর্তমান একচ্ছত্র অধিপতি হলেও এ ব্যবস্থা শাশ্বত নয়।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন