বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম

আমাদের প্রাণের শহর ঢাকায় আরেক নাম হচ্ছে “ মসজিদের নগরী “। ঐতিহ্যবাহী এ শহরে দেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ অবস্থিত । লোক সংখ্যা ধারণ ক্ষমতার দিক দিয়ে এটি সারা পৃথিবীর ভেতরে ১০ম বৃহত্তম মসজিদ। আমাদের এই প্রাণের মসজিদটি ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।। ইসলামিক চেতনা, ঐতিহ্য ধারণ করা এই মসজিদটির স্থপতি ছিলেন আব্দুল হুসেন থারিয়ানি।

তৎকালীন ঢাকার সেগুনবাগিচা, পুরানা পল্টন এলাকায় অভিজাত শ্রেণীর নাগরিকদের বসবাস ছিলো। এবং ঢাকা শহরের বিস্তার হচ্ছিল দ্রুত। বিশেষ করে শহরের উত্তরাংশে।

তখনকার ঢাকার মূল নকশা অনুসারে সদর ঘাট থেকে সোজা উত্তর দিকে যে নবাবপুর রোডটি গুলিস্থান এলাকা হয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ এর দিকে চলে গেছে, সেটি ডানে-বামে কোথাও মোড় না নিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ বরাবর (তখনও মসজিদ নির্মাণ হয়নি) পুরানা পল্টন-সেগুন বাগিচা এলাকার উপর দিয়ে আরো উত্তরে চলে যাবার কথা ছিল। এর ফলে ওই সময় কালের কোনো কোনো অভিজাত শ্রেণী নাগরিকের আবাসস্থল এর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এমত অবস্থায় তারা ওই স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের নিকট একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তাদের একটি যুক্তি ছিল যে পুরাতন এবং নতুন ঢাকার সংযোগস্থল রয়েছে সেখানেই শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ করা অধিকতর যুতসই হবে। এতে নতুন এবং পুরনো ঢাকার সকলেই এই মসজিদের সুবিধা ভোগ করতে পারবে। উল্লেখ্য যে গুলিস্তান হতে উত্তর দিকে তখন নতুন নতুন আবাসিক এলাকা, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল।

তৎকালীন সামরিক প্রশাসন এই প্রস্তাবে সায় দিলেও এর নির্মাণের সকল খরচ ব্যবসায়ী মহলকে বহন করতে অনুরোধ করে। এ প্রেক্ষিতে বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী আব্দুল লতিফ ইব্রাহীম ভাওয়ানী সর্বপ্রথম মসজিদটি নির্মাণের সম্পূর্ণ অর্থ যোগানের দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন (কথিত আছে, মসজিদ নির্মাণে তিনি যত অর্থ খরচ করেছিলেন বায়তুল মোকাররম মার্কেট এর নীচ ও দোতলার সকল দোকান বিক্রির মাধ্যমে তা তুলে নিয়ে গেছেন )। এর কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য ১৯৫৯ সালে ‘ বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি’ নামে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

আব্দুল হোসেইন এম. থারিয়ানি এন্ড কোম্পানীকে এই মসজিদের নকশা ও নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া। ঐ সময় এ প্রতিষ্ঠানটি ‘ঢাকা নিউ মার্কেট,তৎকালীন ‘শাহবাগ হোটেল’ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বা পিজি হাসপাতাল ) ‘ডিআইটি বিল্ডিং(বর্তমানে রাজউক) নির্মাণ করে সুনাম অর্জন করে।

মসজিদটির জন্য ৮ দশমিক ৩ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। সে সময় মসজিদের অবস্থানে একটি বড় পুকুর ছিল। যা “পল্টন পুকুর” নামে পরিচিত ছিল। পুকুরটি ভরাট করে ২৭ জানুয়ারি, ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান মসজিদটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ১৯৬৮ সালে মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, গ্রন্থাগার ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। যেহেতু বায়তুল মোকাররম মসজিদটি হবে ঢাকার কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং পবিত্র স্থান, এ কথা চিন্তা করেই বায়তুল মোকাররমের বাহ্যিক দৃশ্যটি যেন কাবা ঘরের মত দৃশ্যমান হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহ্যেরও যেন প্রতিফলন ঘটে সে কথা বিবেচনায় রেখে পবিত্র কাবা শরীফ ও মোঘল স্থাপত্যর সমন্ময় ঘটিয়ে মসজিদের স্থাপত্য নকশাটি করা হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি (শুক্রবার) প্রথমবার এখানে নামাজ পড়া হয়।

বায়তুল মোকাররম মসজিদটি ৮ তলা। এর উচ্চতা ৯৯ ফুট। মসজিদের নীচ তালার মূল নামাজের স্থানটি ২৬,৫০৭ বর্গফুট এবং পূর্বদিকে আরো ১৮৪০ বর্গফুট জায়গা রাখা হয়েছে নামাজ পড়ার জন্য। মূল কাঠামোর বাইরে পূর্বদিকে আরো ২৮,৯৮৭ বর্গফুট খোলা জায়গা নামাজ পড়ার জন্য রাখা হয়েছে। নীচতলায় রয়েছে বিপণী বিতান ও বিশাল মার্কেট। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় নামাজ পড়া হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে ওযুর ব্যবস্থাসহ নারীদের জন্য পৃথক নামাজের কক্ষ ও পাঠাগার রয়েছে।মসজিদটির ১ম তলা ২৬ হাজার ৫১৭, দ্বিতীয় তলা ১০ হাজার ৬৬০, তৃতীয় তলা ১০ হাজার ৭২৩, চতুর্থ তলা ৭ হাজার ৩৭০, পঞ্চম তলা ৬ হাজার ৯২৫ এবং ষষ্ঠ তলার আয়তন ৭৪৩৮ বর্গফুট। জুম্মা ও ঈদের সময় বাড়তি ৩৯,৮৯৯ বর্গফুটে নামাজ আদায় করা হয়। এছাড়া, নারীদের জন্য রয়েছে ৬ হাজার ৩৮২ বর্গফুটের নামাজের জায়গা রয়েছে যা মসজিদের তিনতলার উত্তর পাশে অবস্থিত। পুরুষদের ওজুখানার জন্য ব্যবহৃত হয় ৬ হাজার ৪২৫ বর্গফুট। নারীদের ওজুখানার জন্য ব্যবহৃত হয় ৮৮০ বর্গফুট।

১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। বিশ্বের বিখ্যাত মসজিদগুলোর একটি ঢাকা বায়তুল মোকাররম মসজিদ।