বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল

bangladesh wetland

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল হচ্ছে চলনবিল। চলন বিলের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে থৈ থৈ পানি, ঢেউ, চোখ জুড়ানো দৃশ্য। তবে সব সময় এই দৃশ্যর দেখা মেলে না। আমাদের এই ষড়ঋতুর দেশে চলনবিল নানা সময়ে তার রূপ বদল করে থাকে। বিশেষ করে বর্ষার সময় এই বিলের বিশালতা বৃদ্ধি পায়। আবার গ্রীস্মে এই বিল তার আন্য রূপ ধারণ করে। হেমন্তের পাকা ধানের আনাগোনা, আর সোঁদা মাটির গন্ধে চারিদিক ম-ম করে। তবে চলনবিল যত রুপেই আমাদের কাছে দৃশ্যমান হোক না কেন তার মধ্যে এর নৌকা ভ্রমণ অর্থাৎ অথৈ জলরাশির দৃশ্য আমাদের অন্তরে স্থায়ীভাবে গেঁথে থাকে।

ইতিহাস

বিখ্যাত চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণ থেকে জানা যায়,সপ্তম শতাব্দীতে চলনবিল অঞ্চল পদ্মা ও যমুনা নদী গর্ভে ছিল। কারণ তিনি তৎকালীন পুন্ড্রবর্ধন (বগুড়া মহাস্থানগড়) থেকে বিরাট নদী অতিক্রম করে আমামের কামরুপে (কামরুপ কামাক্ষা) পৌঁছে ছিলেন। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে টলেমির বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ্যা ম্যাপ অনুযায়ী উত্তরে মহাস্থানগড়,দক্ষিণ-পূর্বে বিক্রমপুর (ঢাকা) আর চট্রগ্রাম দেখা যায়। পদ্মা ও ব্রক্ষপুত্র নদীর মধ্যবর্তী কোন স্থান দেখা যায় না। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় চলনবিল অঞ্চল তৎকালীন গঙ্গা ব্রক্ষপুত্রের অংশ ছিল। ক্রমে পলি জমে এই বিশাল বিল এলাকা জেগে ওঠে। শুরু হয় নতুন নতুন গ্রাম ও জনপদের গড়ে ওঠা। মাত্র ১’শ বছর আগেও চলনবিলের জলময় অংশের সীমা ছিল ৫’শ মাইলের উপরে। ধীরে ধীরে পদ্মা,আত্রাই ও যমুনার নদীগুলোতে পলি জমি এর আয়তন কমতে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে ভূমি এবং জনবসতি। ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার থেকে জানা যায়,চলনবিলের রাজশাহী অঞ্চলের আয়তন ছিল ২’শ ১০ বর্গমাইল এবং পাবনা অংশের আয়তন ছিল ৩’শ ৪০ বর্গমাইল। অর্থাৎ বৃহত্তর চলনবিলের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল।

প্রাচীন ও বর্তমান আবস্থান

প্রাচীনকালে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর মহাকুমার তিন চতুর্থাংশ,নওগা মহকুমার রানীনগর ও আত্রাই থানা এবং পাবনা জেলার চাটমোহর,ভাঙ্গুড়া,ফরিদপুর ও বেড়া থানা এলাকা জুড়ে চলনবিল বিস্তৃত ছিল। এছাড়া বগুড়া জেলার দক্ষিণাংশের কিছু এলাকা চলনবিলের অংশ ছিল বলে জানা যায়।

বর্তমানে পাবনা জেলার চাটমোহর,ফরিদপুর,বেড়া উপজেলা, নাটোর জেলার সিংড়া,বড়াইগ্রাম,গুরুদাপুর উপজেলা এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তারাশ,রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলার অংশ বিশেষ নিয়ে চলনবিল অবস্থিত। সিমা- চলনবিলের উত্তরে বগুড়া,দক্ষিণে পাবনা জেলার আটঘড়িয়া ও ঈশ্বরদী উপজেলা পূর্বে সিংড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন। পশ্চিমে নওগাঁ জেলার আত্রাই ও রানীনগর থানা অবস্থিত।

ভৌগলিক অবস্থান

চলনবিল বিষুব রেখার ২৪০৭ থেকে ২৪০৩৫ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯০১০ থেকে ৮৯০৩৫ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।

আয়তন

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১৪২৪ বর্গকিলোমিটার। গঠিত হওয়ার সময় চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এর আয়তন অনেক কমে এসেছে। চলনবিলের আয়তন ৫০০ বর্গমাইল বা প্রায় ১৪২৪ বর্গকিলোমিটার। আবার কোন জরিপ মতে চলনবিলের আয়তন ৮০০ বর্গমাইল বা প্রায় ২০৭২ কিলোমিটার।

চলনবিলের সম্পদ

চলনবিল শুধু আকার-আয়তনেই নয়,উজাড় করে দিয়েছে তার সম্পদ ভাণ্ডার। প্রাকৃতিকভাবেই চলন বিলের মাটি ভীষণ উর্বর। কারণ প্রতিবছর এই বিলের উপরে পলি জমে। ফলে এই বিলে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়। এই বিলকে উত্তরাঞ্চলের শস্য ভান্ডার বলেও ডাকা হয়। উর্বর মাটির কারণে এখানে এক বিঘা জমিতে ২০ থেকে ৩৫ মন পর্যন্ত ইরি ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। এছাড়াও তিল, রসুন, আদা, পেঁয়াজ সহ নানা ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। চলনবিল হচ্ছে মৎস্য সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। বিস্তীর্ণ হাওর খাল-বিল-নদী-নালার কই, মাগুর, শিং, টাকি, বোয়াল, চিতল, মৃগেল সহ নানা ধরনের মাছের বড় একটি উৎপাদন কেন্দ্র হচ্ছে এই চলনবিল। হাজার হাজার মানুষের জীবিকা এবং তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এই বিল দেখে আসছে এক অনন্য অবদান। এছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের পাখি। ডাউক, চখা, মানিকজোড়, খয়রা,মুরগি হাঁস, বালি হাঁস সহ নানা প্রকৃতির পাখি এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া নানা জাতের জলজ ফল এক সময় চলনবিলের ভান্ডার পরিপূর্ণ ছিল। চলনবিলের পনসা ফল ছিল পাক-ভারতে বিখ্যাত। অতীতে এখানে প্রচুর পরিমাণে পদ্মচাকা,মাখনা, শিঙ্গট, নিঙ্গট,ঢ্যাপ, শালুক, সিঙ্গরার প্রভৃতি সুস্বাদু জলজ ফল জন্মাতো। এসবই এখন কেবলই অতীত।

চলনবিলের অধিবাসী

চলনবিল অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বিরাট একাংশ হচ্ছে আদিবাসী, জেলে, মুচি পরিবারসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি। তারা অত্যন্ত অসচেতন, নিঃশেষিত, অত্যাচারিত এবং সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বর্তমানে অনেকে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠেছে চলনবিল অঞ্চলে।

প্রকৃতির এক অপরূপ খেয়াল হচ্ছে এই চলনবিল। যে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই রক্ষা করছে না, সাথে সাথে তার প্রাণ সম্পদ দিয়ে সমৃদ্ধ করছে আমাদেরকে। তাই আমাদের উচিত এই প্রাকৃতিক দাতাকে তার যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা।