বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের রাজসাক্ষী লালমনিরহাটের ‘হারানো’ মসজিদ

রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের এক কিলোমিটার দক্ষিণে লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘হারানো মসজিদ’। বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমনের প্রারম্ভিক ইতিহাসের রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৮৬ সালের দিকে আশ্চর্যজনকভাবে লালমনিরহাটে পাওয়া যায় এই প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৩৫০ বছর আগে ৬৯ হিজরিতে। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার দজলা ও ফোরাতের মতো ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি গণ্য করা হয়। চলমান বেশ কয়েকটি গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। রোমান ও জার্মান ইতিহাসবিদদের লেখায় আরব ও রোমান বণিকদের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে বাণিজ্যিক পথ হিসেবে ব্যবহারের কথা লিপিবদ্ধ আছে।

হজরত আবু ওয়াক্কাস (রা.) এ অঞ্চল দিয়েই চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর নির্মিত মসজিদ ও তাঁর সমাধি রয়েছে বর্তমানে চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে। খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পার ধরে সিকিম হয়ে চীনের মধ্য দিয়ে আরব ও রোমান বণিকদের বাণিজ্যবহরের যাতায়াতের অনেক প্রমাণ রয়েছে তাঁর কাছে, এমন টা দাবি করেছেন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল। এই হারানো মসজিদ হতে পারে সাহাবি আবু ওয়াক্কাস (রা.) নির্মাণ করেছেন।

হারানো মসজিদ আবিষ্কৃত হয় লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রামের একটি আড়ার মাঝে। স্থানীয় লোকজন একসময় হিংস্র জীবজন্তু, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদির ভয়ে এই আড়ার ভেতরে প্রবেশ করত না।১৯৮৩-৮৪ সালে স্থানীয় লোকজন আড়াটি চাষাবাদের জন্য পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দেখে, জায়গাটি সমতল জমি থেকে উঁচু এবং সেখানে রয়েছে প্রায় সাত-আটটির মতো মাটির উঁচু টিলা।প্রাচীনকালের তৈরি প্রচুর ইট পাওয়া যেতে থাকে; যে ইটগুলোতে অঙ্কিত কিছু নান্দনিক ফুল, যখন জায়গাটি সমতল করার জন্য খোঁড়া শুরু হয়। বাই ভেবে নিয়েছিল, পুরনো কোনো জমিদার কিংবা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে এটি। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ১০ মহররমের একটি ঘটনা তাদের টনক নাড়িয়ে দেয়। সেদিন গ্রামের আইয়ুব আলী নামের এক ব্যক্তি অন্য অনেকের মতো ইটের স্তূপ থেকে ইট কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে দেখেন, ইটের ওপর কিছু একটা লেখা। লেখা স্পষ্ট দেখার জন্য টিউবওয়েলের পানিতে ভালোমতো ধুয়ে তিনি দেখতে পান এটি কোনো প্রাচীন শিলালিপি, যাতে লেখা আছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ, হিজরি সন ৬৯’। ৬৯ হিজরি? মানে কি! ৬৯ হিজরি মানে ৬৯০ সাল। কিন্তু বখতিয়ার খলজী তো বাংলায় আসলেন ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে। তাহলে এই মসজিদ কে বানাল? লেখক মতিউর রহমান বসনীয়ার লেখা বই ‘রংপুরে দ্বীনি দাওয়াত’। বইতে এই মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লালমনিরহাট জেলার এ প্রাচীন মসজিদ ও এর শিলালিপি দেখে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের (১২০৪ খ্রিস্টাব্দ) ৬০০ বছর আগেই বাংলা অঞ্চলে কোন এক সাহাবি এসে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।

কে সেই সাহাবী? কেন তিনি বাংলাদেশে আসলেন? কোথা থেকে আসলেন? আর আসলেও শুধু কি লালমনিরহাটেই ছিলেন? বইটা থেকে জানা যায়, রাসূেলর (সা.) এর মামা বিবি আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস (রা.) ৬২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬২৬ খ্রিস্টাব্দ বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন। (পৃ. ১২৬)। এজন্য স্থানীয় মানুষজনের কাছে এটি ‘সাহাবায়েকরাম মসজিদ’ নামেও পরিচিত। বহু ঐতিহাসিক এবং গবেষকের মতে, ‘হারানো মসজিদ’ এর নির্মাণকাল ছিল চীনের বন্দর নগরী ক্যান্টনে অবস্থিত কোয়ানটা মসজিদের নির্মাণের প্রায় ৬১ বছর পর। উল্লেখ্য যে কোয়ানটা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরে কোয়ানটা মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় হিজরি ৮ সালের দিকে।

প্রায়ই বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এই মসজিদটিকে দেখতে আসেন এবং তাদের মোটামুটি সবারই এটা বিশ্বাস যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবদ্দশায় কিংবা তার ইন্তেকালের অল্পসময় ব্যবধানেই উপমহাদেশ এবং বিশেষত চীনে ইসলাম প্রচারে আসা সাহাবী (রা.)গণ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।