বাংলাদেশে হাদিস পাঠের প্রচলন

ID 178151675 © Odua | Dreamstime.com

মুসলিম বিশ্বে আরবদের পরে অন্যতম বৃহত ভাষাগত গোষ্ঠী তৈরি করেছে বাংলাভাষী মুসলিমরা। ব্রিটিশ মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। এটা লজ্জাজনক যে, যারা ইউরোপ, আমেরিকা এবং কানাডায় যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছেন তাদের অধিকাংশই তাদের পারিবারিক ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে খুব কম জানেন।

মুহম্মদ মজলুম খানের The Muslim Heritage of Bengal: The Lives, Thoughts and Achievements of Great Muslim Scholars, Writers and Reformers of Bangladesh and West Bengal বইটিতে প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে, সিলেটে শাইখ শাহজালালের(মৃত্যু: ৮১৫ হিজরী) আবির্ভাবের অনেক আগ থেকেই বর্তমান বাংলাদেশে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল বলে উল্লেখিত। লেখক বলছেন প্রকৃতপক্ষে, আরব এবং পার্সিয়ান ব্যবসায়ীরা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথমদিকে চট্টগ্রামে প্রবেশ করেছিল। এম.এম খানের মতে, আব্বাসীয় খিলাফতের প্রাচীন মুদ্রাগুলি বাংলাদেশে প্রাচীন মুসলিম ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। এই মুদ্রাগুলি রাজশাহী এবং কুমিল্লায়ও আবিষ্কৃত হয়েছিল; পরবর্তীতে কুমিল্লায় বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শাইখ মুহাম্মদ আব্দুল মালিক জন্মেছেন।

শাইখ ইমদাদুল হক হবিগঞ্জী, যিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডের ওয়ালসালে বাস করেন, তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গে হাদিসের পাঠ শায়খ জালাল উদ্দীন তাব্রাজির দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল, যিনি ৬৪২ হিজরিতে মারা গিয়েছিলেন – যা শাহজালালের জন্মের অনেক আগে। বাংলাদেশে হাদীস প্রবেশের ক্ষেত্রে, উল্লেখ করা যেতে পারে শাইখ শরীফ উদ্দীন আবু তাওয়ামা (মৃত্যু: ৭০০ হিজরী) নাম। যিনি নিজে হাদিস পড়িয়েছেন এবং সোনারগাঁওয়ে একটি দ্বীনী বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অষ্টাদশ হিজরীর মুহাদ্দিসদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন শাইখ আখির সিরাজ, বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাশরিক-আল-আনোয়ার’কে যিনি মুখস্থ করেছিলেন। তিনি বাঙালি ছিলেন। তাঁর শাইখ নিযামুদ্দীন আওলিয়ার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে প্রেরীত হন, যেখানে এসে তিনি অনেক বিখ্যাত কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন।

এরপর খুব শীঘ্রই, বাংলাদেশে দু’জন মহান মনীষীর আগমন ঘটে, যদিও তাঁরা হাদিস প্রচারের জন্য পরিচিত ছিলেন না: একজন হলেন শাইখ আবদুল কাদির জিলানীর নাতি, সাইয়্যেদ আহমাদ তান্নুরি এবং অপরজন তাঁর সমসাময়িক, সিলেটের শাইখ শাহজলাল ইয়ামানী। পরবর্তীকালে তাঁদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

প্রত্যেক বাঙালি মুসলমানের কাছে শাইখ শাহজালাল একজন ধার্মিক ব্যক্তি হিসাবে অধিক পরিচিত যার হাতে আল্লাহ অনেক অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেছিলেন। যদিও কিছু কিছু ঘটনা বর্ণিত আছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। মরক্কোর ইবনে বতুতা বিশ্বের অন্যতম প্রথম ভ্রমণকাহিনী ‘আর-রিহলাহ’ রচনা করেছেন। এতে তিনি শাইখ শাহজালালের কয়েকটি অলৌকিক ঘটনা সম্পর্কে লিখেছেন যা তিনি সিলেট সফরকালে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

যদিও শাইখ শাহজলাল একজন মহান মনীষী যার হাতে বিপুল সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তিনি হাদিস বা অন্য কোন বিষয় শিক্ষা দিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। তাঁর সময়ের পরে, বাংলাদেশে আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের উদ্ভব ঘটেছে যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি জনসাধারণের আত্মশুদ্ধির উন্নয়ন উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। হাজী শরীয়তউল্লাহ (মৃত্যুঃ ১২৩৪ হিজরী) এবং মাওলানা কারামাত আলী জৈনপুরী (মৃত্যূঃ ১২৬০ হিজরী) মানুষের জীবনে প্রবেশ করা শিরককে নির্মূল করার জন্য এবং তাওহীদকে বদ্ধমূল করার জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। অন্যদিকে মাওলানা ইদ্রিস সিলেটি এবং তাঁর পুত্র শাইখ আব্দুল কাদির ‘জামে-জাওয়ামি’, ‘শরাহ-আকাঈদ-নাসাফিয়্যা এবং ‘আল-ফিকহুল আকবার’ এর মতো হাদীস ও আক্বীদার গ্রন্থের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থ রচনা করে গেছেন।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে, ‘বাংলার আযহার’ হিসেবে খ্যাত হাটহাজারীর ‘দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম’ এ পাঠ্যক্রমের অংশ হিসাবে হাদিসের প্রসিদ্ধ ছয়টি কিতাব পড়ানো শুরু হয়। এরপর ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা এই পাঠ্যক্রমকে অনুসরণ করে, যা ব্রিটিশ সরকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

শাইখ ইমদাদুল হক হবিগঞ্জী তাঁর ‘হিদায়াতুস সারী’ গ্রন্থে এই বিষয়টি পনেরটি পৃষ্ঠা ব্যাপি উল্লেখ করেছেন এবং এতে বাংলাদেশের ষাটজন খ্যাতনামা আলেম ও মনীষীর নাম উল্লেখ করেছেন । তাঁর অপার নম্রতার কারণে তিনি নিজের নাম এখানে যুক্ত করেননি। তবে তাঁর এক ছাত্র শাইখের জীবনীগ্রন্থে ছয় পৃষ্ঠাব্যাপি তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হল, মাদ্রাসা থেকে ফারেগ হওয়ার সাথে সাথে তাঁর ওস্তাদরা তাঁকে ‘সহীহ বুখারী’ এর দরস প্রদানের জন্য নিযুক্ত করেন – সাধারণত দাড়ি সাদা না হওয়া পর্যন্ত কাউকে এই পদ দেওয়া হয় না। আর একটি আকর্ষণীয় বিষয় হল সৌদি সরকারের অনুমতি অনুযায়ী মক্কার হেরেমে হাদীসের দরস প্রদানের জন্য আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন ।

মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি সহীহ বুখারীর আরবী ভাষ্যগ্রন্থ ‘হিদায়াতুস সারী’ লেখা শুরু করেন। এই কিতাবটি তাঁর অনন্য কীর্তিসমূহের মধ্যে একটি।

(এই নিবন্ধটি মাওলানা শাহীনুর রহমানের ব্লগ আর-রহমা থেকে সংকলিত। )