বাতাসে বিষ, রক্ষা পাবেন কীভাবে জানেন?

স্বাস্থ্য ২৫ জানু. ২০২০ Tamalika Basu

খবরের কাগজে খেলার পাতা জুড়ে বিশাল ছবি। লাল হয়ে গিয়েছে টেনিস তারকা মারিয়া সারাপোভার মুখ। ভ্রূ কোঁচকানো। কাশির দমকে মেলবোর্ন অস্ট্রেলিয়া ওপেনের প্রদর্শনী ম্যাচ বাতিল করছেন তিনি। তাঁর প্রতিদ্বন্দী ভেজা তোয়ালেতে মুখ ঢাকছেন। চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রা, সেই সঙ্গে মেলবোর্নের আকাশ ভর্তি বিষাক্ত বিষ। দাবানলের কারণে মেলবোর্নে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া কঠিন।

বাতাসে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে-

তারকাদের এহেন দুর্দশা দেখে আহ উহু করা জনগণের এটাও জেনে রাখা উচিত অস্ট্রেলিয়ায় সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া দাবানলে নিঃশব্দে প্রাণ দিয়েছে ৫০ কোটি বন্যপ্রাণী। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদদের দেওয়া তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি স্তন্যপায়ী, পাখি ও সরীসৃপের মৃত্যু হয়েছে দাবানলে ঝলসে গিয়ে। যার সংখ্যা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে প্রায় হাজার হাজার কোয়ালা। প্রায় বিলুপ্তির তালিকায় থাকা এই প্রজাতির বেশিরভাগেরই বাস ছিল অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চলে। মূলত, নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্য-দক্ষিণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় আট হাজার কোয়ালার মৃত্যু হয়েছে। যা এই অঞ্চলের কোয়ালা-সংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। পরিস্থিতির জেরে পরবর্তীতে মৃত প্রাণিদের দেহও খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা।

দাবানলের ভয়াবহতা-

অস্ট্রেলিয়ার এই ভয়ঙ্কর দাবানল মূলত তীব্র তাপদাহ, অনেকদিন ধরে চলা খরা এবং ঝড়ো বাতাসের কারণে এমন ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করেছে। দেশটিতে অনেকদিন ধরেই তাপদাহ চলছে। বিগত তিন মাসের উষ্ণতা ভেঙে দিয়েছে ১২০ বছরের রেকর্ড। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দেশটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গরম অনুভূত হয়। সে সময় গড় তাপমাত্রা ছিলো ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন পরিস্থিতিতে আগামী কয়েকদিনে আগুনের তীব্রতা কমার সম্ভাবনা কম।

এছাড়া এই ঝড়ো হাওয়াতে অস্ট্রেলিয়া বড় শহরগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। সোমবার বাতাসের গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় ৬০ মাইল। অস্ট্রেলিয়ায় চলছে ভয়াবহ খরা। ১২০ বছর আগে থেকে আবহাওয়ার তথ্য নথিভূক্ত করছে দেশটি। তখন থেকে এবারের আগে কখনও বসন্তকালে এমন খরা দেখা যায়নি। ২০১৭ সাল থেকে নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুইন্সল্যান্ডের বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়ায় তা শুস্ক হয়ে গেছে। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সেখানকার গাছ ও ঘাস সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

রক্ষার উপায়?

এই দহনকাণ্ড চলবে, বিস্তৃততর জায়গা জুড়ে ফিরেও আসবে, এমন শঙ্কা প্রবল । দাবানলের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা আঙুল তুলেছে জলবায়ু পরিবর্তনের দিকেও। জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের একমাত্র না হলেও অন্যতম এবং অনস্বীকার্য কারণ, বলেছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। অস্ট্রেলিয়ায় এই গ্রীষ্মে তাপমাত্রা পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ছড়িয়ে গিয়েছে। এই শুষ্ক আবহাওয়া চলছে দীর্ঘ সময় ধরে, তার সাথে যোগ হইয়াছে আশাতীত ভাবে কম বৃষ্টিপাত। দাবদাহ, খরা, অনাবৃষ্টির প্রভাবে মাটি ও উদ্ভিদ শুকিয়ে গিয়েছে।

দাবানল হয় মূলত প্রাকৃতিক কারণে। কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থান্ধ মানুষের চক্রান্তেও ঘটে, কিন্তু এই বারের দুর্যোগ বুঝিয়ে দিয়েছে —অস্ট্রেলিয়ার দাবানলকে দুঃস্বপ্নের ন্যায় করিয়া তুলিয়াছে জলবায়ু ও পরিবেশের ক্রম-অবনতিই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর দেশের ভূমিকা আছে, স্বীকার করেন না প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। অথচ সারা বিশ্বে সর্বাধিক কয়লা রফতানি করে অস্ট্রেলিয়া, খনিশিল্পের উপর দেশের শাসকেরা নির্ভর করে থাকেন, এই সকলই দিবালোকের ন্যায় সত্য। দুর্ভাগ্যের কথা, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে  পরিবেশকে সহনীয় করার কথা উঠলে প্রধানমন্ত্রী উড়িয়ে  দেন; দেশের কয়লানির্ভরতা, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, দাবানল-দুর্যোগ ও জনজীবনে তার প্রভাবের মধ্যে কেউ যোগসূত্র খুঁজতে গেলে এড়িয়ে যান।

পরিসংখ্যান-

২০১৮ সালে প্রকাশিত কুইন্সল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা যায়, মানবসৃষ্ট কারণের চেয়ে উষ্ণ তাপমাত্র এই দাবানলের ক্ষেত্রে চারগুণ বেশি দায়ী। জাতীয় পরিবেশ বিজ্ঞান প্রকল্প জানায়, ভবিষ্যতে আগুনের মাত্রা বাড়বে। আর এটা হচ্ছে গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির কারণে।

প্রধানমন্ত্রী মরিসন অবশ্য দাবি করেন, তার সরকার সবসময়ই জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বাস্তবতা সে কথা বলে না। যে কার্বন ট্যাক্সের কারণে ২ বছরে দেশটির গ্রিনহাউস গ্যাস ১.৪ শতাংশ কমে গিয়েছিলো, ২০১৪ সালে তা সংস্কার করে তার সরকার। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জলবায়ু নীতির কারণে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে মরিসনের প্রতিনিধিদল কার্বন কমানোর পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন।

অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ, জীববৈচিত্র, আবহাওয়ার বিশিষ্টতা হয়তো সমস্ত দেশের নেই। এই দাবানলের ন্যায় দুর্যোগও সকল দেশে আসবে না। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার দহনকাণ্ড থেকে অন্য দেশগুলি শিক্ষা  নিতে পারে, কী কী পদক্ষেপ করলে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক আবর্তন নিশ্চিত হয়; দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম বা নিতান্ত বৃষ্টিহীনতাই অভ্যাস হয়ে  না দাঁড়ায়; ক্ষুদ্র পতঙ্গ থেকে বৃহৎ প্রাণীটি পর্যন্ত বাস্তুতন্ত্রের সকল উপাদান সহজ জীবনটি বাঁচিতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু বাহ্যপ্রকৃতিকই নয় , আলোড়িত করে মনোজগৎকেও। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, দাবানলের পরে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা বাড়িয়াছে ৫-১৫ শতাংশ। দেশের ও দশের শরীর-মন ভাল রাখার লক্ষ্যে ভারসাম্য যুক্ত জলবায়ু ও পরিবেশনীতির বিকল্প নেই।