বারুদ-বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বাগদাদ আজও বইয়ের ঘ্রাণ নিতে ভোলেনি

arabian astronomy book
A photograph image showing the ancient hand written book of astronomical studies by the arab scholars. ID 23749171 © Joanne Zhe | Dreamstime.com

একাধিক বিস্ফোরণে রক্তাক্ত বাগদাদ। সশস্ত্র আক্রমণে আতঙ্কিত বাগদাদ। এমন খবর প্রায় রোজই দেখা যায়। আজ যখন আমরা আমাদের টেলিভিশনের পর্দায় এই ধরনের খবর দেখি, তখন অনুমান করা শক্ত হয়ে পড়ে যে, একসময় বাগদাদ একটি বড় শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। বাগদাদ এবং বই, কয়েকশো বছর ধরে সমার্থক শব্দ ছিল। এখনও এই শহরের প্রত্যেক বাড়িতে বইয়ের তাক সুন্দর করে নানা ধরনের বই দিয়ে সাজানো থাকে, রাস্তার বইয়ের দোকানেও ভিড় থাকে যথেষ্ট।এখনও, ধ্বংসস্তুপ এবং অরাজকতার মাঝে বাগদাদের বাসিন্দারা বই কেনার অভ্যাস ভোলেননি। এনবিসি নিউজের এক ইরাকি অনুবাদক কৌতুক করে বলেছিলেন, “এটি ইরাকের পুরানো একটি রোগ – লোকেরা তাদের অর্থ খাবারের চেয়ে বইয়ের পিছনে বেশি অর্থ ব্যয় করে,”

নবম শতকের পুঁথিপত্র

সেই সময়ে, যখন পশ্চিমী ইতিহাস অনুসারে অন্ধকার যুগ চলছে, সেই সময় বাগদাদ এবং বইয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল। যখন বেশ কয়েকটি বই-সহ একটি গ্রন্থাগার পেলে ইউরোপের চার্চগুলি  নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করত, তখন বাগদাদে এক-একটি রাস্তায় ছিল ১০০টিরও বেশি বইয়ের দোকান ছিল। পশ্চিমী বিশ্বে সেই সময় শিক্ষার অধিকার কেবল ধনী বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আর অন্যদিকে তখন বাগদাদের লোকেরা ৩০ টিরও বেশি গ্রন্থাগার ব্যবহার করত।

হযরত মুহাম্মদ (সা) – এর মৃত্যুর ২০০ বছরের মধ্যেই ছোট্ট ইসলামী জাতি একটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল যা উত্তর আফ্রিকা থেকে আরব, পারস্য থেকে উজবেকিস্তান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ভারত পেরিয়ে আরও পূর্ব দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ টাইগ্রিস নদীর তীরে নির্মীত বাগদাদ শহর ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরুষ এবং মহিলারা বাগদাদে আসতেন এবং তাঁদের সাথে বিশ্বের সুদূর কোণ থেকে অজানা জ্ঞানের ভাণ্ডার নিয়ে আসতেন।

বিদ্বানদের মহামিলন

মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, জরোস্ট্রিয়া এবং আরও অন্য ধর্মের লোকেরাও বাগদাদে বাস করতেন। বই বাগদাদের জীবনের প্রতীক হতে শুরু করে। লেখক, অনুবাদক, চিত্রশিল্পী, গ্রন্থাগারিক, বই বাঁধানোর লোক, সংগ্রাহক এবং বিক্রেতারা দিন-রাত শহরের রাস্তাগুলি জমজমাট করে রাখতেন। তবে এই ধরনের বৈচিত্র্যময় পটভূমির লোকেদের এক সুতোয় বাঁধার দরকার ছিল। সেই কারণে আরবি ভাষাকে বিভিন্ন স্কলারশিপের ভাষা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং এভাবেই বিভিন্ন ধর্মের লোককে ভাষা দিয়ে এক করা হয়েছিল। 

আরও অনেকের মধ্যে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, টলেমি এবং প্লুটার্কের কাজগুলি আরবিতে অনুবাদ হয়েছিল। বহু ইহুদি দার্শনিক তাদের নিজস্ব গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ লেখার জন্য গ্রীক দার্শনিক রচনার আরবি অনুবাদগুলি ব্যবহার করেছিলেন। যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগ থেকে নবজাগরণের যুগে উত্থিত হতে শুরু করেছিল, তখন তারা পশ্চিমী সাম্রাজ্যের ভিত্তি পুনরুদ্ধার করার জন্য বিভিন্ন আরবি বইয়ের উপর নির্ভর করেছিল।

বাগদাদে অনূদিত বহু মূল বই তাদের নিজের দেশে হারিয়ে গেলে বা ধ্বংস হলেও এবং তাদের আরবি অনুবাদগুলির অস্তিত্ব রয়ে গিয়েছিল। বাগদাদের বিদ্বানরা গ্রীক, রোমান এবং মিশরীয়দের শাস্ত্রীয় রচনা, এমনকি পারস্য, ভারত এবং চীনের মহাকাব্য অনুবাদ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। এই দুর্দান্ত কাজগুলি আবার আরবি থেকে তুর্কি, ফারসি, হিব্রু এবং লাতিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। 

বাগদাদের বিদ্বানরা কেবলই অন্য দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি সংগ্রহ ও অনুবাদ করেননি, তাঁরা স্বাধীন ভাবে বিভিন্ন কাজও করেছিলেন। তাঁরাই বিশ্বকে প্রথম বীজগণিত এবং জ্যামিতির সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন। বাগদাদের এক বিদ্বান প্রথম চক্ষুবিদ্যার একটি পাঠ্যপুস্তক তৈরি করেছিলেন। এই বইটি পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় দুনিয়াতেই জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এটি আট শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়েছিল।

বায়তুল হিকমা

বাগদাদ শিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়ার সাথে সাথে খলিফা হারুন আল রশীদ এবং তাঁর পুত্র আল-মামুন ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক- বাইত আল হিকমাহ বা হাউস অফ উইজডম খুলেছিলেন। হাউস অফ উইজডমের বিদ্বানরা, আধুনিক সময়ের মতো, “বিশেষজ্ঞ” হয়ে ওঠেননি, বরং বহু বিদ্যায় তাঁদের সাবলীল পারদর্শিতা ছিল। আল-রাজী ছিলেন একজন দার্শনিক এবং গণিতবিদ পাশাপাশি একজন চিকিৎসক। আল-কিন্দি যুক্তি, দর্শন, জ্যামিতি, গণনা, পাটিগণিত, সংগীত এবং জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে লিখেছিলেন।

বাগদাদের নাগরিকদের জীবনে বই সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে বাগদাদের এক-একটি পাণ্ডুলিপি “… আধুনিক বইয়ের আকারের মতো ছিল, যেখানে ভাল মানের কাগজ দিয়ে তৈরি পৃষ্ঠার উভয় দিকে লেখা ছিল, এবং চামড়ার আবরণে মোড়া ছিল”। একটি সাধারণ বইয়ের দোকানে পাওয়া যেত কুরআন, বিভিন্ন ভাষা এবং ক্যালিগ্রাফি, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস, সরকারী রচনা, আদালতের বিবরণী, প্রাক-ইসলামিক ও ইসলামিক কবিতা, বিভিন্ন মুসলিম চিন্তাভাবনা, জীবনী, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গ্রীক এবং ইসলামী চিকিৎসা, সাহিত্য, জনপ্রিয় কথাসাহিত্য এবং ভ্রমণ গাইড (ভারত, চীন, ইন্দোচিনা)।

আজ, পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠলেও বাগদাদের লোকেরা তাঁদের সাহিত্যিকরা ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও বইয়ের বিক্রেতারা তাঁদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বাগদাদের বইপ্রেমী ও খাদ্যরসিক মূলত নাগরিকরা কী খাবেন আর কোন বই পড়বেন, এই ভাবনাতেই ডুবে থাকেন।