বার্লি: প্রাচীন এই খাদ্য হতে পারে ভবিষ্যত পুষ্টির অপার উৎস

barley field
ID 20386343 © Perolsson | Dreamstime.com

ইতিহাসের সাক্ষ্য প্রমাণ ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় ছয় হাজার বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বার্লির চাষ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায়, বর্তমানে বিশ্বে চাষ করা ফসলগুলোর মধ্যে বার্লির অবস্থান পঞ্চম। বিশেষত, ইরাক ও ইরানের বিশাল অঞ্চল জুড়ে এর চাষ হচ্ছে। এই ফসল তীব্র খরা এবং লবণাক্ত সহনশীল হিসাবে পরিচিত এবং এখন পর্যন্ত বার্লির বেশ কয়েকটি জাতের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। অতীতে যে ধরনের বার্লির দেখা মিলত তা প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

ইসলামী সাহিত্যে বার্লি

এটি এমন এক ফসল যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির একমাত্র যোগানদাতা হতে পারে। ইসলামী চিন্তাবিদেরা হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বার্লি খুবই পুষ্টিকর, যা কাশি এবং পেটের প্রদাহ নিরাময়ে দারুণ কার্যকর। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে এবং একটি ভাল মূত্রবর্ধক হিসাবে কাজ করতে সক্ষম।

কমপক্ষে একুশটি হাদীসে গুঁড়ো বার্লি দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তেমনই এক খাবারের নাম তালবিনা, যা গুঁড়ো বার্লি, দুধ, এবং মধু দিয়ে বানানো হয়ে থাকে।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) অসুস্থ ও শোকগ্রস্থদের নিয়মিত তালবিনা খেতে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, “আত-তালবিনা রোগীর হৃদপিন্ডকে বিশ্রাম দেয়, এটিকে সক্রিয় করে তোলে এবং তাকে দুঃখ ও শোক থেকে মুক্তি দেয়” (বুখারী ৭: #১ # ৫৯৩)

সুবিখ্যাত মনিষী ইবনে আল-কায়্যিম বলেন, “বার্লির সাথে পানি মিশিয়ে তা বেশ কিছুক্ষণ জ্বাল দিন। যখন মিশ্রণটি ঘন হয়ে যাবে তখন জ্বাল বন্ধ করে একটা পাত্রে ঢেলে নিন। এই মিশ্রণটি নিয়মিত খেলে তা আপনার শরীরকে সতেজ রাখবে।”

বহু বছর আগে থেকেই জাপানের লোকেরা কচি বার্লি গাছের রস খায়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে এটি শরীরের জন্য দারুণ উপকারী।

আধুনিক গবেষণা থেকে বার্লিকে নতুন করে জানা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে প্রধান প্রধান ফসলগুলো চাষ হয় তার সবগুলো্র উদ্ভবই মধ্যপ্রাচ্যে হয়েছিল। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে বার্লি উন্নতমানের প্রাণী খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বিয়ার তৈরি করার জন্য এটা তাদের প্রধান উপাদান। আবার, মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম বার্লি আমদানিকারক।

খাবার হিসেবে বালির পুষ্টিগুণ অনেক। সুস্থ থাকার জন্য আমাদের ১৮ টি অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রয়োজন, যার মধ্যে আটটি অ্যামিনো অ্যাসিড আমাদের দেহ নিজে উৎপাদন করতে পারে না। এই ক্ষেত্রে বার্লি হতে পারে পুষ্টির দারুণ এক উৎস। এতে পাওয়া যায় সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস, গ্লুকান, আয়রন, তামা, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন বি ১, বি ২, বি ৬, সি, ফলিক অ্যাসিড এবং পেন্টোথেনিক অ্যাসিড। এছাড়া এটিতে অ্যামাইলেজ, ডেক্সট্রিন, ফসফোলিপিডস, মাল্টোজ, গ্লুকোজ, সালফার, নিয়াসিন এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন রয়েছে।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ডাঃ হাওয়ার্ড লুটজ বার্লির পুষ্টিগুণের দারুণ প্রশংসা করেন। তিনি বলেন “বার্লি এই দশকের সবচেয়ে আশ্চর্যকর এক ফসল। এটি শারিরিক সক্ষমতা, যৌন শক্তি, এবং চিন্তার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, এটি আপনার ভিতরে থাকা খারাপ প্রবণতাগুলোকে কমিয়ে দেয়। ”

আধুনিক ওষুধগুলো আমাদের শরীরে অনেক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে, আর তাই উদ্ভিদ জিনতত্ত্ববিদ ডঃ যোশিহিদে হাজিওয়ারা বিগত ১৫ বছর ধরে ১৫০ প্রকারের বার্লি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তিনি তার গবেষণায় দেখতে পেয়েছেন, বার্লিতে রয়েছে জৈব সোডিয়াম উপাদান যা আমাদের রক্ত প্রবাহে দ্রবণ আকারে ক্যালসিয়াম জমা রাখে। হাড়ের জয়েন্টগুলির স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখার জন্য এই ক্যালসিয়াম ভীষণ দরকারী। তার মতে, শরীরে বড় ধরনের কোন জটিলতা না থাকলে বার্লি বদহজম, ডায়রিয়া, এবং পাকস্থলীর প্রদাহ নিরাময়ে দারুণ কার্যকর।

পরিশেষে বলা যায় যে বার্লি একটি পরিপূর্ণ খাদ্য যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য সকল পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। তাই, এখন যে কেউ সহজে বুঝবে কেন আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিয়মিত বার্লি খেতে পরামর্শ দিয়েছেন।

 

 

তথ্যসূত্র:
Adelaide.edu.au। “ডাঃ এ.কে.এম. রফিক ইসলাম ”। ১.-৪/২৪/০২। উদ্ভিদ বিজ্ঞান। ০৮/০৬/০২।
Cgiar.org। “গবেষণার ক্ষেত্র: বার্লি (হার্ডিয়াম ভলগারে)”। ২. ০৮/০৫/০২।
Ehpnet.niehs.nih.gov। “পরিবেশগত স্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গি” । ১০২: ১ (১৯৯৪)। ৪. ০৮/০৫/০২।
হাজিওয়ারা, ইয়োশিহিদে। “বার্লি সবুজ”। ১১/১৯/৯৬। ৮. Actsion.com। ০৮/০৫/০২।
Herbsrainbear.com। “বার্লি গ্রাস: (হার্ডিয়াম ভলগারে)”। ০৮/০৬/০২।