বাড়িতেই তৈরি করে ফেলুন জনপ্রিয় মিষ্টিমুখ বাকলাভা

baklava

বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন খাদ্য সংস্কৃতির ধারা আদতে সেই দেশ কিংবা সেই সংলগ্ন প্রদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অনেকাংশেই তুলে ধরতে সাহায্য করে। উৎপাদিত পণ্য এবং স্থানীয় দ্রব্য সামগ্রীর উপরে নির্ভর করেই সাধারণত কোনও দেশ বা প্রদেশের খাদ্য সংস্কৃতির একধরনের বহুমাত্রিক রূপরেখা প্রকাশ পায়। খাবার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমাদের উল্লেখ করতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের একটি জনপ্রিয় খাবারের নাম হল ‘বাকলাভা’-র কথা। নামের মধ্যে অভিনবত্ব যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে এর একটি পূর্বাপর ইতিহাস। সেই নিয়ে আজকে দু-চারটি কথা বলা যেতে পারে। বাকলাভা হল একধরনের মিষ্টান্ন। যা সাধারণত পেস্তা, কাজুবাদামের পুর দিয়ে ভর্তি থাকে। ভিতরের পুরের অংশটি চিনির সিরাপ বা মধু দিয়ে ফ্রস্টিং করা হয়ে থাকে। মিশর, দক্ষিণ ককেশাস, বলকানস এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বাকলাভা খাওয়ার চল রয়েছে।

উসমানীয় বা অটোমেন সাম্রাজ্যের বাকলাভা

আমরা যারা যথার্থ অর্থেই খাদ্যরসিক, তারা তেল-ঝাল-মশলা জাতীয় খাবারের পাশাপাশি মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় যে কোনও পদের প্রতি আলাদা আকর্ষণ বোধ করে থাকি। বাকলাভাকে একপ্রকার মিষ্টি জাতীয় পদ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন তথ্যসূত্র অবলম্বনে জানা যায় বাকলাভা পঞ্চদশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে বিবেচিত হত। শোনা যায় বাকলাভার আদি রূপটি ছিল এর থেকে অনেকটাই ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র, পরবর্তী সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালে বাকলাভা বর্তমান রূপটি পেয়েছে।

আরও একটু বিশদে বলতে গেলে অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ইস্তাম্বুলের টোপকাপি প্রাসাদের রান্নাঘরে নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাকলাভার বর্তমান রূপটি এসেছে। একটা সময়ে বাকলাভা আনন্দ-উৎসব উদযাপনের মিষ্টি হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। বিবাহ অনুষ্ঠান কিংবা ঘরোয়া কোনও অনুষ্ঠানেও বাকলাভা পরিবেশনের চল চোখে পড়ে। কেক, পেস্ট্রি এবং কাপকেকের রমরমা এই কালে বাকলাভার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে গেছে এমনটা বলা মোটেই ঠিক নয় বরং বলা যায় তু্র্কি প্রদেশে গিয়ে কেউ জনপ্রিয় মিষ্টির খোঁজ করলে অবশ্যই পাবেন এই বাকলাভাকে।

কেমন হয় গ্রিক বাকলাভা?

এখনও পর্যন্ত দুইধরনের বাকলাভার সন্ধান পাওয়া গেছে। এক, গ্রিক বাকলাভা। দুই, টার্কিশ বা তুর্কি বাকলাভা। মনে রাখতে হবে এই দুইপ্রকারেই রয়েছে উপকরণগত পার্থক্য। গ্রিক বাকলাভা প্রস্তুতির সময়ে মধু, দারুচিনি এবং আখরোট দেওয়া হয়ে থাকে, অন্যদিকে টার্কিশ প্রকারভেদটিতে দেওয়া হয় চিনির সিরাপ, পেস্তা এবং লেবুর জল। এক্ষেত্রে মিষ্টি প্রস্তুতির সময় মশলা দেওয়ার পদ্ধতিটি সাধারণত নেওয়া হয় না। যারা দুইধরনেরই বাকলাভা খেয়েছেন তাদের অধিকাংশই মনে করেছেন যে গ্রীক বাকলাভার থেকে টার্কিশ বা তুর্কি বাকলাভা খেতে বেশি ভাল হয়। তুরস্কে বাকলাভা তৈরির সময়ে যে কাজু, পেস্তা এবং অন্যান্য বাদামের সংমিশ্রণ দেওয়া হয়, তা সত্যিই খাবারে অনন্য স্বাদ এনে দেয়। অন্যদিকে গ্রিক বাকলাভার মতো মিষ্টি স্বাদ আনার জন্য খাবারে মধু দেওয়া হয় না। যার বদলে দেওয়া হয় চিনির সিরাপ।

বাড়িতে কিন্তু অত্যন্ত সহজেই বাকলাভ বানানো যেতে পারে। তার জন্য রইল প্রণালী।

বাকলাভ বানানোর প্রণালী-

উপকরণ-

· গলানো মাখন – ১ ১/২ কাপ

· ভেজিটেবিল অয়েল- ৪-৫ চামচ

· ফিলো শিট – ২০ থেকে ২৫

· পেস্তা – ১ কাপ

· কাঠ বাদাম কুচনো – ১ কাপ (ফুড প্রসেসর-এ ১ চা চামচ গোলাপ জল দিয়ে ক্রাশ করে নিতে পারলে ভাল হবে)

· চিনি – ১/২ কাপ

· পানি – ১/২ কাপ

· লেবুর রস – ১ টেবিল চামচ

· মধু (প্রয়োজন অনুসারে)

· কিছু লেবুর খোসা (মূলত খাবারে এসেন্স আনার জন্য ব্যবহার করুন)

প্রণালিঃ

প্রথমে একটি সসপ্যান ওভেনে দিয়ে তাকে গরম করুন… সসপ্যানটি গরম হয়ে গেলে তাতে চিনি আর পানি যোগ করুন। ভাল করে দুটিকে মিশ্রিত করতে থাকুন, যতক্ষণ না পর্যন্ত মিশ্রণদুটি ভালভাবে মিশে যায়। এরপর তাতে মধু, লেবুর খোসা যোগ করুন। প্রয়োজনে আপনি মিশ্রণটিতে লবঙ্গ যোগ করতে পারেন।  মিশ্রণটিকে আরও ভাল করে নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না পর্যন্ত চিনি সম্পূর্ণ দ্রবীভূত না হয়। প্রায় ২৫ মিনিট পরে ওতে লেবুর রস দিন। প্রস্তুত হওয়া সিরাপটি ঠান্ডা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিন।

অন্য আরেকটি পাত্রে কাজুবাদাম, পেস্তা, আমন্ড নিন। এর সঙ্গে চিনি, দারুচিনি এবং লবঙ্গ যোগ করুন। এরপর মিশ্রণগুলোকে ভাল করে মেশান। প্রয়োজনে মিক্সার গ্রাইন্ডারও ব্যবহার করতে পারেন।

আপনি অন্য একটি পাত্রে গলানো মাখনের সঙ্গে তেল যোগ করে দিন। এরপর এই দুটি মিশ্রণকে ভাল করে মিশ্রিত হতে সময় দিন।

আপনি ফিলো শিটগুলোকে ট্রের মধ্যে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আকার অনুসারে কেটে ফেলুন।

একটি ট্রেতে গলানো মাখন এবং তেলের মিশ্রণটি ভাল করে মাখিয়ে নিয়ে ওর উপরে ফিলো শিটগুলোকে দিয়ে দিন। একটার উপরে একটা শিট দেবেন এবং মাঝের লেয়ারে অবশ্যই মাখন এবং তেলের মিশ্রণ দিতে ভুলে যাবেন না যেন।

ফিলো শিটগুলো যখন একটার উপরে একটা ভাল করে সাজানো হয়ে যাবে, তখন শেষ ফিলো শিটের উপরে আগে থেকে তৈরি করে রাখা বাদাম, পেস্তা এবং কাজুবাদামের মিশ্রণটি দিয়ে দিন।

ট্রেতে হাত দিয়ে সমান করে মিশ্রণটি ছড়িয়ে দিন। সমানভাবে মিশ্রণটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়ে গেলে আবারও আগের প্রক্রিয়াতে একটা ফিলো শিটের উপরে আরেকটা ফিলো শিট দিয়ে দিন। এইভাবে ফিলোশিটগুলো শেষ হয়ে যাবে এবং সেই সময়ে আপনি ট্রেতে ছুরি দিয়ে বর্গাকার আকৃতির বাকলাভাগুলোকে কেটে ফেলার চেষ্টা করুন।

কাটা হয়ে গেলে মাঝের অংশ বরাবর অবশিষ্ট মাখন ও তেলের মিশ্রণ ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরপরে বাকলাভাসমেত ট্রেটি প্রি হিটেড ওভেনে ১৮০ সেন্টিগ্রেড তাপে ২০-৩০ মিনিট বেকড করুন। ট্রেটি বের করে এনে উপর থেকে চিনির সিরাপ ভাল করে মিশিয়ে দিন। এইভাবেই প্রস্তুত হয়ে যাবে বাকলাভা। প্রয়োজনে উপর থেকে পেস্তা, কাজুবাদাম কুচি ছড়িয়ে আপনি পরিবেশন করতে পারেন।