বাড়ির চাকরও কিন্তু আপনার বিনয় ও নম্র ব্যবহারের দাবিদার

ইসলাম একজন মানুষকে বিনয়ী করে তোলে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একজন বিনয়ী মানুষ ছিলেন, অত্যন্ত ভদ্র ও অমায়িক আচরণ ছিল উনার মাঝে। বিনীত ও নমনীয় একজন মানুষকে সবাই পছন্দ করে। এজন্য বলা হয়ে থাকে, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। ইসলামী জ্ঞান চর্চা মানুষকে বিনয়ী ও নম্র হতে শেখায়। কাউকে দেখে প্রথমে সালাম দেয়া, কুশল বিনিমিয় করা এগুলা ভালো আচরণের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে অহংকারী ও খারাপ আচরণের মানুষকে কেউ পছন্দ করেনা।

বিনয় মানুষের জীবনে শোভা-সৌন্দর্য বাড়ায়। বিনয়ী সবসময় ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। বিনয়ের মাধ্যমে সহজে অন্যের সঙ্গে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করা যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জন্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে মর্যাদাসিক্ত করেন। বিনয় ও নম্রতার আদেশ দিয়ে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, পদভারে তুমি তো কখনোই ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বতসম হতে পারবে না। (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৭)

প্রিয় নবী (সা.)-এর ব্যবহার-আচরণ ছিল বিনয় ও নম্রতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কোমল আচরণে তিনি মানুষকে আপন করে নিতেন। তার মুগ্ধকরা ব্যবহারের কারণে কেউ বুঝতেই পারতো না যে, তিনিই আল্লাহর প্রিয় রাসুল (সা.)। সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন এবং তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় বাস করতেন। যে কেউ যেকোনো মুহূর্তে তার সঙ্গে কথা বলতে পারতো। আল্লাহর রাসুলের বিনয় ও নম্রতার কথা কোরআনে উল্লেখ হয়েছে এভাবে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছিলেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার কাছ থেকে সরে পড়তো। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

কুরআন কারিম যেসব চরিত্রের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে, তন্মধ্যে একটি হলো বিনয়। বিনয় হলো দম্ভ-অহঙ্কারের বিপরীত। বিনয় অর্থ, অন্যদের চাইতে নিজেকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করা। যারা বিনয়ী তাদের চালচলন হবে আল্লাহ তায়ালার অসহায় বান্দাদের মতো। অন্যদের সাথে আচার ব্যবহার করবে আনত ও বিনম্র চিত্তে। চালচলন বা গতিবিধিতে যেমন বিনয় প্রকাশ পায়, তেমনি কথাবার্তায়ও প্রকাশ পায়। এমন কি উঠা-বসাতেও। যারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর। বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ স্বয়ং নম্র, তাই তিনি নম্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি কঠোরতার জন্য যা দান করেন না; তা নম্রতার জন্য দান করেন। নম্রতা ছাড়া অন্য কিছুতেই তা দান করেন না। (মুসলিম)।

বহুধা গুণের সমন্বয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। তন্মধ্যে বিনয় ও নম্রতার হার সিংহভাগ। মানুষের অন্যতম সুকুমার ভূষণ হলো-বিনয় ও নম্রতা।
ব্যক্তিজীবনে যে যতো বিনয়ী ও নম্র, সে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। বিনয়গুণ দিয়ে অন্যের চোখে বপন করা যায় ভালোবাসার বীজ। আর যারা আল্লাহর হুকুম পালন করে তারা শ্রেষ্ঠ বিনয়ী ও নম্র এবং তাদের বন্ধু আল্লাহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারাই দয়াময়ের প্রিয়বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ (আল-কুরআন, সুরা ফুরকান-৬৩)। বিনয় ও নম্রতা মানুষের মহৎ গুণ। যা মানুষকে অপরাপর সৃষ্টি থেকে আলাদা করেছে। পৃথিবীর সকল মহামানবের মধ্যেই এ গুণটি বিরাজমান। আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন নিতান্ত বিনয়ী। তাঁর বিনয় ও নম্রতার দিগদিগন্ত সর্বোৎকৃষ্ট, অনুপম। আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ, মুক্তির সোপান।

বাড়ির খাদেম বা চাকরের প্রতি আল্লাহর রসুল (স.) বিনয়ী ও নম্র ছিলেন। হযরত আনাস (রা.) ছিলেন তাঁর (স.) অন্যতম খাদেম। আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি দশ বছর রসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর খিদমত করেছি। তিনি (স.) কখনও আমার জন্য ‘উহ’ শব্দ বলেননি। কোন কাজ করে বসলে তিনি একথা বলেননি যে, ‘তুমি এ কাজ কেন করলে?’ এবং কোন কাজ না করলে তিনি বলেননি যে, ‘তুমি কেন করলে না?’ (বুখারি শরিফ, হাদিস নং৬০৩৮; মুসলিম শরিফ, হাদিস নং-৬১৫১)।
বিনয় ও নম্রতা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ও ইহ-পারলৌকিক মুক্তির মহৌষধ। সদাসর্বদা আমাদের এ মহৎ গুণটির চর্চা ও ব্যক্তিজীবনে এর প্রতিফলন নিতান্ত প্রয়োজন। আমাদের জীবনসত্ত্বা হতে প্রস্ফুটিত হোক বিনয় ও নম্রতার গুণ।