বিচ্ছেদ হলেও পারস্পরিক গোপনীয়তাকে সম্মান জানান

আমরা মুসলিমরা একটি অশান্ত সময়ে বসবাস করছি. 

প্রাচ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমস্যার কেন্দ্র হল রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং বিভাজনমূলক এজেন্ডা, তবে পশ্চিমে সমস্যাটা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের। যদিও আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শান্তিতে বসবাস করি, তবুও আমাদের পরিচয় এবং উপস্থিতি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যখন সমস্যা তৈরি হয়, তখন আমাদের ভাবাবেগ আহত হয়। 

আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হই, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হল বিয়ে, বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলিতে মুসলিম যুবকদের অধিকাংশই এই সমস্যায় জর্জরিত। বিয়ে বললে ভুল বলা হবে, বরং বিয়ে পরবর্তী যে বিষয়টি ভীষণ অপ্রিয় ও বিরক্তির জন্ম দেয় সেটি হল; বিবাহবিচ্ছেদ।

মাননীয় ইমাম আলি-র বর্ণনা অনুসারে বলা যেতে পারে:

“জটিল সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে গভীর বিশ্বাস অর্জন করা যায়।”

আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই, যা ব্যক্তিগতভাবে হয়তো অনেককে স্পর্শ করেছে, তা বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হোক কিংবা, কাছের বন্ধুবান্ধবের বিয়েতে ভাঙ্গন। বা নিজের অভিজ্ঞতাও হতে পারে।

যদি আপনি তালাকপ্রাপ্ত হন বা বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বা এমন কাউকে চেনেন যিনি এই অবস্থায় রয়েছেন, তাদের এই পরিস্থিতিতে সাহায্য জন্য আমি বিনীত ভাবে কয়েকটি পরামর্শ তুলে ধরতে চাই, যা তাদের সাহায্য করবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। 

পরামর্শ#১ : মন শক্ত করুন

মেনে নিতে কষ্ট হলেও এটা বাস্তব যে, আমরা যতগুলি বিয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাই, তার অন্তত 50% সফল হয় না। এখন বিবেচনা করতে হবে, অসফল বিয়ে থেকে মুক্তির কী উপায় রয়েছে। এর জন্য আপনি যা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তার জন্য সবাই কষ্ট পাবেন। সেই দম্পতি বা দম্পতির পরিবার এবং বন্ধু, সকলেই কম-বেশি কষ্ট পাবেন। এর জন্য আল্লাহকে স্মরণ করুন এবং তিনি সমস্ত কিছু দেখছেন। আপনি কী পদক্ষেপ করছেন তার মাধ্যমে বোঝা যাবে আপনি মনে কতটা বিশ্বাস রাখেন, তাই এই কঠিন পরিস্থিতিতে আপনার বিশ্বাসকে পরীক্ষা করে দেখুন।

পরামর্শ#২ : সংবেদনশীল হোন

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা এবং অশান্তির মধ্যে মাথা ঠান্ডা রেখে বাস্তবসম্মত ভাবনাচিন্তা করা খুবই কঠিন। যে পদক্ষেপকে আপনি সারা জীবনের পরিকল্পনা ভেবেছিলেন এখন তা ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে। আপনি যাকে তালাক দিচ্ছেন বা যিনি আপনাকে জোর করে তালাক দিচ্ছেন সেই ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা সম্মান ক্ষুণ্ণ করার জন্য আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত কেউ প্ররোচিত করলে, তার দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।

পরামর্শ#৩ : আপনি যা জানেন তা সবাইকে জানাবেন না 

সম্পর্কের অন্যতম মূল বিষয় হল পারস্পরিক গোপনীয়তা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করা। কিন্তু যখন আপনারা আলাদা হয়ে যান, আপনার মনে হতে পারে অপর ব্যক্তির সমস্ত গোপন বিষয় যা এতদিন শুধুমাত্র আপনারা দুজন জানতেন সেই সমস্ত কিছু সবাইকে জানিয়ে দেবেন। এভাবে অপর পক্ষকে বদনাম করার মাধ্যমে আপনার মনের কষ্ট কম হবে, এটা আপনি ভাবতেই পারেন। কিন্তু যখন আপনারা পরস্পরকে বিশ্বাস করতেন সেই সময়ে আপনারা কী বলেছিলেন, শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সময়ে আপনারা কী প্রকাশ করেছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কী অনুভব করেন, এই ধরনের যে কোনও তথ্য বাইরের লোকের কাছে প্রকাশ করা অনৈতিক। মনে রাখবেন, এগুলি আপনার ঘনিষ্ঠ সময়ের কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত। আপনার ভিতরের শয়তান সেগুলি ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিকে আঘাত করার জন্য আপনাকে লোভ দেখালেও তাতে সায় দেবেন না। কোনও মতেই নিজের বিবেক এবং আদর্শের সাথে আপস করবেন না।

পরামর্শ#৪ : একজন খারাপ মানুষে পরিণত হবেন না

যে কোনও ভুল কাজ আপনাকে খারাপ ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে, আপনি তা পছন্দ করুন বা না-ই করুন। আপনার আবেগ কোনও ধরনের মিথ্যা কথা বলা, কোনও কিছু অতিরঞ্জিত করা বা আপনার প্রাক্তন যদি ভুল কিছু বলে বা করে থাকে, তার প্রতিশোধ নেওয়ার অজুহাত নয়। আমরা সকলেই চাই যাতে এই কঠিন সময়ে সকলে আমাকে সমর্থন করে। আপনার সিদ্ধান্ত বা চিন্তাভাবনায় কোনও ভুল থাকলে সেই অপরাধবোধ ঢাকা দেওয়ার জন্য নানা যুক্তি দিয়ে সেগুলি ন্যায়সঙ্গত করে তোলার চেষ্টা করতে পারেন। তাই আপনি যা বলছেন তা বোঝার চেষ্টা করুন, হয়তো যা বলছেন তাতে আপনার সাময়িক ভাবে ভালো লাগছে। কিন্তু আপনি কীভাবে নিজের বিবাহবিচ্ছেদ মেনে নেবেন, তা আপনার অন্তর জানে। ছোট সম্প্রদায়গুলিতে, ভবিষ্যতে যিনি আপনার সঙ্গী হতে পারেন তিনি জেনে যাবেন যে আপনি কী করেছিলেন এবং এর ফলে তিনি হয়তো আর আপনার সাথে সম্পর্ক তৈরি করা নিরাপদ বলে মনে করবেন না. ফলে সতর্ক থাকুন।

পরামর্শ#৫ : ধৈর্য রাখুন, সব ঠিক হবে 

যদি আপনার বিরুদ্ধে ক্ষতিকারক গুজব, মিথ্যা বা অতিরঞ্জন করা হয়েছে বলে জানতে পারেন তাহলে তার প্রতিশোধ নেবেন না। পরিবর্তে, বিশ্বাস রাখুন যে সমস্ত গোপন বিষয় একদিন আল্লাহ সবার সামনে তুলে ধরবেন। অনেক সময় আমি দেখেছি, শত্রুরা তাদের নিজস্ব কথার ফাঁদে আটকে পড়ে। আপনার ধর্ম যাই হোক না কেন, আমরা সকলেই এমন একটি শক্তিতে বিশ্বাস করি যা মন্দকে কঠিন শিক্ষা দেয় এবং ভালোর প্রতিদান দেয়। শুধু এই পৃথিবীই নয় এবং তার পরে যে দুনিয়া আছে, উভয় ক্ষেত্রেই। মনে রাখবেন, প্রত্যেক রাতের পর অবশ্যই ভোর হয়।

পরামর্শ#৬ : লিঙ্গ-বৈষম্য করবেন না 

বিবাহবিচ্ছেদ এমন একটি ঘটনা যা নারী এবং পুরুষ, উভয়কেই সমানভাবে কষ্ট দেয়। কিন্তু যদি সমাজ অনেক সময়ে তার দ্বিচারী মনোভাবের জন্য আপনাকে বেশি মাত্রায় আঘাত করতে পারে, কিন্তু লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে আঘাত করা কখনওই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। মনে রাখবেন, পুরুষরাও খুব কষ্ট পান, তবে তাঁরা প্রকাশ করেন না। কোনও মহিলা সম্পর্কে খারাপ কথা বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার বিবরণ সম্পর্কে অশালীন কথা বলা কোনও পুরুষেরই উচিত নয়। তিনি জানেন না, ওই মহিলাকে কী সহ্য করতে হয়েছে এবং তিনি নিজেকে কীভাবে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। বিয়ের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ভাঙবেন না, এটি আপনার চেয়ে তাঁর পক্ষে অনেক বেশি কঠিন বিষয়।

আমরা আশা করি, এই কথাগুলি তাদের কিছুটা হলেও সাহায্য করবে যাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে বা যারা এখনও বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।