বিটকয়েন হালাল নাকি হারাম? এর শরয়ী বিধান কী?

ব্যবসা ০৫ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
বিটকয়েন
Photo by Pixabay from Pexels

বিটকয়েন এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি। ক্রিপ্টো শব্দের অর্থ গোপন, আর কারেন্সি শব্দের অর্থ মুদ্রা। সহজ কথায় বলতে গেলে গোপন কোনো মুদ্রা, যা ধরাও যায় না, ছোঁয়াও যায় না তাই-ই ক্রিপ্টোকারেন্সি। এমনিকি এর নিজস্ব কোনো মূল্যমানও নেই। একে ভার্চুয়াল মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা বা অনলাইন কারেন্সিও বলা হয়। এর লেনদেনের জন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজন হয় না।

বিটকয়েন ও মুদ্রার তিন শর্ত

অর্থাৎ, বিটকয়েন কোনো কারেন্সি বা প্রচলিত মুদ্রা নয়। এটি মুদ্রার কোনো শর্তই পূরণ করে না। কারণ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত মুদ্রা ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা অর্থাৎ, দিনার ও দিরহাম। এই ইসলামী মুদ্রা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে-

১) মুদ্রা পণ্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি হতে হবে অর্থাৎ, এটি দাম ও মজুরীর নিরুপনকারী হতে হবে।

২) কেন্দ্রীয় কোনো কর্তৃপক্ষ মুদ্রার প্রচলন করবে; যারা এই মুদ্রার প্রচলনের দায়ভার বহন করবে এবং এই কর্তৃপক্ষ অজানা কেউ হতে পারবে না।

৩) এই মুদ্রা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সকলের জন্য সহজলভ্য হতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মাঝে শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ হলে চলবে না।

উপরিউক্ত শর্ত তিনটি বিটকয়েন এর উপর আরোপিত করলে এটি পরিষ্কার হয় যে, বিটকয়েন এই তিনটি শর্তের একটিও পূরণ করে না।

বিতকয়েন পণ্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম মাত্র।

কোনো জ্ঞাত পক্ষ কর্তৃক এর প্রচলন হয়নি, বরং এর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

বিটকয়েন মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য নয়। এবং এটি তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ যারা এটি বিনিময় করে এবং এর মূল্য স্বীকার করে। অর্থাৎ, এটি সমাজের সকল স্তরের মানু্ষের জন্য নয়।

সুতরাং, বিটকয়েন ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে কোনো মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত নয়।

বিটকয়েনের সংজ্ঞা তাহলে কি?

সুতরাং, বিটকয়েন একটি পণ্য ব্যতিত আর কিছুই নয়। তথাপি, এই পন্য একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে ছাড়া হয়, যার মূল কারও জানা নেই। উপরন্ত, এটি প্রতারণা, ফটকাবাজি ও ধোঁকাবাজির বিশাল একটি ক্ষেত্র। তাই এ হিসেবেও এতে ব্যবসা করা বৈধ নয় অর্থাৎ, বিটকয়েন কেনা ও বেচা বৈধ নয়।

বিশেষত বিটকয়েন যেহেতু অজ্ঞাত একটি উৎস হতে ছাড়া হয়, তাই এটি সুদৃঢ় সন্দেহ তৈরি করে যে, হয়ত এর সাথে বড় পুঁজিবাদী দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট রয়েছে। অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে বড় কোনো মাফিয়া গ্যাং কিংবা আন্তর্জাতিক বড় কোনো জুয়া কোম্পানি, মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার কিংবা সংঘটিত অপরাধচক্র এর সাথে জড়িত রয়েছে। এরকম না হলে এর উৎস গোপন করা হয় কেন?

অর্থাৎ, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিটকয়েন অজ্ঞাত কোনো উৎস হতে ছাড়া কেবল একটি পণ্য যার কোনো প্রকৃত মূল্য নেই। তাই এটি প্রতারণা ও জোচ্চুরির জন্য উন্মুক্ত একটি মাধ্যম।

এ কারণে বিটকয়েন ক্রয় করা বৈধ নয়। যেহেতু ইসলামী শরীয়ত দলীল অজ্ঞাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করতে সম্পূর্ণরুপে নিষেধ করেছে।

বিটকয়েন হারাম ও নাজায়েজ হওয়ার দলিল

আবু হুরায়রা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ‘হাসাহ’ ও ‘গারার’ ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেছেন। (মুসলিম)

আরেকটি হাদিসে অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। এবং সেখানে ‘হাসাহ’ ব্যবসা বলতে বোঝানো হয়েছে, যখন বিক্রেতা ক্রেতার কাছে কাপড় বিক্রির সময় একথ বলে, ‘আমি আপনার কাছে তা-ই বিক্রি করব যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ অথবা ‘আমি আপনাকে সেই জমিই বিক্রি করব যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ সুতরাং, যা বিক্রি হচ্ছে তা জ্ঞাত নয়। এবং এরকমের ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গারার ব্যবসা বলতে বোঝানো হয় যা অনিশ্চিত। অর্থাৎ, এটি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। যেমন পানির মধ্যে থাকাবস্থায় মাছ বিক্রি করা, কিংবা গর্ভবতী পশুর গর্ভে যা আছে তা বিক্রি করা ইত্যাদি। এরকম অনিশ্চিত ব্যবসাও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে গারার ব্যবসা বা অনিশ্চিত ব্যবসা, যা বিটকয়েন এর বাস্তবতা, যা একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া একটি পণ্য এবং গোপন কোনো পক্ষ হতে প্রচলন করা হয়। তাই এটি ক্রয় বা বিক্রয় বৈধ নয়।

এসকল দলিলের আলোকেই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ, তুরস্কের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মিসরের কেন্দ্রীয় ফতোয়া বিভাগ, ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় ফতোয়া বিভাগ, ও ইসলামিক ইকোনমিক ফোরাম নামক ইসলামিক স্কলারদের একটি অনলাইন গ্রুপ বিটকয়েনকে নাজায়েজ বা হারাম হিসেবে ফতোয়া দিয়েছে।

এছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই বিটকয়েন সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়নি। যদিও এত প্রতিকূলতার মাঝেও বিশ্বের বড় বড় অসাধু ব্যবসায়ীর হাত ধরে এরই মধ্যে তারা একটি শক্ত অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে।