বিরহকে ভাষা দেওয়া এক ফার্সি ‘প্রেমিক’-এর কাহিনী

mirza ghalib

কোনো এক ব্যক্তি বলেছিলেন গালিব হলেন সেই প্রেমিক “ফার্সি  যার প্রথম প্রেম”।

ফার্সির ক্লাসিক্যাল লেখক ও উর্দু ভাষা পথিকৃৎ হিসেবে ইতিহাসে যার নাম বারবার উচ্চারিত তিনি হলেন মির্জা গালিব। মোঘল সাম্রাজ্য এর পতন, কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠা আর ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার প্রথম সংগ্রাম তিন সূত্রের সন্ধিক্ষণ তিনি খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছেন। গজল হোক কিংবা শায়েরি-ইতিহাসে তার মতো দ্বিতীয় জুড়ি পৃথিবীতে আর নেই। সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ অথবা একজন পন্ডিত, তার গজল শুনে সকলেই বিহ্বল হয়ে পড়েন। জীবনে আসা প্রতিটা বাধাকে স্বাচ্ছন্দ্যে তিনি অতিক্রম করেছেন। এই সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা গালিবের জীবন সংগ্রাম তার সৃষ্ট কবিতার চেয়েও নাটকীয়।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের পদধ্বনি রচিত হয়েছে এই ভারতবর্ষে। একজন তুর্কিও এখানে এসেছিলেন জীবিকার তাগিদে, ভাগ্যান্বেষীর আগ্রায় আশ্রয় নেয়। তার ছেলে আবদুল্লাহ বেগ খান ও নাসরুল্লাহ বেগ খান। আবদুল্লাহর পুত্র আসাদুল্লাহ বেগ খান যিনি মির্জা গালিব নামে পরিচিত, তিনি নাসরুল্লাহর কাছে মানুষ হন। গালিবের ভাগ্য ভালো ছিল না, বাবার মৃত্যুর পর চাচারও মৃত্যু। নবাবের প্রচেষ্টায় মৃতের পরিবার হিসেবে তার কাছে বাৎসরিক ৭৫০টাকা আসে। আর মা সম্ভ্রান্ত বংশের বলে কিছু অর্থ আসত। এই জীবন সম্পর্কে তার উপলব্ধি এক গজলের সৃষ্টির ইতিহাস –

“বাজিচায়ে আতফাল হ্যায় দুনিয়া মেরে আগে,

হোতা হ্যায় সব রোজ তামাশা মেরে আগে।”

আগ্রাতেই তার হাতেখড়ি। মাদ্রাসার এক শিক্ষক মুহম্মদ মুয়াজুম এর কাছে তৎকালীন ইসলামিক শিক্ষার  রীতি আরবি ভাষা ও ধর্ম এর শিক্ষালাভ করেছিলেন। সরকারি বদৌলবি হিসাবে ফারসিও তখন থেকেই তার শেখা। হঠাৎ তাঁর জ্ঞান ও  চিন্তাধারা পাল্টে দেন  এক জনৈক ব্যক্তি যিনি প্রথমে জরাথ্রুস্টনীতি বিশ্বাসী হলেও পরে ইসলাম এ দীক্ষা নেন, তিনি হলেন অবদুস সামাদ। দুবছর পরিবারে একসাথে অবস্থানের কারণে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করার সুযোগ মেলে। কোনো ক্ষুদ্র গন্ডির বাইরে এই চিন্তাধারা ছিল অসীম। আরবি-ফারসি ভাষা শুধু নয়, বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তার চিন্তাধারা ও জ্ঞান যেকোনো মানুষের মনে ঈর্ষার সৃষ্টি করত। জীবন সম্পর্কে গালিবের মনে মনে বিষাদ ও সম্পর্কের তিক্ততা তৈরী হয়েছিল।

আগ্রার মকতবে শায়েরি লেখার হাত পুরোপুরিভাবে পাকাপোক্ত করেন তিনি। ফার্সি ছিল তাঁর লেখার মাধ্যম আর উর্দু ছিল প্রকাশ করার মাধ্যম। তখন সমাজে উর্দু বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছিল। প্রথম প্রথম ফারসি সাহিত্য এর প্রাণপুরুষের অণুকরন করত গালিব। আবদুস সামাদ এর সাহায্যে এদের সাথে পরিচয় হয়। কিন্তু এদের অণুকরনে কোনো কবিতার সৃষ্টি করেননি গালিব। চরম হতাশা কখনো গালিব কে গ্রাস করতে পারেনি। তাই তার অগ্রগতি অসামান্য।

“ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতে, কলঙ্ক থেকে বাঁচতে

হয়,

তোমার ধুলার ঘোমটা পরার ব্যপারটা বড়ই বাড়াবাড়ি নয় কি!”

গালিব বিয়ে করেছিলেন তেরো বছর বয়সে। কিন্তু তিনি চিঠি লিখতেন এক প্রেয়সীকে ‘ডোমনি’ সম্বোধনে, এই শব্দের অর্থ একাধারে গায়িকা ও একাধারে নর্তকী। সমাজের রীতির ভয়ে সেই প্রেয়সী আত্মহত্যা করেন। তাতে গালিব বিহ্বল হয়ে পড়েন, বিরহ ধীরে ধীরে তার জীবনে প্রবেশ করে। সৃষ্টি হয় নানা বিখ্যাত গজল।

জুয়াখেলা ও মদের নেশা তার অবস্থা শোচনীয় করে তোলে, ধার দেনা শুরু হয়।

ভাষার প্রতি অনুরাগ তার প্রথম থেকেই। মাতৃভাষার প্রতি সম্মান তার মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়।মাতৃভাষা ছাড়া নিজের ভাষা ব্যক্ত করা অন্য ভাষাতে কখনোই সুন্দর হয় না।

“না সাতারিশ কি তামান্না,না দিলে কি পারওয়া

গার নেহি হ্যায় মেরে আশার ম্যায় থানি না সাহি।”

কলকাতা আসেন ১৮২৮ সালে। যে জন্য আসা তা সফল হয়নি। পারিবারিক অর্থ না নিয়েই ফিরতে হয়েছিল দিল্লিতে, কিন্তু কলকাতার সামাজিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারা তাকে প্রভাবিত করেছিল।

১৮৪১ সালে ১১০০ টি শায়ের প্রকাশিত হয় প্রথম দিওয়ানে। চারবার পুর্নমুদ্রন হয়েছিল। মানুষ অলীক কল্পনার জগতে থাকতে ভালোবাসে কিন্তু বাস্তবকে উপলব্ধিও মেনে নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এটাই করে দেখিয়েছিল মির্জা গালিব।

তার বাস্তব জ্ঞান, ধর্ম, প্রেম সমস্ত কিছু এক অদ্ভুত পরিমন্ডল এ বিস্তৃত ছিল।

জীবনের ওঠানামার সুর, বাস্তবতার প্রতি পদে দেওয়া আঘাত, বেদনা, হতাশা, নিয়তি আর অজানা চাওয়া-পাওয়া র সমীকরণে কলম চালিয়ে ছিলেন তিনি। ধর্মের আচার বিচার এ তার মনোযোগ ছিল না। অন্তরের দিকেই তার মন ছিল, যার ফলে তখনকার ধর্মতত্ত্ববিদ দের ক্ষোভে পড়তে হয়েছিল তাকে।

আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে যে মেলবন্ধন,সেটা ব্যক্ত করেছিলেন।

“কাহো কিসসে ম্যাঁয় কি কিয়া হ্যাঁয় শাবে গাম

বুরি কলা হ্যায়,

মুজে কিয়া বুরা থা মারনা আগার এক বার হোতা?”

-এই নিঃসঙ্গ আর বিষন্ন রাতের অভিযোগ আমি কার কাছে করব? প্রতি সন্ধ্যায় মরার চেয়ে একেবারে মৃত্যুটাই কি শ্রেয় ছিল না?