বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, নিজভূমে বিস্মৃত নোবেলজয়ী

প্রফেসর আবদুস সালাম সারা বিশ্বে প্রথম মুসলমান বিজ্ঞানী যিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রথম নোবেল জয়ী এই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ১৯৭৯ সালে স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেল্ডন লি গ্ল্যাশোর সাথে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। আবদুস সালামের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক (তড়িৎচুম্বক) ফোর্স ও দুর্বল নিউক্লিয়ার ফোর্সের একত্রীকরণ তত্ত্ব আজও জনপ্রিয়।

বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বে মহাবিস্ফোরণকে দেশকালের অবিচ্ছিন্ন পটভূমির এক ব্যতিক্রমী বিন্দু বলা হয়ে থাকে। আবদুস সালামকেও বোধ হয় বিজ্ঞানের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে স্বল্প কয়েকজন ব্যক্তিক্রমী ব্যক্তিত্বের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর আবির্ভাব ঐ মহাবিস্ফোরণের মতোই যা সাধারণ নিয়ম-কানুন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না— যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না গ্যালিলিও, নিউটন, ম্যাক্সওয়েল এবং আইনস্টাইনের আবির্ভাবকে।

পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রফেসর আবদুস সালামের সত্যিকারের বিচরণ শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে যখন তিনি ব্রিটেনের কেমব্রিজে পড়তে আসেন। মহাকর্ষ বলের সাথে অন্যান্য বলগুলোর ঐক্য খুঁজতে আলবার্ট আইনস্টাইন ও এনরিকো ফার্মি যে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন, প্রফেসর আবদুস সালাম কেমব্রিজে এসে গবেষণায় সফল হন।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭৯- এই বত্রিশ বছর ধরে যাঁরা চেনেন তাঁকে, পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁরা মোটেও অবাক হননি। কিন্তু সবাই খুব অবাক হয়েছেন নোবেল পুরষ্কারের অনুষ্ঠানে তাঁর পোশাক দেখে। কারণ শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতেই প্রফেসর আবদুস সালাম দামী থ্রি-পিস স্যুট পরতে অভ্যস্ত। তাই বিশেষ দিনে তাঁকে দেখা গিয়েছিল কালো লম্বা গলাবদ্ধ কোটের সাথে সাদা সালোয়ার পরনে, পায়ে জরির নাগরা জুতো, আর মাথায় সাদা পাগড়ি। এই  বিশেষ পোশাকের পিছনে এই বিজ্ঞানীর যুক্তি ছিল নিজের শিকড়ের প্রতি সম্মান।

১৯২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সাহিয়াল ঝেলার সান্তোকদাস এলাকায় তার জন্ম হয়।  ছেলেবেলা থেকেই তুখোড় মেধাবী আবদুস সালাম তিন বছর বয়স থেকে বাড়িতে লেখাপড়া শেখা শুরু করে দেন। লেখা পড়ায় তার চরম আগ্রহ ছিল। ১৯৩২ সালে ছয় বছর বয়সে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি না হয়ে আবদুস সালাম স্থানীয় ঝাং স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন।
ভাল ইংরেজি শেখানোর জন্য তার বাবা ছেলেকে ১৯৩৮ সালে লাহোরের সেন্ট্রাল মুসলিম মডেল স্কুলে ভর্তি করে দেন। নতুন স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষাতেই আবদুস সালাম মোট ৭০০ নম্বরের মধ্যে ৫৯১ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪০ সালে আবদুস সালাম মেট্রিক পরীক্ষায় ফার্স্ট স্ট্যান্ড অধিকার করেন। অর্জন করেন লাহোরের পরীক্ষার্থীদের মাঝে সবোর্চ্চ নম্বর প্রাপ্তির কৃতিত্ব। মেট্রিকে প্রথম হয়ে আবদুস সালাম সরকারি বৃত্তি মাসিক বিশ রুপি ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কাছ থেকে মাসিক তিরিশ রুপি বৃত্তি পান।

১৯৪২ সালের এফ-এ পরীক্ষায় ৬৫০ নম্বরের মধ্যে ৫৫৫ নম্বর পেয়ে সমগ্র পাঞ্জাবের মধ্যে প্রথম হলো আবদুস সালাম। আবদুস সালাম লাহোর সরকারি কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। লাহোর সরকারি কলেজে গণিতের প্রফেসর সর্বদমন চাওলার সংস্পর্শে এসে আবদুস সালামের গণিতের প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মায়। ১৯৪৪ সালের বিএ পরীক্ষার ফলাফলে পাঞ্জাবে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে প্রথম হন আবদুস সালাম। পাশাপাশি অতিরিক্ত ইংরেজি বিষয়ে অনার্সের পরীক্ষাও দিয়েছিলেন আবদুস সালাম। ইংরেজিতেও রেকর্ড মার্ক পেয়ে অনার্স পাশ করেন তিনি। এ কৃতিত্বে তার সরকারি ও আহমদিয়া একাডেমি মিলিয়ে মাসিক বৃত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২০ রুপি।
১৯৪৬ সালের এম.এ পরীক্ষায় ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৫৭৩ নম্বর পেয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেন আবদুস সালাম।

১৯৪৬ এর সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটিশ জাহাজ ফ্রাংকোনিয়ায় চড়ে কেমব্রিজের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে গণিতে ও পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে যখন আবদুস সালাম কেমব্রিজের বিজ্ঞানীদের মাঝে নিজের জায়গা করে নিচ্ছিলেন তখন ব্রিটিশরা তাদের ভারত সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়।

১৯৫০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য পাঠ্যাবস্থায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় আবদুস সালামকে স্মিথ পুরষ্কারে ভূষিত করে। পরের বছর ১৯৫১ সালে তিনি তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। বিখ্যাত ফিজিক্স জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউতে তার দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

১৯৫৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক আহূত শান্তির জন্য পরমাণু সম্মেলনের তিনি বৈজ্ঞানিক সচিব নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় আবদুস সালামকে সম্মানসূচক ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৫৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় আবদুস সালামকে হপ্‌কিন্স পুরষ্কার দেয় । আবদুস সালামের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য অবদান হলো মৌলিক কণাগুলোর শ্রেণীকরণের জন্য গণিতের গ্রুপ থিওরির ব্যবহার।

১৯৫৯ সালে আবদুস সালামকে সিতারা-ই-পাকিস্তান খেতাব দেয়া হয়। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় বিজ্ঞান কমিশনের সদস্য ও শিক্ষা কমিশনের উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান।
১৯৬১ সালে প্রফেসর আবদুস সালামের নেতৃত্বে পাকিস্তানের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ১৯৬৫ সালে আবদুস সালামের নেতৃত্বে পাকিস্তানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রও স্থাপিত হয়। ১৯৭২ সালে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প গ্রহণ করে। মূল উদ্দেশ্য ভারতের পারমাণবিক প্রকল্পের জবাব দেয়া। প্রফেসর আবদুস সালামকে এই প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৭ সালে এর ডিজাইন সম্পন্ন হয়।

প্রফেসর আবদুস সালামের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স ও দুর্বল নিউক্লিয়ার ফোর্সের একত্রীকরণ তত্ত্ব। যার জন্য ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে ২১ নভেম্বর ৭০ বছর বয়সে প্রফেসর সালাম ইন্তেকাল করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে পাকিস্তানের আসমাদি শহরে দাফন করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর সমাধির উপর ‘মুসলিম’ শব্দটি মুছে দিয়েছে একদল জনতা। কারণ সালাম আহমদীয়া সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন। আর পাকিস্তানে ১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো এক নির্দেশিকায় আহমদীয়াদের অ-মুসলিম ঘোষণা করেন।