বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ আজ ধ্বংসের মুখে 

ইতিহাস Contributor
ফোকাস
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ

হায়দ্রাবাদের হজরত সৈয়দ শাহ ইমাদউদ্দিন মাহমুদ আল হুসেইনি দরগা থেকে মাত্র ঢিল ছোড়া দূরত্বে, মির আলম জলাশয়ের ঠিক পারে চোখে পড়ে অপূর্ব কিন্তু জরাজীর্ণ কুতুব শাহী স্থাপত্য। এই স্থাপত্য, স্থানীয়দের কাছে যা জিনও কি মসজিদ নামে পরিচিত, আদতে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ।

আয়তনে দশ বর্গকিলোমিটারেরও কম এই মসজিদের আকারে কিন্তু ইসলামী স্থাপত্যের কোনও খামতি নেই। উঁচু কৌণিক মিনার ও বড় আর্চ ও তার নিচে ঈমানদার মুসলমানদের প্রার্থনার জায়গা। সব মিলিইয়ে ইসলামের যেকোনো পবিত্র মসজিদের অনুভূতি দেয় এই ছোট্ট মসজিদ। আদর করে স্থানীয়রা একে খুদে মসজিদ বলে।

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ-এর ইতিহাস 

ঐতিহাসিকদের মতে, হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত সুফি সৈয়দ শাহ ইমাদউদ্দিন মাহমুদ আল হুসেইনি, মতান্তরে মীর মাহমুদ নিমাতুল্লাহির বসবাসের জন্য প্রথমে এই দরগা স্থাপিত হয়। তারপর, তাঁর প্রার্থনার জন্য গড়ে তোলা হয় এই মসজিদ। কথিত আছে,প্রতিদিন এশার নমাজ আদায় করার পর সুফি সাহেব নাকি ধীর পায়ে মসজিদ থেকে দরগায় ফিরে আসতেন। একমাত্র সহি মুসলমানরাই নাকি তখন তাঁর শরীর দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পেত। গভীর রাতে ঐ মসজিদের নাকি বিদগ্ধ জিনরা নেমে আসত প্রার্থনার জন্য। তাই জন্যই মসজিদের নাম জিনও কি মসজিদ।

‘ল্যান্ডমার্কস অফ ডেকান’ বইয়ে ঐতিহাসিক সৈয়দ আলি আসগর বিলগ্রামী লিখেছেন, “সুফি সৈয়দ শাহ ইমাদউদ্দিন মাহমুদ আল হুসেইনি প্রাচীন নজফ বা মেসোপটেমিয়া থেকে ভারতে পা রেখেছিলেন। তখন ভারতবর্ষে সুলতান আব্দুল্লা কুতুব শাহর রাজত্ব। সুফিসাহেবের শান্তির বানী ও জ্ঞানের মুগ্ধ হয়ে সুলতান তাঁকে মীর আলম জলাশয়ের পারে টিলায় বসবাস করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপরেই ক্রমশ দরগা ও মসজিদের পত্তন।”

মসজিদ নির্মাণে খরচ 

সুফি মাহমুদ অবশ্য শুধুমাত্র দরগা ও মসজিদের পত্তন করেই ক্ষান্ত দেননি, তাঁর দরগা ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল জনবসতি। আর কথিত আছে, যে সমস্ত মিস্ত্রিরা কাজ করতেন তাদের সুফি সাহেব প্রকৃত মজুরির থেকে অনেক বেশি মজুরি দিতেন। আর মহিলা মিস্ত্রিদের মজুরি ছিল সোনার মোহরে। ঠিক কোথা থেকে সুফি সাহেবের অর্থ ও অন্ন সংস্থান হত তা অবশ্য কারোরই জানা ছিল না। কেউ বলেন, স্বয়ং সুলতান তাঁকে অর্থসাহায্য করতেন। কেউ বলেন, আল্লাহর সেবকের অর্থের অভাব হয় না। মসজিদের কোটরে ধুলো মাখা রুটিও খেয়ে শেষ করা যায় না আল্লাহর কৃপা থাকলে।

সুলতান কুতুব শাহ মোট ৬০০ একর জমি দিয়েছিলেন সুফি সৈয়দ শাহ ইমাদউদ্দিন মাহমুদ আল হুসেইনিকে। দরগা ও মসজিদ স্থাপন করার পর সেখানে আস্তে আস্তে জনবসতি গড়ে ওঠে। মূলত সুফি সাহেবের সাহাবি ও সেবকের পরিবার বসবাস শুরু করে ঐ অঞ্চলে।

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ-এর বর্তমান অবস্থা 

দরগার চত্বরের মধ্যে অবস্থিত হলেও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের আশু প্রয়োজন। এককালে অপূর্ব সুন্দর কাঠামো থাকলেও এখন সেটির জরাজীর্ণ দশা। স্থানে স্থানে চুন ও প্লাস্টার উঠে ভিতরের ইট বেরিয়ে গিয়েছে। মসজিদের মূল আর্চ ও পাথরের মেঝেতে ফাটল ধরেছে। সবচেয়ে মায়া লাগে মিনারগুলি দেখলে। এককালে যে মিনার থেকে আযানের আওয়াজ শোনা যেত, আজ তা ভেঙে পড়ছে। দরগা থেকে মসজিদে পৌঁছনোর পথটিও অত্যন্ত ভাঙা ও জঙ্গলাকীর্ণ।

প্রতি বছর ১৩ শাবানে উরসের সময় এই দরগা চত্বর জমজমাট হয়ে ওঠে, তখন জরাজীর্ণ হলেও মানুষের সমাগমে উজ্জ্বল হয়ে থাকে হায়দ্রাবাদের সকলের প্রিয় এই খুদে মসজিদ।