বিষণ্ণতা কাটাতে ফল দেবে ফজরের নামাজ, দাবি বিজ্ঞানীদের

رمضان كريم

আল্লাহ্‌র রহমতসমূহের একটি হলো ঘুম। দিন শেষে মানুষ ঘুমের জন্য সানন্দে প্রতীক্ষা করে ও পরবর্তী দিনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের কথা ভাবে। সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত কারণের জন্যও ঘুমের গুরুত্ব আছে। তবে, বিভিন্ন গবেষণায় পর্যাপ্ত ঘুমের সঠিক পরিমাণের পার্থক্য দেখা যায়। কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে প্রত্যেকের দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টার ঘুমের প্রয়োজন।

যাইহোক, নবী মুহাম্মদ (সাঃ) রাতে খুব অল্প কয়েক ঘণ্টা ঘুমাতেন এবং রাতের একটি অংশকে ইবাদতের কাজে লাগাতেন। গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে কিছু মানুষের জন্য এই অভ্যাস স্বাস্থ্যকর হতে পারে।

স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত কারণের জন্য ঘুমের গুরুত্ব আছে। ঘুমের স্বল্পতার কারণে মানসিক ব্যাধি হতে পারে, সম্পর্কে জটিলতা দেখা দিতে পারে, কাজে অনুপস্থিতি এবং এমনকি রাস্তায় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। গবেষকরা দেখেছেন যে, যেসব মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রারোগে ভুগছেন তারা অন্যদের চেয়ে বেশী মনস্তাতাত্ত্বিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকেন, এবং তাদের অনেক বেশি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়। (ইয়াং)।  নিদ্রালুতার কারণে প্রজনন ক্ষমতা হারানোর ফলে প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি এডমিনিস্ট্রেশন এর অনুমান অনুযায়ী অবসাদজনিত কারণে প্রতি বছর ১ লক্ষেরও বেশি গাড়ির দুর্ঘটনা ঘটছে। (ইয়াং) একারণে, কিছু গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে যে প্রত্যেকের দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টার ঘুমের প্রয়োজন। যাইহোক, গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে কিছু মানুষের জন্য নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অভ্যাস স্বাস্থ্যকর হতে পারে।

আধুনিক গবেষণা বলছে যে অনেক মানুষের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ স্বাস্থ্য পরামর্শ হতে পারে। অনেক গবেষণায় ঘুমের স্বল্পতা বা ঘুমের ঘাটতি কার্যত কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এক মিলিয়নেরও বেশি আমেরিকানদের উপর ছয় বছর ব্যাপী গবেষণায় জানা গেছে যে রাতের ভালো ঘুম সাত ঘন্টা স্থায়ী হয়। আরো জানা গেছে যে যেসব মানুষ আট ঘন্টা বা আট ঘন্টার বেশি ঘুমান তারা একটু তাড়াতাড়ি মৃত্যুবরণ করেন। গবেষক দলের নেতা ড্যানিয়েল এফ. ক্রিপকি, এমডি বলেন, “আপনাদের আসলে আট ঘন্টা ঘুমের দরকার নেই এবং এটা নিয়ে চিন্তারও দরকার নেই। রাতের নিরাপদ ঘুমের জন্য সাত, ছয়, বা এমনকি পাঁচ ঘন্টাই যথেষ্ট।” (ডিনুন)

ক্রিপকি ও তার সহকর্মীরা ১৯৮২ হতে ১৯৮৮ সালের মধ্যে আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি কর্তৃক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করেছেন। এই তথ্যগুলো ছিল মানুষের ঘুমের অভ্যাস ও স্বাস্থ্য বিষয়ক, এবং তারপর তারা এই বাছাইকৃত মানুষদের ছয় বছর পর্যবেক্ষণ করেন। এই গবেষণায় অংশ নেন ৩০ থেকে ১০২ বছর বয়সী মানুষ। মহিলাদের গড় বয়স শুরু হয়েছিল ৫৭ বছর থেকে এবং পুরুষদের গড় বয়স শুরু হয়েছিল ৫৮ বছর থেকে। অতিরিক্ত ঘুমের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ছিলেন শতকরা ৩৪ ভাগ মানুষ, শতকরা মাত্র ১২ ভাগ ছিলেন তারা যারা আট ঘন্টা ঘুমাতেন এবং শতকরা মাত্র ২২ ভাগ ছিলেন তারা যারা আরো কম সময় ঘুমাতেন।

প্রাপ্ত এই তথ্যগুলো ঔষধের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্যগুলোর সাথে মিলে যায়। জানা গেছে যে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ (অবশ্যই উপোস এবং একেবারেই না ঘুমানোর মত চরম পর্যায়ের বিষয়গুলো এই আলোচনায় বাদ দেয়া হয়েছে) এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। ক্রিপকি এমনকি এই বিবরণ দিয়েছেন যে, “যারা ৮-১০ ঘন্টা ঘুমান তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি মাঝারি ধরণের স্থূলকায় ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঝুঁকির সমান হারে বাড়ে।”

 

কিছু গবেষণায় বিষাদগ্রস্ততা কাটানোর জন্য এমনকি একেবারেই না ঘুমানোর পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। দি আমেরিকান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রি’র ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের পর্যালোচনা অনুযায়ী এক রাত জেগে থাকার পর শতকরা ৬০ ভাগ বিষাদগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ মানুষের মধ্যে উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। যারা সকালবেলা প্রচন্ড বিষাদ অনুভব করেন এবং দিনের পরবর্তী সময়ে ভালো বোধ করেন তারা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে উপকার পেতে পারেন (ইয়াং)। তবে, নির্ঘুম রাত কাটানো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয় এবং গবেষকরা প্রায়শই দেখে থাকেন যে ঘুমের  “স্বাভাবিক” সময়ে ফিরে যাওয়ার পর অনেক মানুষ পুনরায় ঘুমের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিকতর গবেষণায় দেখা গেছে যে পুরো রাত না ঘুমানোর সুফলের কারণ হচ্ছে ঘুম থাইরয়েডে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হরমোন (টিএসএইচ), যা আমাদের বিপাক প্রক্রিয়া এবং অপ্রত্যক্ষভাবে আমাদের এনার্জি লেভেলকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, তা নিঃসরণে বাঁধা দেয়। ধারণা করা হয় শতকরা ২৫ হতে ৩৫ ভাগ বিষাদগ্রস্ত রোগীদের নিম্ন মাত্রার টিএসএইচ থাকে।

 

একটি গবেষণায় জানা গেছে যে ঘুম যেমন টিএসএইচ নিঃসরণে বাঁধা দেয়, তেমনি পুরো রাত এবং ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত জেগে থাকলে টিএসএইচ নিঃসরণের গতি বৃদ্ধি পায়। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অভ্যাস হতে অনুপ্রাণিত হয়ে এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো হয়। নবী (সাঃ) এশার নামাজ আদায়ের কিছুক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে পড়তেন (বর্তমান সময়ের অনেক মানুষের ঘুমানোর সময়ের পূর্বেই), এবং খুব ভোরে (মাঝেমাঝে মধ্যরাতে) নামাজের জন্য আবার উঠে পড়তেন।

ইবনে আব্বাস বলেছেন, “নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নাক ডাকা পর্যন্ত ঘুমাতেন ও তারপর নামাজ পড়তেন (বা সম্ভবত তাঁর শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাওয়া পর্যন্ত ঘুমাতেন এবং তারপর উঠে নামাজ আদায় করে নিতেন)।”
ইবনে আব্বাস আরো বলেন, “আমি এক রাতে আমার ফুফু মায়মুনার বাড়িতে ছিলাম, নবী (সাঃ) রাতের একটি অংশ পর্যন্ত ঘুমালেন (দেখুন ফাতেহ্‌-আল-বারী পৃষ্ঠা ২৪৯, ভলিউম ১), রাতের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠলেন এবং ঝুলন্ত চামড়ার থলিতে রাখা পানি দিয়ে নিখুঁতভাবে ওযু করে নামাজে দাঁড়ালেন। তাঁর দেখাদেখি আমিও একইভাবে ওযু করে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে টেনে তাঁর ডান পাশে নিয়ে আসলেন ও আল্লাহ্‌র ইচ্ছানুযায়ী নামাজ পড়লেন, তারপর আবার শুয়ে পড়লেন এবং তাঁর শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাওয়া পর্যন্ত ঘুমালেন।

 

ইউরোপে বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের একই ধরণের চিকিৎসা দেয়া হয়। এক সপ্তাহব্যাপী চিকিৎসায় তাদেরকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে বলা হয়, মধ্যরাতে জেগে উঠতে এবং তারপর আবার ঘুমের “স্বাভাবিক” রুটিন অনুসরণ করে প্রতি সকালে একটু একটু করে দেরিতে জাগতে বলা হয় (কিন্তু অবশ্যই সূর্য উঠার পূর্বে)। (ইয়াং)

যদি আপনার মনে হয় আপনার যথেষ্ট ঘুম হচ্ছেনা, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন কম ঘুমালে আপনি কিভাবে ভালো বোধ করবেন। ঘুমজনিত সমস্যা আসলে মাঝেমাঝে ঘুমের স্থিতিকালের উপর নির্ভর না করে বরং ঘুমের ধরণের উপর নির্ভর করে। ভালো ঘুমের জন্য যা যা করা উচিত সেগুলো হচ্ছেঃ ঘুমানোর অন্তত দুই ঘন্টা আগেই খেয়ে নিন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন, ঘুমের সমস্যা যেমন নাক ডাকা, বা টিএমযে হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, কাত হয়ে ঘুমান, এলকোহল ও বেদনানাশক ঔষধ পরিহার করুন, অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলুন এবং আরামদায়ক তোষক ব্যবহার করুন।

তাহলে আপনার কতটুকু ঘুম দরকার তা কিভাবে বুঝবেন? অনেক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বুঝতে পারেন তাদের জন্য কি সঠিক হবে। যদি আপনি সাত ঘন্টা ঘুমানোর পর ভালো বোধ করেন, কিন্তু পাঁচ কিংবা নয় ঘন্টা ঘুমালে ক্লান্তি বোধ করেন তবে জানবেন যে সাত ঘন্টা হচ্ছে আপনার ঘুমের জন্য “আদর্শ স্থিতিকাল।” যাইহোক, মানুষের ঘটনাবহুল জীবনে ঘুমের স্থিতিকালের মধ্যেও তারতম্য দেখা যায়। ভ্রমণের সময়, ব্যক্তিগত মানসিক আঘাত বা শারীরিক অসুস্থতার জন্য ঘুমের স্থিতিকাল বৃদ্ধি পেতে পারে।

জন ম্যাকডুগাল, যিনি বেশকিছু খাদ্যাভ্যাস বিষয়ক গ্রন্থের লেখক, তিনি বেশি বা কম ঘুম দরকার হয় এমন মানুষের মধ্যে আরো পার্থক্য দেখিয়েছেন। তিনি তার দি কুইক ম্যাকডুগাল কুকবুক গ্রন্থে বলেছেন যে, স্বাস্থ্যবান মানুষের রাতে সাধারণত ৫-৭ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়।

সম্ভবত এ কারণে অনেক মানুষ ভাবেন যে তাদের আরো ঘুম দরকার। বাজে খাদ্যাভ্যাসের কারণে নিদ্রালুতা দেখা দেয়। এমন একটি উদাহরণ হলো বিরাট খানাপিনার পর যখন কারোর শরীর ভারী বলে মনে হয় কিংবা রুটি খাওয়ার পর যখন কারোর মাদক গ্রহণের মতো অনুভূতি হয়। ডাঃ ম্যাকডুগাল বলেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি সুস্থ আছেন তার আট ঘন্টার কম ঘুমানো উচিত।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী যদি আপনার আট ঘন্টার বেশি ঘুমের দরকার হয় তাহলে আপনার কিছু খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে এবং কম ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। এমনকি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) দিনের পর দিন যারা না ঘুমিয়ে সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন তাদেরকে কম ঘুমাতে নিরুৎসাহিত করতেন ও তাদেরকে তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করতে বলতেন এবং প্রয়োজনমত ঘুমের ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন।