বিস্ফোরণের পর বেইরুটের মানুষদের আশা জাগাচ্ছে এই শিল্পকর্ম!

বিশ্ব Contributor
জানা-অজানা
বেইরুট

বেইরুট পোর্টের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এক শিল্পকর্ম, এক হাত প্রসারিত তার। হাওয়া এসে তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত মুখ থেকে। পায়ের কাছে একটা বন্ধ ঘড়ি যাতে ঠিক 6.08 বেজে রয়েছে। ঠিক এই সময়েই অগাস্ট মাসের চার তারিখ বেইরুট বন্দর কেঁপে উঠেছিল ভয়ানক বিস্ফোরণে!

উপরের বিবরণটি আসলে লেবাননের শিল্পী হায়াত নাজেরের হাতে তৈরি এক মূর্তি। বোমার আঘাতে ভাঙা কাচ ও লোহালক্কড়ের টুকরো দিয়ে বানানো এই মূর্তি মূলত চৌঠা অগাস্টের বিস্ফোরণের পর বেইরুটের অধিবাসীদের অটুট মনোবলের প্রতি এক সমর্থন। প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই বিস্ফোরণে, ৬০০০ জন আহত হয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও বেইরুট যে লড়ছে তারই অন্যতম প্রমাণ হায়াতের বানানো ঐ মূর্তিটি।

শিল্পকর্মের বিবরণ

মূর্তিটি ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ঠিক যেন বিস্ফোরণের মুহূর্তটাই ধরা রয়েছে তার প্রতি আঙ্গিকে, মুখের ভাব, ক্ষত, এক হাতের আত্মসমর্পণের ভাব ও বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি এটাই নির্দেশ করে বিস্ফোরণ যেন এখনও চলছে।

কিন্তু যদি অন্য হাতের দিকে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, মূর্তিটির অপর দিক যেন সমস্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করছে একটু একটু করে।

বিস্ফোরণের ঘটনা

৪ অগাস্টের এই বিস্ফোরণ বেইরুটের অর্থনীতিকে চূড়ান্ত টালমাটাল করে দিয়েছে। এর আগে এরকম ভয়ানক অবস্থা দেখা গিয়েছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সিভিল ওয়রের সময়। সেখান থেকে বেইরুট নিজেকে উদ্ধার করেছিল। হায়াত মনে করেন বেইরুট আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

বেইরুট বন্দর ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ পাননি যে চৌঠা অগাস্ট ২০২০ এরকম এক ভয়ানক দুর্ঘটনা অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য। রোজকারের ব্যস্ত শহরের অন্তরাত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছিল ঠিক সন্ধ্যে ছটার সময়। প্রথমে আগুণ, তারপর বিস্ফোরণ, হতবুদ্ধি বেইরুটের শহরবাসীর চোখের সামনে প্রায় আকাশ ছুঁয়েছিল লেলিহান আগুণ শিখা! বেইরুট বন্দরের কাছে এক গুদামে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সঞ্চিত ছিল। তাপ ও চাপের হেরফেরের কারণে হঠাত সেইই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটে বিস্ফোরণ ঘটে।

অনেকেই ঐ বিস্ফোরণকে হিরোশিমার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বিস্ফোরণের মাত্রা নাকি এত বেশি ছিল যে লেবাননের পশ্চিমে অবস্থিত সাইপ্রাসে পর পর দুইবার ভূকম্প দেখা যায়। এমনকি বিস্ফোরণের আগুণের ছোঁয়া সাইপ্রাসের সীমানা থেকেও নাকি দেখা গিয়েছিল।

বেইরুটের হার না মানার মানসিকতা

হায়াতের প্রথমে এই মূর্তিটির বিষয়ে অন্যরকম চিন্তা ভাবনা ছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের পরেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি মূর্তিটির মাধ্যমে বেইরুটের হার না মানার মানসিকতাকে কুর্নিশ জানাবেন। বিস্ফোরণের পর দিনের বেলা তিনি রাস্তা বাড়ি ইত্যাদি পরিষ্কার করার স্বেচ্ছাসেবিকা হয়েছিলেন। সারাদিন কাচের টুকরো লোহার অংশ ইত্যাদি পরিষ্কার করে যেগুলো তিনি বাড়ি নিয়ে আসতেন সেগুলো দিয়েই তৈরি হয়েছে মূর্তি।

হায়াতের মতে, বেইরুট যেন এক নারী। শত সহস্র বছরের ঝড় ঝঞ্ঝা সামলেও সে নিজের লক্ষ্যে অবিচল। অটুট তার মনের জোর। লেবাননের বিখ্যাত গায়িক মাজদা এল রৌমির ‘ বেইরুট, পৃথিবীর নারী’ গানটি থেকেই হায়াতের এই মূর্তির ধারণার সূত্রপাত। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই তিনি মূর্তিটা বানিয়ে ফেলেন।

হায়াত এখনও তার বানানো এই মূর্তির কোনও নাম দেননি, কারণ তিনি চান বেইরুটের অধিবাসীরা যেন এই মূর্তির নামকরণ করেন।