SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

বিয়ের পূর্বে কাবিন: একটি মারাত্মক ভুল এবং বহু নাজায়েয কাজের সমষ্টি

বিবাহ ২২ ফেব্রু. ২০২১
ফোকাস
বিয়ের পূর্বে কাবিন
© Arindam Ghosh | Dreamstime.com

বেশিরভাগ দেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সকল নারী ও পুরুষের বিয়ের নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রি করা আবশ্যক। কাজি বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে এই নিবন্ধন করতে হয়। বিয়ের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার পর কাজি বর-কনের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে বিবাহ নিবন্ধন ফরমটি পূরণ করেন। ফরম পূরণ শেষে বর ও কনে তাতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু বিয়ের পূর্বে কাবিন? এটা কতটা জায়েজ?

বিয়েতে কাবিনের প্রয়োজনীয়তা

সমাজে বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের ফলে বিয়ের যাবতীয় তথ্য সরকারের তথ্যভাণ্ডারে নথিভুক্ত হয় বলে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। এর ফলে দুপক্ষই বিশেষত নারীরা আইনে প্রদত্ত তাদের সকল অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। স্ত্রী কোনো সময় স্বামীর প্রতারণা বা জুলুমের শিকার হলে এই রেজিস্ট্রেশনের সনদ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একে অপরের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নিজের প্রাপ্য অংশ আদায়ের জন্য এই দলিলটি আবশ্যক। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাকের সময়ও বিবাহের রেজিস্ট্রেশন একটি অত্যাবশ্যকীয় দলিল।

বিয়ের পূর্বে কাবিন নয়

সাধারণত বিয়ের এই রেজিস্ট্রেশনকে ‘নিকাহনামা’ বলা হয়, যা আমাদের সমাজে কাবিননামা নামেই সমধিক পরিচিত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাবিন কিন্তু বিয়ের কোনো অংশ নয়। কাবিন ছাড়া বিবাহ করলে বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যাবে। পরস্পরের দাম্পত্য জীবন হালাল হবে। কাবিন হল প্রচলিত আইন অনুসারে বিয়ের একটা নিবন্ধন মাত্র। তাই শরীয়তের বিধান হলো, কাবিন করতে হলে পূর্বে নিয়মমাফিক বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে। বিবাহের কার্যাবলি সম্পন্ন হলে নির্ধারিত কাবিননামার ফরম পূরণ করবে। এ সংক্রান্ত সরকারি আইনও একথাই বলে যে, বিবাহের পরে ফরমটি পূরণ করত সংঘটিত বিবাহকে সরকারী রেজিস্ট্রারভুক্ত করবে। কেননা বিবাহই যদি সম্পাদিত না হয়ে থাকে তাহলে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন কিসের হবে?

কিন্তু আমাদের সমাজে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘বিয়ের কাবিন করে রেখেছি, বিয়ে পরে হবে।’ আবার অনেক সময় দেখা যায়, কাজি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাগাদা দিতে থাকে যে, ‘কাবিনের কাজ আগে শেষ করে ফেলুন। পরে আপনারা মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে বিয়ে পড়িয়ে নেবেন।’ এই চিন্তা এবং কাজগুলো নিতান্তই ভুল। কেননা, যেখানে বিয়েই এখনও সম্পন্ন হয়নি সেখানে কিসের নিবন্ধন করা হবে? সুতরাং বিয়ের আগে কাবিন করা একে তো আইনসিদ্ধ নয়, আবার এক্ষেত্রে আরো কিছু বড় সমস্যাও রয়েছে।

বিয়ের পূর্বে কাবিন থেকে সৃষ্ট সমস্যা

বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের সময় যে ফরমটি পূরণ করতে হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কলাম হল, বিবাহ কত তারিখে হয়েছে? কোথায় বিবাহ হয়েছে? বিবাহ কার মাধ্যমে পড়ানো হয়েছে? বিয়ে পড়ানোর পূর্বেই যদি কাবিন করে রাখা হয় তবে ফরমের উপরোক্ত কলামগুলোতে অবশ্যই মিথ্যা তথ্য লিখতে হবে। কেননা বিয়ে না হওয়ায় বিয়ে সম্পাদনের তারিখ, স্থান সবকিছু বানিয়ে লিখতে হবে। এক কথায়, বিবাহের পূর্বে কাবিন করার দ্বারা পাত্র, পাত্রী, সাক্ষী, কাজী সকলেই মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। সবাই মিথ্যা কথার উপর ভিত্তি করে স্বাক্ষর করছে।

উপরোক্ত মিথ্যা তথ্য লেখা ছাড়াও বিয়ের পূর্বে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতর সমস্যা হলো, কাবিননামার ১৮ নং ধারা। এখানে লেখা থাকে, বর কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হবে কি না? হলে কোন কোন শর্তে? ফরমের এ কলামটি পূরণকালে সাধারণত ‘হ্যাঁ’ লিখে তিনটি শর্ত উল্লেখ করা হয়। এর অর্থ হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে শর্ত সাপেক্ষে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। একে ইসলামী পরিভাষায় ‘তালাকে তাফবীয’ বলা হয়। বিয়ের পর যেমনিভাবে স্বামী নিজে তালাক প্রদানের ক্ষমতা রাখে তদ্রূপ কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীকেও তালাক গ্রহণের অধিকার দিতে পারে। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের আগে যেহেতু স্বামী নিজেই তালাক প্রদানের ক্ষমতা রাখে না তাই স্বামী মুখে স্ত্রীকে ঐ অধিকার দিলেও বা অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করলেও স্ত্রীর জন্য বিবাহের পর উক্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

বিয়ের পূর্বে কাবিন ও তালাক সংক্রান্ত বিষয়

অতএব বিয়ের আগে কাবিন করার অর্থ হচ্ছে, স্বামী তার স্ত্রীকে বিয়ের আগেই তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে দিচ্ছে। অথচ বিয়ের আগে তো স্বামী নিজেই তালাক প্রদানের ক্ষমতা রাখে না। কেননা বিবাহ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বামী তার স্ত্রীর জন্য একজন পরপুরুষের ন্যায়। আর কোনো পরপুরুষ কিভাবে কোনো পরনারীকে তালাক দিবে? সুতরাং পাত্র যদি বিয়ের আগে কাবিননামার ফরম পূরণ করত তাতে স্বাক্ষরও করে তবুও এর দ্বারা বিবাহের পর পাত্রী তালাক গ্রহণের অধিকার প্রাপ্ত হবে না। এমতাবস্থায় সেই স্ত্রী যদি কোনোদিন নিজের উপর তালাক গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে তার তালাক গ্রহণ শরীয়ত মতে কোনোভাবেই শুদ্ধ হবে না।

কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের আগে করা এই কাবিনের ভিত্তিতেই স্ত্রী স্বামীর থেকে তালাক নিয়ে নেয় এবং অন্যত্র বিবাহও করে ফেলে। অথচ এভাবে তার তালাক গ্রহণ কার্যকর হয় না এবং অন্যত্র বিবাহও বৈধ হয় না।

বিয়ের আগে কাবিন করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় খারাপ দিক হলো অনেকে এই কাবিনকেই বিবাহ মনে করে। ফলে মৌখিকভাবে বিয়ের ইজাব-কবুল না করে শুধু কাবিন করার দ্বারাই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে বলে মনে করে। অথচ মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া কাবিননামা দ্বারা কখনোই বিবাহ সংঘটিত হবে না। ফলে ছেলেমেয়ের একত্রে থাকাও বৈধ হয় না।

তাই সার্বিক বিবেচনায় ইসলামী শরীয়ত ও সরকারি আইন অনুযায়ী বিয়ে পড়ানোর কাজ সুসম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল কাবিননামার ফরম পূরণ ও সাক্ষর করতে হবে, বিয়ের আগে কখনই নয়।