বুকে কফ জমলে কী কী ঘরোয়া টোটকা কাজে দেয়?

স্বাস্থ্য Contributor
মতামত
বুকে কফ
© Poramate Cheewapat | Dreamstime.com

শীতে সামান্য অসাবধান হলেই ঠান্ডায় বুকে কফ জমে সর্দিকাশি খুব সাধারণ একটি বিষয়। হয়তো ঠান্ডা পানীয় খেয়ে ফেললেন, বা কান-মাথা না ঢেকেই বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়, অমনি চট করে ঠান্ডা লেগে অজান্তেই বুকে কফ বসে গেল! সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হয়ে গেল গলা ব্যথা, কাশি। আবার অনেকসময় ঠান্ডা লেগে সর্দিকাশি হলেও বুকে কফ জমে রয়েছে কিনা, তা বোঝা যায় না। বেশ কিছুদিন পরে অস্বস্তি, রাতে ভাল ঘুম না হওয়ার পরে যখন অবশেষে ডাক্তারের কাছে গেলেন, দেখলেন বুকে সর্দি জমে সেটি চেস্ট ইনফেকশনের মতো গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে করোনার সময় ঠান্ডা লাগা, সর্দিকাশি বা বুকে কফ জমে থাকলে সে বিষয়ে অবহেলা করা উচিত নয়। তবে বুকে কফ জমে থাকলে ডাক্তারকে দেখানোর পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া টোটকাতেও কাজ পেতে পারেন।

বুকে কফ জমলে ঘরোয়া টোটকা কাজে লাগাবেন কেন?

সাধারণ সর্দিকাশি, হাঁপানি, ভাইরাল ইনফেকশন, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)-এর ক্ষেত্রে বুকের ভিতর কফ জমার প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়াও শীতে নানারকম অ্যালার্জির হয়, সেক্ষেত্রে বুকে কফ বসতে পারে। বুকে কফ থাকলে নিশ্বাসের সমস্যা ছাড়াও অন্য অনেক অসুবিধা হতে পারে। সর্দিকাশির ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখালে অনেকসময় তাঁরা এমন ওষুধ দেন, যাতে বুকে সর্দি বসে যায়, সারতে সময় লাগে। তাই অনেকেই অ্যালোপ্যাথি ওষুধের বদলে ঘরোয়া টোটকায় ভরসা রাখেন।

গরম জল বা পানীয় খান

সমীক্ষা অনুযায়ী, সর্দিকাশি হলে বা বুকে কফ বসে থাকলে গরম পানীয় উপকার দেয়। এইসময় আপনি গরম সুপ, গ্রিন টি, হার্বাল টি খেতে পারেন। দেখবেন হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া থেকে চটজলদি মুক্তি পাচ্ছেন। এগুলি খেলে শীতে যেমন আরাম হয়, তেমনই এইসব পানীয় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে, এবং কফ জমে থাকলে তা সহজে বের করে দেয়। এছাড়া পানি হালকা গরম করে খান, দেখবেন আরাম লাগছে।

বুকে কফ হলে লবণ পানিতে গার্গল

লবণ পানিতে গার্গল করা কিন্তু বহু পরিচিত এবং প্রাচীন এক টোটকা। একগ্লাস উষ্ণ পানিতে সামান্য লবণ দিয়ে গার্গল করুন। এটি বুকের কফ বের করে দেয় এবং গলাব্যথা, সর্দি কমায়। অনেকের গার্গল করতে সমস্যা হয়। তাঁরা উষ্ণ পানিতে লবণ দিয়ে পানি মুখে দিয়ে গলায় রেখে কুলকুচি করে ফেলে দিন। লবণ অ্যান্টিসেপ্টিক, ফলে তা গলাব্যথা ইত্যাদি ইনফেকশন কমাতে সাহায্য করে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী দিনে যতবার খুশি গার্গল করতে পারেন।

মধু-লেবুর রস খান

বুকে কফ জমে থাকলে পানি গরম করে তাতে মধু এবং পাতিলেবুর রস মিশিয়ে এই পানীয়টি দিনে ২-৩ বার করে খান। উপকার পাবেন। মধু প্রাকৃতিকভাবে বুকে বা গলায় বসে থাকা সর্দি পাতলা করে বের করে এবং গলাব্যথা থেকে আরাম দেয়। এছাড়া মধুর অ্যান্টি-ভাইরাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণাগুণ বুকে ইনফেকশন সারাতে সহায়তা করে। আর পাতিলেবুতে থাকে ভিটামিন সি যা দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সর্দিকাশির প্রবণতা কমায়। আপনার

সর্দিকাশির ধাত থাকলে রোজ সকালে উঠে মধু এবং লেবু দিয়ে হালকা গরম পানি খেতে পারেন, দেখবেন উপকার পাচ্ছেন।

বুকে জমা কফকে দূর করতে ভাপ

শরীরকে হাইড্রেটেড রাখলে তা জমা কফকে বের করে দেয়। তাই বুকে সর্দি জমে থাকলে সচরাচর ডাক্তাররা গরম পানিতে ভাপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। একটি বড় পাত্রে পানি নিয়ে বেশ করে গরম করুন, তারপর মাথায় তোয়ালে চাপা দিয়ে সেই গরম ভাপ ভাল করে নিন। এই ভাপ আপনার বুকে জমা কফকে তরল করে নাক দিয়ে বের করতে সাহায্য করে। এছাড়া সর্দিকাশি হলে গরম পানিতে স্নান করুন। দেখবেন আরাম লাগার পাশাপাশি জমে থাকা কফের থেকে মুক্তিও পাচ্ছেন।

এসেনশিয়াল অয়েলের কামাল

তুলসি, দারচিনি, ইউক্যালিপট্যাস, লেমনগ্রাস, পিপারমিন্ট, টি ট্রি ইত্যাদি এসেনশিয়াল অয়েলের গন্ধ খুব সুন্দর হয়। এছাড়া এই এসেনশিয়াল অয়েলগুলি ভাল করে নিঃশ্বাস নিতে সাহায্য করে এবং বুকে কোনওরকম কফ জমে থাকলে তাকে পাতলা করে বের করে দিতে সাহায্য করে। সর্দি জমে থাকলে অনেকসময় মাথা ধরে থাকে। সেই সমস্যা থেকেই এই তেলগুলি আপনাকে মুক্তি দিতে পারে। তাই আপনার বুকে শ্লেষ্মা জমলে এসেনশিয়াল অয়েলকে কাজে লাগাতে পারেন। সরাসরি বোতল থেকে এর গন্ধ নিতে পারেন বা রুমালে লাগিয়েও নিতে পারেন। এছাড়া ১/৪ কাপ নারকেল তেলের সঙ্গে ১২ ফোঁটা যে-কোনও একটি এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে বুকে মালিশ করুন, জলদি উপকার পাবেন। তবে এসেনশিয়াল অয়েলে অনেকের ত্বকে প্রদাহ হতে পারে। ফলে তেল মালিশ করার আগে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।

ভরসা রাখুন খাবারে

বুকে শ্লেষ্মা, কফ জমে থাকলে রসুন, আদা, লেবু ইত্যাদি খেতে পারেন। এগুলি শরীর থেকে বাড়তি কফকে বের করে দিয়ে শরীর সুস্থ রাখে। আদা দেওয়া চা নিয়ম করে সকাল-সন্ধে খান। শরীর গরম রাখার চেষ্টা করুন। এইসময় পেঁয়াজও উপকারে লাগতে পারে। পেঁয়াজের অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণ সর্দিকাশি জনিত ইনফেকশনকে দূরে রাখে। পেঁয়াজের রস, পাতিলেবুর রস, মধু এবং পানি দিয়ে গরম করে খান। দিনে বার তিনেক খেলেই বুকে জমা কফ থেকে মুক্তি পাবেন।

মাথা উপরে রেখে ঘুমোন

সর্দিকাশি হলে বেশিরভাগ সময়েই নাক বুজে যায়, ফলে শোওয়ার সময় নিঃশ্বাসের সমস্যা দেখা যায়। এক্ষেত্রে ঘুমনোর সময় মাথায় বাড়তি বালিশ দিন। মাথা উপরে থাকলে তা শরীর থেকে শ্লেষ্মা বা কফকে বের করে এবং কাশি থেকে দ্রুত মুক্তি দেয়।

তবে বুকে কফ জমলে বাড়তি কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা কিন্তু জরুরি। ধূমপানের বদভ্যাস থাকলে এইসময় ত্যাগ করুন। আমাদের ফুসফুসে সিলিয়া নামে কিছু সূক্ষ্ম সুতোর ন্যায় অংশ থাকে যা কফ, ধুলোবালিকে দূরে রাখে, ধূমপানের ফলে সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যারা ধূমপান করেন, তাঁদের সর্দিকাশির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা যায়। এছাড়া ঘনঘন আদা চা খান, গার্গল করুন। নাক দিয়ে কাঁচা পানি পড়লে বারবার নাক ঝেড়ে রুমালে ফেলুন। জমে থাকা কফ তাহলে দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যাবে। উপরের ঘরোয়া টোটকাগুলি নিয়ম করে খান। তবে বুকে অতিরিক্ত কফ জমে থাকলে কিন্তু একবার ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়াই ভাল।