SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

বুলগেরিয়ায় শান্ত পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে আছে দামির বাবার মাজার

পর্যটন ১৩ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
দামির বাবার মাজার
© Isabela66 | Dreamstime.com

উত্তর পূর্ব বুলগেরিয়ার গভীর জঙ্গল, যেখানে রোমানিয়ার সীমান্ত ছুঁয়ে থাকে সবুজ ঘাসের সুউচ্চ পাহাড়। এমনই এক জায়গায় রয়েছে এমন এক মানুষের ইতিহাস যিনি মুসলমান ও খ্রিস্টান দুই ধর্মের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দামির বাবার মাজার বা দামির বাবা টেকে, সেস্তারি গ্রামের কাছে ছোট্ট এক নির্জন স্থান। কাছের শহর থেকে মাত্র চল্লিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায়। শেষবার যখন গিয়েছিলাম, ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ববিদ ক্রিস ফেনটন আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এই মাজারে।

দিনটা ছিল মনোরম, চতুর্দিকে সূর্যের আলো ঝকঝক করছে। হালকা দখিনা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ক্রিস জঙ্গলের কাছাকাছি একটা জায়গায় নিজের গাড়িটা পার্ক করে বলল, ‘আমরা এসে গিয়েছি।’ পার্কিং স্পেসটা দেখেই বোঝা যায় বহু যুগ আগে তৈরি। দুটো নিভৃত পার্ক বেঞ্চ রয়েছে, তাদের পায়া থেকে গাছ লতিয়ে উঠছে। ঠিক সেই বেঞ্চ দুটোর পিছনে ঝোপের পাশ দিয়ে ক্রিস আমাকে পায়ে হাঁটা পথ ধরে নিয়ে গেল।

যত এগতে লাগলাম তত দেখলাম উপরের গাছপালা থেকে সুন্দর রঙিন নিশান বাঁধা রয়েছে। ঠিক যেন মনে হচ্ছে রামধনু চাঁদোয়া। খানিকদূর যাওয়ার পর আমি অটোমান তূর্কী যুগের এক সমাধি দেখতে পেলাম। ক্রিসই দেখাল অবশ্য।

বুলগেরিয়ায় ইসলামের ইতিহাস

চতুর্দশ শতকে বুলগেরিয়ায় প্রথম ইসলাম পা রাখে। তুরস্ক থেকে অটোমান জাহাজ এসে প্রাথমিকভাবে দখল করে নিয়েছিল সমুদ্র উপকূলের অঞ্চল। তারপর তা এগিয়ে এসেছিল দেশের মধ্যে। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত বুলগেরিয়া তুরস্কের অধিকারে ছিল। অর্থাৎ বলা যায়, প্রায় ছয় শতক ধরে ইসলাম পালন করে গিয়েছে এই দেশকে।

এই কারণেই অজস্র তুর্কি স্থাপত্য আজও পাওয়া যায় মধ্য বলকান অঞ্চলে। জরাজীর্ণ মসজিদ, অপুর্ব সুন্দর ব্রিজ ও ভুলে যাওয়া সমাধিতে সমাকীর্ণ এই দেশ।

দামির বাবার মাজার

‘ এই মাজার কিন্তু আসলে প্রাচীন ইন্দোইউরোপীয় জনজাতি থ্রাশিয়ানদের একটি স্থাপত্যের উপর তৈরি। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় চতুর্থ শতকে এখানে থ্রাশিয়ানদের আবাস ছিল। পরবর্তীতে তুর্কিরা এই স্থানটি দখল করে নেয়।’ সহজ ভাষায় আমাকে এই ট্রিভিয়া দিল ক্রিস।

পায়েচলা সুঁড়িপথ তখন ধাপে ধাপে সিঁড়িতে পরিণত হয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেই চোখে পড়ে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের মাঝে তুর্কি সমাধি ও তা ঘিরে সুন্দর স্থাপত্য। কৌণিক আকৃতির দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে মূল অংশে পৌঁছানো যায়। মূল অংশের ছাদটি গম্বুজাকৃতি। পুরো মাজারের এক কোণে ‘বাসপারমাক’-এর পবিত্র জলধারা বয়ে চলেছে। এই পবিত্র জলধারা নাকি পীরবাবার সমাধিস্থ হওয়ার দিন হঠাত করে উদ্গত হয়।

‘এখানকার মুসলমানরা মনে করেন এটি দামির বাবার সমাধি, একজন আলেভি যোদ্ধা সাধক। ষোড়শ শতকে যখন এই মাজার বানানো হয় তখন থেকেই এখানে অজস্র মানুষ আসতে শুরু করেন। পরবর্তীতে এই ছোট মসজিদ, মিউজিয়াম ও ইমারত বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মজার বিষয়, খৃস্টানরাও এটাকে তাদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মনে করে। তাদের মতে, দামির বাবা নয়, এখানে আসলে সেন্ট জর্জ সমাধিস্থ আছেন।’ হাসতে হাসতে ক্রিস জানায় আমাকে।

বুলগারিয়ার ইসলামী ইতিহাসের উল্লেখ্য বিষয় হল এখানে মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা পরস্পরের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে বসবাস করেছে চিরকাল।

শান্তভাবে যখন আমরা শীতল সমাধিস্থলের মধ্যে প্রবেশ করলাম তখন এক অনিন্দ্যসুন্দর চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল। একদিকে সুষ্ঠুভাবে খ্রিস্টানদের জন্য মোমবাতি, ক্রুসিফিক্স ও রোজারি বিডস সাজানো রয়েছে। অন্যদিকে শিয়া ইমাম, হাসান ও হোসেনের ছবি, মাজারে চড়ানোর জন্য চাদর ও আরবীয় ভাষায় দেওয়াল লিপি লিখিত রয়েছে। আর সবার উপরে, লাল, সবুজ আর নীল রঙে অপূর্ব ক্যালিগ্রাফি শোভা পাচ্ছে।

‘লোকে বলে, একমাত্র সহি মুসলমানই এই ক্যালগ্রাফির মধ্যে আল্লাহ ও মুহাম্মদের নাম চিনে নিতে পারবে।’ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ক্রিস বলল।

আমি হাসলাম। আল্লাহর অপার কৃপায় বিশ্বের কোনে কোনে ইসলামের এরকম মণিমুক্তো ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি থেকে শান্তির বাণী উচ্চারিত হয়, শুধু অন্তরের শ্রবণক্ষমতা থাকলেই তা শোনা যায়।

কীভাবে যাবেন দামির বাবার মাজার ?

ওয়ার্না এয়ারপোর্টে নেমে রেন্টাল গাড়ির ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। রেজগার্ড শহরের থেকে মাত্র ৪২ কিলোমিটার গাড়িতে গেলেই পৌঁছে যাবেন এই মাজারে। ল্যান্ডমার্ক, কাছের গ্রাম স্বেস্তারি। নিরবিলি শান্ত এই স্থানের মাহাত্ম্য আপনার মন জয় করে নিতে বাধ্য।