বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনন্য মসজিদ স্থাপত্য

mosque in the backdrop bangladesh

কথায় আছে, ‘হাওর জঙ্গল মৈষের শিং—এই তিনে ময়মনসিং’ বোঝাতে বলা হয়, ‘টানে শে কি মজা’ অর্থাৎ টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর। ১৭৮৭ সালের ১ মে জেলা এবং ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ময়মনসিংহ বাংলাদেশের অষ্টম বিভাগ হিসেবে পথচলা শুরু করে।

সালে হজরত শাহ মুহাম্মদ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহ.) বৃহত্তর ময়মনসিংহে ইসলাম প্রচার করেন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের ২৫০ বছর আগে ৪৪৫ হি. বা ১০৫৩ সালে। মহানগরীর ‘বড় মসজিদ’ বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক। ১৮৫০-১৮৫২ সালে যাত্রা শুরু করা ১.৯ একর জমির ওপর নির্মিত ‘বড় মসজিদ’ একটি তিনতলা সুরম্য স্থাপত্য। দৈর্ঘ্য ১০৫ ফুট ও প্রস্থ ৮৫ ফুট। অপূর্ব অলংকরণে সুশোভিত মসজিদের ১২৫ ফুট উঁচু দুটি মিনার ও একটি কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ গম্বুজ রয়েছে। তাপানুকূল ব্যবস্থা, দেয়ালজুড়ে স্বেত শুভ্র মনোরম টাইলস, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, মূল্যবান মোজাইক পাথরের মেঝে রয়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে। মিসরের প্রখ্যাত কারি ও আলিম হজরত মাওলানা আব্দুল আওয়াল (রহ.) ইমামের দায়িত্ব পালন করেন প্রায় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। তিনি মিসরি কারি সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। রপর টানা ৫৬ বছর হাকিমুল উম্মাত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবির (রহ.) খলিফা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, জামানার কুতুব হজরত মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ.) ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।

‘গায়েবি মসজিদ’, বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব। সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচলিত, প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের পর সহসা এক মসজিদের গম্বুজ মানুষের নজরে আসে। তারা মাটি খুঁড়ে ও জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদটি ব্যবহার উপযোগী করে। অত্যাচারী কোচরাজার নিষ্ঠুরতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি আবার অলৌকিকভাবে আবাদযোগ্য হলে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়। সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে ঈশা খাঁর সমসাময়িক ইটনার দেওয়ান মজলিস দেলোয়ার খাঁ ‘গায়েবি মসজিদ’ নির্মাণ করেছিলেন।

টাঙ্গাইলের ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার লৌহজং নদীর পূর্ব পারে অবস্থিত বাংলাদেশের ১০ টাকার নোটে শোভিত ‘আতিয়া মসজিদ’। ‘আতিয়া মসজিদ’ ১০১৯ হি. (১৬১০-১১ সাল) নির্মিত হয়। শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মীরি (রহ.)-এর সম্মানে বায়েজিদ খান পন্নীর পুত্র সাঈদ খান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন।

কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিমে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ‘পাগলা মসজিদ’। জনশ্রুতি রয়েছে, ধ্যানরত এক ভাসমান দরবেশের আবির্ভাব হয় সহসা প্রমত্তা নরসুন্দার বুকে পানিতে। তাঁর কল্যাণেই নদীর মধ্যে চর জেগে ওঠে।নদীর তীরবর্তী রাখুয়াইল গ্রামের এক গৃহস্থের গাভি নিয়মিত নদী সাঁতরিয়ে গিয়ে ওই দরবেশের পাত্রে ওলানের দুধ দিয়ে আসত। এতেই গাভির দরিদ্র মালিক ও স্থানীয় লোকজনের চরম বৈষয়িক উন্নতি হয়। এমন আরো অসংখ্য কেরামতিতে বিমুগ্ধ মানুষজন ওই দরবেশের খেদমতে হুজরাখানা তৈরি করে। দরবেশের মৃত্যুর পর তাঁর হুজরাখানার পাশেই পাগলা সাধকের স্মৃতিতে ‘পাগলা মসজিদ’ নির্মিত হয়। এ জনশ্রুতির ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিশ্বনন্দিত শোলাকিয়া ঈদগাহ শোলাকিয়া ‘সাহেব বাড়ি’তে প্রতিষ্ঠিত মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। ১৭০০ শতাব্দীর শেষার্ধে বিশিষ্ট বুজুর্গ সুফি সৈয়দ আহমদ (রহ.) ১৮২৭ সাল/১২৪৮ হি. একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত শোলাকিয়া’। বিশিষ্ট বুজুর্গ সুফি সৈয়দ আহমদ (রহ.) প্রতিষ্ঠিত শোলাকিয়া ঈদগাহর মূল জমির পরিমাণ ৬.৬১ বা প্রায় সাত একর। কাতারসংখ্যা ২৬৫ বা প্রায় ৩০০। প্রতি কাতারে মুসল্লি দাঁড়ায় ৫০০ জন।
এমনই অনেক মসজিদের অন্যতম হলো কিশোরগঞ্জের শহীদি মসজিদ, কুতুবশাহ মসজিদ, নেত্রকোনার শাহ সুলতান মসজিদ, টাঙ্গাইলের খামারপাড়া মসজিদ, গোপালপুরের ২০১ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, বেলুয়া খানবাড়ি মসজিদ, জামালপুরের শাহ জামাল মসজিদ, মেলান্দহ মালঞ্চ মসজিদ, শেরপুরের বারদুয়ারি মসজিদ ও মায়া সাহেবার মসজিদ। ৮৬ বছরে কখনো কোরআন তিলাওয়াত বন্ধ হয়নি ধনবাড়ী নবাব প্যালেস মসজিদে। আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য গফরগাঁওয়ের তেরশ্রী জামে মসজিদ।