বেন্ডারি দুর্গ: দুর্গম ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার বুকে লুকোনো তূর্কী ইতিহাস

ইতিহাস Contributor
জানা-অজানা
বেন্ডারি দুর্গ
Bendery fortress is an architectural monument of the 16th century. Located on the right bank of the Dniester River in the city of Bender, Transnistria. Construction began in 1538. © Dmitry Malov | Dreamstime.com

মলদোভার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত দুর্গম ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার বুকে লুকিয়ে রয়েছে অটোমান তূর্কীর এক ইতিহাস। কিন্তু, সেখানে পৌছনোর রাস্তা অত সহজ নয়। ইউক্রেনের সীমান্তের কাছে, নিস্তার নদীর তীরে অবস্থিত এই বেন্ডারি দুর্গ আসলেই প্রমাণ দেয় অটোমান সাম্রাজ্য কতখানি শক্তিশালী ছিল এককালে। কিন্তু এখন? কঠিন মুখের সৈন্যদের পদশব্দ ধ্বনিত হয় এই দুর্গের বুকে, যে সৈন্যদের পোশাকে জ্বলজ্বল করে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতীক।

ট্রান্সনিস্ত্রিয়া আদতে কী?

মলদোভার অভ্যন্তরে আংশিক স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলটিকেই বলা হয় ট্রান্সনিস্ত্রিয়া বা ‘প্রিডনেস্ত্রোভিয়ান মলদোভিয়ান রিপাবলিক’। যদিও ইউনাইটেড নেশন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ এটিকে আলাদা শাসনক্ষেত্র হিসাবে মোটেই পাত্তা দেয় না, তাও ট্রান্সনিস্ত্রিয়ায় রয়েছে নিজস্ব সরকার, মিলিটারি, মুদ্রা, পুলিশ ব্যবস্থা ও পতাকা। মজার ব্যাপারম সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাবধারায় বিশ্বাসী এই দেশ এখনও পতাকায় কাস্তে হাতুড়ির চিহ্ন ব্যবহার করে। আর অতীতের সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই এই অঞ্চলটিও বহির্জগতের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ রাখতে চায় না।

বেন্ডারি দুর্গের ইতিহাস

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫৩৮ সালে তুরস্ক যখন পুরোপুরি মলদোভা দখল করে নেয়, তখনই এই দুর্গের পত্তনের সূচনা। অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত স্থপতি কোখের মিমার সাইনানের নকশা অনুসারে এই দুর্গ বানানো শুরু হয়। দুর্গের সিটাডেলটি অটোমান তূর্কীদের সামরিক উন্নতির অন্যতম সাক্ষী। অটোমান সাম্রাজ্য কর্তৃক দেশ বিজয়, একের পর এক যুদ্ধ, এমনকি রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সংঘটিত ক্রাইমিয়ার যুদ্ধের প্রমাণ খোদাই করা রয়েছে এই সিটাডেলে।

সাইনান মূলত পশ্চিম ইউরোপের বেসেশন স্টাইলের আদলে এই দুর্গটি গড়ে তোলেন। কথিত আছে, তখন সাইনানের কর্মজীবনের মধ্যগগন, তূর্কী সুলতান সুলাইমান তিঘিনিয়া শহর দখল করে তার নামকরণ করেছেন বেন্ডার। কিন্তু বেন্ডার রক্ষা করার জন্য তো দুর্গের প্রয়োজন। অতএব, বুলাও সাইনানকো! এর মধ্যে উল্লেখ্য, সাইনান কিন্তু স্থপতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের বিশ্বাসী হাশেকি অর্থাৎ রক্ষীও ছিলেন। কথিত আছে, এই দুর্গ বানানোর পরেই তাঁকে স্থাপত্যের অধিকর্তা হিসাবে তুরস্কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

বেন্ডারি দুর্গের প্রতি আক্রমণ ও অধিকার

বহুদিন থেকেই এই দুর্গের প্রতি অটোমান সাম্রাজ্যের বিরোধী অন্যান্য শক্তির আগ্রহ ছিল। ১৫৪০ এ মলদোভিয়ার স্থানীয় সৈন্যদল প্রায় দখলই করে নিচ্ছিল এই দুর্গ, কিন্তু শেষ মূহূর্তে ব্যর্থ হয়। তার ঠিক কয়েকবছর পর, মলদোভিয়া ও কসাকদের যুগপৎ এক সৈন্যদল এই দুর্গ আক্রমণ করে। কিন্তু দুর্গের অধিষ্ঠিত তূর্কী রক্ষীরা চাতুর্যের সঙ্গে তা প্রতিহত করে। এরপর, প্রায় ২০০ বছর অবধি এই দুর্গ তূর্কিদের অধীনে ছিল। কিন্তু ১৭৭০ সালে, রাশিয়ানরা শেষ পর্যন্ত এই দুর্গের দখল নেয়। যদিও, কথিত আছে, রাশিয়ানদের ৬ টি সৈন্যদলের মধ্যে একটি একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল এই দুর্গ দখলের সময়।

অবশেষে, ১৮১২ সালের ১৬ মে বুখারেস্টের চুক্তি অনুসারে দুর্গটি রাশিয়ার অন্তর্গত হয়। বর্তমানে, ট্রান্সনিস্ত্রিয়ার একচেটিয়া অধিকার এই দুর্গে।

বেন্ডারি দুর্গের গঠন

একটি জোরালো ভিত বা বেসেশনের উপর এই দুর্গটি অবস্থিত। পাহাড়ের উপর প্রায় ৬৭ হেক্টর স্থান নিয়ে এটি বিস্তৃত হয়েছে। দেওয়ালগুলি প্রায় পাঁচ মিটার লম্বা ও ৬ মিটার পুরু। যেহেতু ইসলামী স্থাপত্য, বেন্ডারি দুর্গে অপূর্ব সুন্দর কিছু মিনার দেখা যায়। এর মধ্যে একটি মিনারের মধ্যে এখনও বেঁচে রয়েছে ইসলামী ইতিহাস। এই মিনারের মধ্যে রয়েছে একটি ছোট মিউজিয়াম যেখানে অটোমান তূর্কীদের ব্যবহৃত মুদ্রা থেকে আরম্ভ করে বেশবাস পর্যন্ত রাখা রয়েছে। প্রাচীন অটোমানদের পতাকা, ব্যানার রাখা রয়েছে এই সংগ্রহশালায়। এছাড়া দেওয়ালে রয়েছে অপুর্ব কিছু ক্যালিগ্রাফি যাতে, কথিত আছে, সম্ভবত কুরআনের লিপি খোদাই করা।

এছাড়া মিনারের বাইরে একটি সংগ্রহশালা আছে যেখানে তূর্কী অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি রাখা রয়েছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগে আমাদের এই পবিত্র ধর্ম পৃথিবীর কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছিল। বেন্ডারি দুর্গ তার অন্যতম অনুপম প্রমাণ।