বৈশাখের আগমনে শুচি হোক ধরা

bengali new year
ID 114199586 © InfiniteGraphics | Dreamstime.com

রবীন্দ্রনাথের গানের এই কথাগুলো যেন এখনকার পৃথিবীর জন্য। করোনার প্রকোপে একদিকে হাজার হাজার মৃত্যু, আরেকদিকে নিয়ম মেনে জীবনের এগিয়ে চলা। তারই ধারাবাহিকতায় এরমধ্যেই বাংলা নববর্ষের শুরু। বরীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেই বাঙালি মন গেয়ে উঠবে— ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে। তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে॥’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবারের পহেলা বৈশাখের রংটাই পাল্টে দিয়েছে। ভাইরাসটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত করেছে। জনসমাগম এড়িয়ে চলাই এই ভাইরাস প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা। লকডাউন অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে  বিভিন্ন দেশ। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় এমনিতেও বাংলাদেশে অনেক জেলা, শহর, এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। ভারত জুড়ে লকডাউন ঘোষণা হয়েছে মে মাসের তিন তারিখ পর্যন্ত।  সে কারণে অন্যান্য সময় পহেলা বৈশাখের আগে যে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে বাঙালি বেষ্টিত দেশে বা অঞ্চলে, তা এবার অনুপস্থিত। দোকানপাট বন্ধ বলে পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য হালখাতার আয়োজন নেই, নেই বৈশাখী কেনাকাটা। নেই পান্তা-ইলিশ আয়োজনের তোড়জোড়।

এই মহাদুর্যোগের মধ্যেই বৈশাখ আসায় সরকারি আদেশেই এদিন সকল আয়োজন বন্ধ। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের অন্যতম আয়োজন রমনা বটমূলে প্রভাতী আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শিশু পার্কের সামনে ঋষিজের অনুষ্ঠানসহ সব বন্ধ করা হয়েছে। বাঙালি আজ ঘরে বসেই তার সাধ্যমতো খাবার আয়োজন করবে। পড়বে নতুন পোশাক। মোবাইল মেসেজ বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেবে। ঘরে বসে থাকলেও তাদের মনে সত্যি সত্যি খেলে যাবে বৈশাখের রং।

আজকের অন্যরকম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলাদেশবাসীকে নতুন বাংলা বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানরা। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের। আরও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

ফসলি সন হিসেবে মুঘল আমলে যে বর্ষগণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়; শুধু তাই নয় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাঙালিকে লড়াইয়ের প্রেরণাও দিয়ে আসছে বর্ষবরণের এই উৎসব। ছায়ানট প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৭ সাল থেকে রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানট যে বর্ষবরণের আয়োজন করত, তা কেবল রাজধানীবাসীর চোখে নয়, গোটা বিশ্ব বাঙালির কাছেই তা হয়ে উঠেছে নতুন বঙ্গাব্দের প্রথম দিনের উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই কেবল বন্ধ ছিল সে আয়োজন। এরপর অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি, মৌলবাদের হামলা আর হুমকিও থামাতে পারেনি রমনা বটমূলের এ আয়োজন। পয়লা বৈশাখ। ১৪ এপ্রিল। শুধু বদল হবে সন। ১৪২৭। উঠবে নতুন সূর্য। শন-শন বইবে বাতাস। তা কি মন্দা? না, মৃদুমন্দ। না-কি দমকা হাওয়ায় উড়িয়ে নেবে! বিদায়ী অস্তগামী সূর্যটা নিস্তেজ হয়েই বরাবরের মতো উঁকি দেবে! সূর্যটা কি সত্যিই নতুন হবে?

চলমান সময়ের অবক্ষয়, ধস; ক্রমাগত দুর্ঘটনায় বিমর্ষ প্রাণ চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় আছে সুদিনের। চলতি পথে দেয়ালের গ্রাফিতিতে চোখ উজ্জীবিত হয়- ‘সুদিন আসবে’।

বিপদ আক্রান্ত এই বিরূপ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ছায়ানট সভাপতি সনজিদা খাতুন তাই এক নতুন বিশ্ব গড়ার সংগ্রামের সহযাত্রী হতে আহ্বান জানান, ডাক দেন ঐকান্তিক মিলনের।

“দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সভ্যতার যে-সংকট দেখে রবীন্দ্রনাথ শিহরিত হয়েছিলেন, আজকের সংকট তার চেয়েও বহু বিস্তৃত। পৃথিবীর গভীর-গভীরতর অসুখে আমরা এ-ও জানি, বিপুল ধ্বংসলীলা আসন্ন হলেও, সেকথাই একমাত্র সত্য নয়। মানবকল্যাণের জন্য আমরা ঐকান্তিক চেষ্টা এবং ঐকান্তিক মিলনের শপথে ঐক্যবদ্ধ হব আজ। মহাবিশ্বের প্রতিটি মানুষ পরস্পর অদৃশ্য ঐক্যসূত্রে বাঁধা।

“সভ্যতা, মানবতা ও প্রকৃতির নিবিড় মেলবন্ধনে আমরা আস্থা রাখি। কামনা করি বিচ্ছিন্নতা ও বন্দিত্ব পেরিয়ে নতুন উপলব্ধিতে নতুন বিশ্ব গড়বার প্রেরণা সঞ্চারিত হবে সবার মধ্যে, মহা-সঙ্ককট বয়ে আনবে মহা-পরিবর্তন, কেননা, মানুষই পারে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আলোর পথের অভিযাত্রী হতে। ”

ছায়ানট সভাপতি বলেন, “পৃথিবীর ঘরে ঘরে যত মানুষ আছে, সবার জন্যে শুভকামনা জানাই আমরা। জয় আমাদের হবেই। সবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই কথা ফিরে উচ্চারণ করব আজ– ‘জয় হোক মানুষের, ওই চিরজীবিতের।’”

সবশেষে বলি, নৃশংসতা আর দুঃস্বপ্নের স্মৃতি না হাতড়িয়ে ঘৃণা আর প্রতিহিংসার অবসান ঘটিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে মনের  ভেতরে সাহসকে। ভীরু আর কাপুরুষতার কবর দিতে না পারলে এ থেকে নিস্তার নেই। নতুন সকালে, নতুন ভোরে ভর করে আসুক সেই সাহস।  ফিরে আসুক বুক ভরা বল। সেই বলে বলীয়ান হয়ে, সৎসাহসে ভর করে নতুন ভোরে সমস্বরে বলি-  এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।