বৌদ্ধ বাংলায় ইসলামী শাসকদের প্রভাব ছিল কতটা?

Path to the Ancient ruins of Monastery Somapura Mahavihara in Paharapur, Bangladesh
Path to the Ancient ruins of Monastery Somapura Mahavihara in Paharapur, Bangladesh. Photo 167057771 © - Dreamstime.com

সামাজিক ইতিহাসের কোনও নির্দিষ্ট কালক্রম থাকে না। সামাজিক ইতিহাসের এই ধারাটি স্পষ্টতই প্রবহমান এবং ক্ষণস্থায়ী। তবে বাংলায়, বিশেষত বৌদ্ধ সংস্কৃতি প্রভাবিত বাংলায় ইসলামি শাসনের পর্যায় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট সময়ক্রমকে ধরে নিতে হবে। আলোচনার সুবিধার জন্য আমরা নদীয়ায় মুসলিম বিজয় থেকে পলাশিতে ইংরেজ শাসক কর্তৃক সিরাজদৌল্লার পরাজয় অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকের প্রথম থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত আনুমানিক ৫৫০ বছরের এই সংস্কৃতির ইতিহাস আলোচনা করা যেতে পারে।

মধ্যযুগীয় বাংলা শাসনাধীন সময়ের ঐতিহাসিক তথ্য এবং তত্ত্বের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। জাহাঙ্গীরের সময়ে মীর্জা নাথান নামে এক আমীর আত্মকথায় ‘বাহারিস্তান ই গৈবী’-তে বাংলা, কামরূপ ও আসামে মোঘল সম্রাজ্য বিস্তারের কথা বলার প্রসঙ্গে ওই অঞ্চলগুলোতে ইসলামি শাসকদের প্রভাব এবং প্রতিপত্তির কথা বর্ণনা করেছেন। মাত্র তিনজন বিদেশি পর্যটক ইবন বতুতা, আবদুল লতিফ, মুল্লাতাকিয়া বাংলার নাতিদীর্ঘ বিবরণসমূহকে লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও সলীমুল্লার ‘তারিখ ই বাঙ্গালা’, গোলাম হুসেন সালিমের ‘রিয়াজ উল্ সালাতিন’ প্রভৃতি বইগুলোও সেই সময়ের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষভাবেই প্রাসঙ্গিক।

মোটের উপর ত্রয়োদশ শতকের প্রথমেই তুর্কি-বিজয় বাংলার ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাজনৈতিক জীবন এবং সামাজিক জীবনেও তার প্রভাব বিশেষভাবে আমাদের চোখে পড়েছে। আমরা যদি বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের দিকে খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাব বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারা গুপ্তযুগ থেকে বাংলায় সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছিল। সপ্তম শতকে এই দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘর্ষ ঘটে তা অনেকাংশেই প্রশমিত হয় পাল রাজাদের সময়ে। বলা যেতে পারে তাঁদের আনুকূল্যে বাংলার সামাজিক জীবনে সমন্বয়ের রূপটি ফুটে ওঠে। বৈদিক ও পৌরাণিক ব্রাহ্মণ এবং একইসঙ্গে মহাযান-হীনযান-তন্ত্রযান বৌদ্ধসংস্কৃতির এক প্রকার মিলন ঘটে এবং মিশ্র সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট হয়।

তবে ত্রয়োদশ শতকের পরেই তুর্কি বিজয়ের পরেই বাংলায় ইসলামি শাসনের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এমনটা নয়। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় দুশো বছরেরও বেশি সময় লাগে। বখতিয়ার খিলজীর রাজ্য ছিল মুসলিম অধিকারের কেন্দ্রস্থল। গোটা বাংলাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে দুশো বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফকরুদ্দিন মুবারক শাহর অধীনে বাংলায় স্বাধীন সালতানাতের সূচনা হয়। এ সময় থেকে দুশো বছর ধরে বাংলা ছিল স্বাধীন। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই এটা ছিল দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কাল। এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হল এ যে, এ সময়ই এ দেশ প্রথম ‘বাংলাহ’ নামে পরিচিতি পায়। এর আগে বাংলার কোনো ভৌগোলিক অখন্ডতা ছিল না এবং সমগ্র দেশের জন্য কোনো একক নামেরও উদ্ভব হয়নি।

গৌড়, রাঢ়, বঙ্গ প্রধানত এ তিন এলাকার নামেই বাংলা পরিচিত ছিল। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এই তিন অঞ্চল জয় করে তাঁর অধীনে সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করার পরই ‘বাঙ্গালাহ’ নামের উদ্ভব হয়। একইসঙ্গে তিনি ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ এবং ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ উপাধি লাভ করেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি ইলিয়াস শাহী সুলতান বংশের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বঙ্গসংস্কৃতি এবং চেতনার এক পরিবর্তন আসে। এই সময়ে অনেক শাসকই পণ্ডিতদের মুখ থেকে পৌরাণিক আখ্যান শুনতে পছন্দ করতেন, সেই উদ্দেশ্যে তারা পারিষদও নিয়োগ করেছিলেন। ইসলামি শাসকেরা ছিলেন সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাই তাঁরা হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণের গল্প গাথা শোনার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আমাদের একটা জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন মুসলমান শাসকদের উদারনৈতিক মনোভাব, সহৃদয় মানসিকতা বৌদ্ধদের তাঁদের ধর্ম এবং সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। এই পর্যায়ে অনেক বৌদ্ধই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম শাসকদের বলপূর্বক কোনও নির্দেশ ছিল না এক্ষেত্রে।

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ‘বৌদ্ধধর্ম’ প্রবন্ধেও জানিয়েছেন যে এই সময়ে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। বঙ্গদেশে ইসলাম ধর্ম প্রসারের স্বর্ণযুগ হিসেবে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতককে চিহ্নিত করা হয়। সুফী সাধকদের উদারনৈতিক মনোভাবই এই ধর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব আরও বিস্তৃত করে। বাংলার বিভিন্ন শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে সুফীগণ বহু দরগা ও তাকিয়া (আশ্রম) নির্মাণ করেছিলেন। পরে তাঁদের শিষ্যরাও এই পথ অনুসরণ করেছিলেন। বাংলার দুই প্রখ্যাত সুফী সাধক  আলাওল হক ও তাঁর পুত্র নুর কুতুবের স্মৃতির উদ্দেশ্যে পাণ্ডুয়াতে দরগা তৈরি হয়। ত্রয়োদশ শতকে প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক হিসেবে শেখ জালালুদ্দীন তব্রেজীর নাম উল্লেখযোগ্য।

ইসলাম ধর্ম প্রসারের অপর একটি কারণ ছিল বাণিজ্য ব্যবস্থা। স্থানীয় ব্যবসা ছিল বৌদ্ধদের হাতে আর এই ব্যবসার সাথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সৃষ্টি করে দেন মুসলিম বণিকেরা। ফলে বৌদ্ধদের সাথে মুসলিমদের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা বলতেই পারি বাণিজ্য ব্যবস্থাই তাঁদের জয়ের পথকে সুগম করেছিল… এছাড়া প্রশাসনিক কাজে অগ্রাধিকারের সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ এই ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে অন্যান্যদের আকৃষ্ট করে। এই সময়ে শিক্ষাব্যবস্থাও বেশ উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন শাসকেরা। মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি হয়। উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘ইলম-ই-দ্বীন’ ও ‘ইলম-ই-শরা’ শিক্ষা দেওয়া হতো। ইলম-ই-দ্বীন বা ধর্মীয় জ্ঞান এবং ইলম-ই-শরা বা শরিয়তের জ্ঞান দ্বারা বহু কিছু বোঝানো যেতে পারে। এইভাবেই বৌদ্ধ বাংলায় ইসলাম শাসকদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। 

( সংক্ষিপ্ত পরিসরটিতে ইসলামি শাসকদের ভূমিকা সেভাবে প্রকাশ না পেলেও, আগ্রহী পাঠকেরা এই সম্পর্কিত অন্যান্য নথি অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন)

তথ্যসূত্র- বাংলাপিডিয়া, বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক-জগদীশ নারায়ণ সরকার