ব্যস্ত শহরের থমকানো ইতিহাস নাখোদা মসজিদ

View at the Nakhoda Mosque in the streets of Kolkata.
View at the Nakhoda Mosque in the streets of Kolkata. Photo 164994310 © - Dreamstime.com

কলকাতা শহর যেন আস্ত একটা গুপ্তধনের বাক্স… ব্রিটিশ কলোনিয়াল সাম্রাজ্যের প্রভাবে গথিক স্থাপত্যের বড় বড় নিদর্শন যেমন ছড়িয়ে রয়েছে এই শহরের রাজপথ জুড়ে, তেমনই ইতিহাসকে সাক্ষী করে এই কলকাতাতেই রয়েছে ইসলামীয় স্থাপত্য শিল্পের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এই প্রসঙ্গে বলা যায় কলকাতা শহর কিন্তু এক অর্থে সাংস্কৃতিক মিলনেরই শহর। এই শহরের রাজপথ থেকে গলিগুঁজির প্রতিটি কোণ, প্রতিটি রাস্তা প্রতিনিয়ত এক নতুন স্বপ্নের কথা বলে। নতুন করে সে যেন ইতিহাসকে চিনতে শেখায় প্রতিদিন।

কলকাতার সবথেকে প্রাচীন মসজিদ

ইসলামীয় স্থাপত্য শিল্পের কথা বলা প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় কলকাতার মধ্যে অবস্থিত সুপ্রাচীন ‘নাখোদা মসজিদের’ কথা। ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সময়ের নিদর্শন এই স্থাপত্যশৈলীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান। মধ্য কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত জনপদ পোস্তা, বড়বাজার। এই বড়বাজার এলাকায় জাকারিয়া স্ট্রিট এবং রবীন্দ্র সরণির সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ‘নাখোদা মসজিদ’। ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকেই অবশ্যই এটিকে কলকাতা শহরের সবথেকে প্রাচীন মসজিদ হিসেবে পরিচিতি দিতে চেয়েছেন। একইসঙ্গে আরও একটা বিষয় বলে নেওয়া প্রয়োজন এখন আমরা নাখোদা মসজিদের যে আদল বা কাঠামোটি দেখতে পাই সেটির নির্মাণ কিন্তু ১৯২৬ সালে।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় নাখোদা মসজিদ তৈরির আগে ওই স্থানে একটি ছোট মসজিদ ছিল। পরে অবশ্য আগ্রার সেকেন্দ্রাতে অবস্থিত আকবরের সমাধিসৌধের আদলে এই মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এই মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রয়েছে কচ্ছের এক ছোট সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায় কুচ্ছি মেনন জামাতদের। তথ্য অনুসারে এই সম্প্রদায়েরই অন্যতম প্রধান নেতা আবদুর রহিম ওসমান এই মসজিদ নির্মাণের কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আরও কয়েকটি কথা বলে নেওয়া যাক। কচ্ছের মেনন সম্পদ্রায় কলকাতায় পা রাখেন ১৮২০ সাল নাগাদ।

তাঁরা বেশিরভাগই চিনি এবং অন্যান্য বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এর পাশাপাশিই অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও তাঁদের বিশেষ আগ্রহ ছিল, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ থেকেই এই মসজিদ নির্মাণের কাজে তাঁরা অংশগ্রহণ করে। মূলত তাঁরই উদ্যোগে মসজিদ নির্মিত হয়। এমনকী মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্যও তিনি করেছিলেন। নাখোদা মসজিদের নামকরণের ক্ষেত্রেও তাঁর জীবিকার একধরনের যোগসূত্র রয়েছে। ফার্সি শব্দ ‘নাখোদা’ বা ‘নাখুদা’ শব্দের অর্থ হল নাবিক, আবদুর রহিম ওসমানও ছিলেন একজন নাবিক।

মসজিদের প্রস্তর ১৯২৬ সালে নির্মিত হলেও নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হতে বেশ কিছু বছর লাগে। ১৯৪২ সালে মসজিদ নির্মাণের কাজ শেষ হয়। অর্থগত পরিসংখ্যান অনুসারে এই মসজিদ নির্মাণে সেই সময়ে আনুমানিক ১৫,০০,০০০ টাকা ব্যয় হয়েছিল।

মসজিদের ভাস্কর্য

ইসলামীয় স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল গম্বুজ এবং স্তম্ভের নির্মাণ। নাখোদা মসজিদের ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা বলতে পারি অনুরূপ শিল্পপ্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনটি গম্বুজ এবং দুটি মিনার রয়েছে এই স্থাপত্যে। মিনারগুলোর উচ্চতা প্রায় ১৫১ ফুট। আরও বলা যায় দুটি সুউচ্চ মিনার ছাড়াও অতিরিক্ত ২৫টি ছোট ছোট মিনার রয়েছে এই সৌধের মধ্যে। যেগুলোর উচ্চতা আবার ১০০ থেকে ১১৭ ফুটের মধ্যে। সুউচ্চ এবং সুপরিকল্পিত এই মসজিদে নামাজ ঘরে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি মানুষ একত্রিত হতে পারেন। দিল্লির স্থাপত্য শিল্পের অনুকরণে যেহেতু এই মসজিদের নির্মাণ তাই এক্ষেত্রে ফতেপুর সিক্রির বুলন্দ দরওয়াজার অনুকরণে এই মসজিদের প্রবেশপথটি নির্মিত হয়েছে।

সময়ের সরণি বেয়ে ২০০৮ সালে রাজ্য সরকারের তরফে একে হেরিটেজ বিল্ডিং-এর আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই মসজিদের প্রাচীনত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিকমহলে নানা আলোচনা উঠে এলেও মসজিদের আশপাশ ঘুরে দেখলে শাহী মেজাজ অনুভব করতে পারবেন। ঈদ এবং রমজান পরবের সময় এই মসজিদ এবং সংলগ্ন রাস্তার সৌন্দর্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। বিভিন্ন রকমের মশলা, আতর, সেমাই আরও অনেক কিছুর দোকান রয়েছে আশে-পাশে।

আরও একটি তথ্য উল্লেখ না করলেই নয়, এটি শুধুমাত্র ইবাদতখানা নয়, এর স্থাপত্যশৈলীর কারণে একধরনের পর্যটনক্ষেত্রও বটে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যটকের জন্যই এই মসজিদে প্রবেশাধিকার রয়েছে। সকাল ৬ টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে মসজিদে আপনি প্রবেশ করতে পারবেন, ঐতিহাসিক এই ইমারতের গায়ে বয়ে চলা ইতিহাসের সাক্ষী থাকতে পারবেন আপনি। প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনও প্রকার প্রবেশ মূল্য নেই। সুতরাং, কলকাতায় ঘুরতে এলে নাখোদা মসজিদে আসতে ভুলবেন না যেন!