শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

ব্যাধির চেয়েও মারাত্মক পথ দুর্ঘটনার মারণ কামড়

জীবন Tamalika Basu ২৫-জানু.-২০২০
ID 167402681 © Thisis Bahl | Dreamstime.com

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ১ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন এবং ৫০ মিলিয়ন মানুষ গুরুতর আহত হচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘে অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। এমন আশ্বাস জনগণের কাছে বহুবার দিয়েছে সরকার। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো অগ্রগতি নেই। প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। নিহত হচ্ছে মানুষ।
জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু ২০১৫ সালে যে ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি’ প্রকাশ করেছিল তাতে দেখা যাচ্ছে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আসলে নিম্ন আয়ের দেশগুলিতেই সবচেয়ে বেশি – আর বাংলাদেশও তার অন্যতম। সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষ দূত জঁ টড ও বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শেফার। তাঁদের মতে, প্রতিবছর অন্তত ১৩ লাখ লোক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। সারা বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই উন্নয়নশীল দেশের। আর এর বড় অংশটা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ জনের ১ জন হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার। এসব দুর্ঘটনায় শিশু, চালকসহ যাঁরাই প্রাণ দিচ্ছেন, তা কিন্তু প্রতিরোধ করা যায়।
এইডসের মতো প্রাণঘাতী রোগের কোনো প্রেসক্রিপশন হয় না। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যায়। স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি আর অঙ্ক শেখার পাশাপাশি সড়কে কীভাবে চলতে হবে, সেটাও জানতে পারে। তাই আমার কাছে সড়ক দুর্ঘটনা রোধই প্রথম অগ্রাধিকার। মনে রাখতে হবে, দুর্ঘটনা শুধু মৃত্যুই ডেকে আনে না। বেঁচে যাওয়া লোকজন পঙ্গু হয়ে পড়ে। বিকলাঙ্গ হয়ে পড়া মানুষ শুধু পরিবার নয়, বোঝা হয়ে ওঠে সমাজ আর রাষ্ট্রের জন্য। তাই সড়কের ব্যবস্থাপনা ঠিক করা জরুরি মনে করি। এরপর আসবে আইন প্রয়োগের বিষয়টি। সড়ক অবকাঠামোর মান এ অঞ্চলে বেশ খারাপ, দ্রুত তাদের হাসপাতালে পৌঁছানোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্রাতিরিক্ত ট্যাক্সির উপস্থিতিতে লোকজনের চাহিদা অনুযায়ী গণপরিবহনের অবাধে সড়কে চলাচল দুরূহ হয়ে পড়ে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে গড়ে দুর্ঘটনার ১০ মিনিটের মধ্যে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। আর বাংলাদেশের মতো দেশে আহত লোকজনকে হাসপাতালে নিতে গড়ে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। ফলে এত দেরিতে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়, যখন আর কিছুই করার থাকে না।
পরিসংখ্যানটি প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তব — ভারতে বহু মারণরোগের প্রকোপের থেকে পথদুর্ঘটনায় বেশি মানুষের মৃত্যু হয় প্রত্যেক বছর। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৬ সালে ভারতের অন্যতম প্রধান মারণব্যাধি ম্যালেরিয়ায় মৃতের সংখ্যা ছিল ২৩৯৯০। ভারত সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে পথদুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৪৭৯১৩ জনের। বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫,২২৭জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬,৯৫৩ জন।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুই প্রমাণ করে ভারতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গভীর সমস্যা রয়েছে এবং তার আশু সমাধান প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যেই মোটর ভেহিকল্‌স আইন সংশোধিত করে যানবাহন চালানোর সময় আইন অমান্যের উপর জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেমন, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার অপরাধে জরিমানার পরিমাণ ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০০০ টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সাধু নিঃসন্দেহে, কিন্তু জরিমানার হারে এই বিপুল বৃদ্ধির মাধ্যমেই পথ দুর্ঘটনা হ্রাসের উদ্দেশ্যটি সাধিত হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ ছ’টি রাজ্য ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে তারা এই নয়া জরিমানার হার বলবৎ করবে না। অন্য দিকে গুজরাট, কর্নাটক ও কেরালা সিদ্ধান্ত নিয়েছে জরিমানার হার বৃদ্ধি করা হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত হারে নয়। রাজ্য সরকারগুলির এই আপত্তি অহেতুক নয়। রাজ্যগুলির আপত্তির মূল কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত, এর ফলে সাধারণ মধ্যবিত্তের উপর বিপুল আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে। এবং দুই, এই হার বলবৎ করলে শেষ পর্যন্ত কার্যক্ষেত্রে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে।
রাজ্যগুলির এই যুক্তির সারবত্তা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে কঠোর আইন প্রায়শই নিম্ন স্তরের দুর্নীতির ফলে নখদন্তহীন হয়ে পড়ে। ট্রাফিক আইনের ক্ষেত্রে সেটি পথচারীদের নিত্যনৈমিত্তিক অভিজ্ঞতা। কাজেই বিপুল জরিমানার পরিবর্তে পথদুর্ঘটনা হ্রাসের অন্যান্য উপায়গুলির উপর জোর দেওয়াই বিচক্ষণতা। প্রথমেই প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। পশ্চিমবঙ্গের ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ প্রচার ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সফল। এর পাশাপাশি অধিকতর সিসিটিভি স্থাপন করে, তার মাধ্যমে ট্র্যাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের চিহ্নিত করার একটি উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এবং অবশ্যই প্রয়োজন, রাস্তার পরিকল্পনাকে আরও সুচারু করা।
বাংলাদেশে বলবৎ হওয়া নতুন সড়ক আইন অনুযায়ী সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।
মোটরযান দুর্ঘটনায় কোন ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।
ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে। ট্রাফিক সংকেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে। সঠিক স্থানে মোটর যান পার্কিং না করলে বা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গণ পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবী বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে। তবে আসল পরিবর্তন আনতে হবে চেতনায়। আমাদের দেশে কে কার আগে যাবে রাস্তায় এই প্রতিযোগিতা করতে থাকে। মারা যায় সাধারণ মানুষ। আবার পথচারীরাও ইচ্ছামতো রাস্তা পার হয়ে যায়। এই দুইটাই বন্ধ হওয়া উচিত।