ব্রিটিশ মুসলমানদের ইতিহাসের কিছু অজানা, মনোগ্রাহী কথা

Visitors at the oldest purpose built mosque in the UK- the Shah Jehan Mosque in Woking, Surrey.
Visitors at the oldest purpose built mosque in the UK- the Shah Jehan Mosque in Woking, Surrey. Photo 66310877 © - Dreamstime.com

ব্রিটিশ মুসলিমদের ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর অধ্যায় হল একদম প্রথম দিকে ধর্মান্তরিতদের গল্প।

বর্তমান যুগের বহু ব্রিটিশ মুসলিম সেই সমস্ত নারী ও পুরুষদের কথা শুনে বিস্মিত হন যাঁরা উনবিংশ শতকের শেষের দিকে এবং বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

ইসলামের ছায়াতলে

ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে এমন বহু উদাহরণের কথা জানা যায়। যেমন, উইলিয়াম কুইলিয়াম, মার্মাডিউক পিকথল, ইয়াহয়া পার্কিন্সন, লেডি জাইনাব কবল্ড, স্যার অর্চিবোল্ড হ্যামিল্টন, লর্ড হেনরি স্ট্যানলি এবং লর্ড হেডলি-র নাম এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়।

সেই সময়ে যাঁরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের জীবনের সাথে জড়িত কিছু অনন্য ঘটনা রয়েছে, এবং তাঁদের জীবনের এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গ সম্পর্কে অতি সম্প্রতি কিছু গবেষক জানতে পেরেছেন।

এমনকী এই ভিক্টোরিয়ান এবং এডওয়ার্ডিয়ান যুগেরও আগে যাঁরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন জলদস্যু জন ওয়ার্ড, যিনি জন ওয়ার্ড দ্য পাইরেট নামেই বেশি পরিচিত। মনে করা হয় যে, হলিউডের ব্লকবাস্টার ছবি পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান সিরিজের মূল চরিত্র- জ্যাক স্প্যারো-র মূল উৎস হলেন- জন ওয়ার্ড। সিনেমার ঘটনাবলীর সাথে জনের জীবনের মিল খুঁজতে যাওয়া হয়তো সঠিক হবে না। তবে জ্যাক স্প্যারোর মতো জন ওয়ার্ডও ছিলেন জেদি, সাহসী, একগুঁয়ে ও কুখ্যাত জলদস্যু।

অনন্য ব্যক্তিত্বরা

উইলিয়াম কুইলিয়ামও ছিলেন যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক ব্যক্তিত্ব। লিভারপুল এলাকার অন্যতম প্রথম সারির এই আইনজীবী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি লিভারপুল এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে উনবিংশ শতকের শেষার্ধে বহু সেই এলাকার ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম কবুল করা ব্রিটিশদের নিয়ে তিনি লিভারপুল মুসলিম ইনস্টিটিউট গঠন করেছিলেন।

জানা গিয়েছে, সেই সময় লিভারপুল এলাকার বাসিন্দা অন্তত ২০০ জন এই সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন প্রফেসর নাসারুল্লাহ ওয়ারেন এবং প্রফেসর হাসচেম ওয়াইল্ডের মতো ব্যক্তিত্বরাও। তিনি এতটাই বিখ্যাত ছিলেন যে অটোমান খলিফা তাঁকে ‘দ্য শেখ অফ দ্য ব্রিটিশ আইলস’ খেতাব প্রদান করেছিলেন।

মার্মাডিউক পিকথল ছিলেন একজন বিখ্যাত লেখক। তিনি ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে মূলত কুরআন অনুবাদের কাজ করেছিলেন এবং তাঁর অনুবাদকেই সবচেয়ে সঠিক সংস্করণ বলে মনে করা হয়। তাঁর অনুবাদ করা কুরআন-ই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় গ্রেট ব্রিটেনে।

ইয়াহয়া পার্কিন্সন হলেন আরও একজন লেখক ও কবি যিনি এই সময়ে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। তিনি মূলত স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা হলেও কুইলিয়ামের সংগঠন লিভারপুল মুসলিম ইনস্টিটিউট-এর সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

প্রথম মসজিদ নির্মাণ

সেই আমলে ব্রিটিশ অভিজাত সম্প্রদায়ের একাংশ মসজিদ নির্মাণের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন – এবং এভাবেই গ্রেট ব্রিটেনের বুকে নির্মীত হয়েছিল প্রথম মসজিদ। এই মসজিদ নির্মাণের ব্যয় বহন করেছিলেন শাহ জাহান বেগম, ভারতের ভূপাল প্রদেশের রাজকুমারী। ক্রমশ এই মসজিদটি ব্রিটেনের বুকে ইসলামি কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সদ্য ধর্মান্তরিত বহু ব্রিটিশ এই মসজিদে আসতেন লন্ডনে পাঠরত মুসলিম ছাত্রদের সাথে আলাপ পরিচয় করার জন্য। তাঁদের মুখ থেকে সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা ব্রিটিশ অভিজাতরা আগ্রহ ভরে শুনতেন ইসলামের নানা কথা। এই ধর্মান্তরিত ব্রিটিশ অভিজাতদের মধ্যে লর্ড হেডলি, স্যার আর্কিবল্ড হ্যামিল্টন এবং লেডি জাইনাব কবল্ড ছিলেন উল্লেখযোগ্য।

এই সমস্ত বিষয়গুলিকে যা আরও মনোগ্রাহী করে তুলেছে তা হল, গোটা ইউরোপের মধ্যে ব্রিটেনে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ফ্রান্স, জার্মানী, অস্ট্রিয়া এবং ইতালি-র ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনার কথা বিশেষ জানা যায় না। ইউরোপের এই দেশগুলিতে ধর্মান্তরিতের সংখ্যা অবশ্য কম ছিল না। তাঁদের মধ্যে ফ্রান্সের রেনে গেনোঁ (Rene Guenon ) ও অস্ট্রিয়ার মুহাম্মদ আসাদ (লিওপোল্ড ওয়েইস)-এর নাম উল্লেখযোগ্য।

ব্রিটেনে ইসলামের শক্তিশালী প্রভাব

কিন্তু সদ্য ধর্মান্তরিতদের মধ্যে সংখ্যার নিরিখে গ্রেট ব্রিটেনের স্থান ছিল সবার উপরে। আর ব্রিটেনের মতো এত সংখ্যক প্রভাবশালী অভিজাত ইউরোপের অন্য কোনও দেশে ইসলাম কবুল করেননি।

ব্রিটিশ মুসলিমদের জন্য এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর একটি বিষয় যে, এতকাল আগেও গ্রেট ব্রিটেনের বুকে বহু সংখ্যক মুসলিমদের বাস ছিল। তাঁরা নিজেদের ভাবাবেগের কথা বিভিন্ন বই (কুইলিয়াম বহু বইয়ের রচয়িতা), অনুবাদ, কবিতা এবং জার্নালের মধ্যে লিখে রেখে গিয়েছেন।

রন গীভস ও জেমি গিলহাম রচিত কুইলিয়ামের জীবনীতে লন্ডন-কেন্দ্রিক ইসলাম কবুল করা ব্রিটিশদের কিছু উল্লেখ রয়েছে। তবে সবার কথা একটি বইতে লেখা সম্ভব নয়। হয়তো নাম-না-জানা আরও বহু ব্রিটিশ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যাঁদের নাম ইতিহাসের গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে। হয়তো পরে কোনও ইতিহাস গবেষকের হাত ধরে আরও অনেকের নাম জানা যাবে।