বয়স্কদের ভুলো-মন হতে পারে ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ

grey hair man
ID 5787972 © Bestpic | Dreamstime.com

ডিমেনশিয়া কী?

বয়সকালে অধিকাংশ মানুষ যে স্মৃতিজনিত সমস্যায় ভোগেন, ডাক্তারি ভাষায় তারই নাম হল ডিমেনশিয়া। বহু বছর ধরে গবেষকরা চেষ্টা করছেন খুঁজে বের করার যে কেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে এমন নানা ধরনের সমস্যা হতে শুরু করে, সেই ধরনের সমস্যাগুলির উপশম কীভাবে করা যায়- তার খোঁজও চলছে।

বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন হাঁটু ও কোমর প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বয়স্কদের পা ও কোমরের যন্ত্রণা সারানোর উপায় বের করা গিয়েছে। হৃদযন্ত্রের সমস্যার ক্ষেত্রে যন্ত্র বসিয়ে হৃৎপিন্ডের গতিকে পুনরায় আগের মতো ছন্দে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। লেন্স প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বয়স্কদের দৃষ্টিশক্তি আবছা হয়ে আসার সমস্যারও সমাধান করা গিয়েছে। তবে ডিমেনশিয়ার মতো মনের রোগের কারণ ও সমাধান এখনও বিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছে। 

এক শতক আগে পর্যন্ত, মানুষের গড় আয়ু এত দীর্ঘ ছিল না। ফলে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে কী ধরনের রোগ বা সমস্যা হতে পারে, তা অজানা ছিল। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু অনেকটাই বেড়েছে। ফলে ডিমেনশিয়ার মতো অজানা বার্ধক্যজনিত সমস্যাগুলি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। 

ডিমেনশিয়া রোগ হলে কী হয়?

এই রোগের অর্থ শুধুই বার্ধক্যজনিত স্মৃতিলোপ নয়। এই রোগের শিকড় তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও জটিল। এই রোগ মানুষের স্মৃতিলোপের পাশাপাশি ভুলিয়ে দেয় তাঁর নিজস্ব আচার-আচরণ, ফলে পরিবর্তন ঘটে মানুষের ব্যবহারে। যেমন, সারা জীবন ভীষণ শান্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত কোনও ব্যক্তি আচমকা কথায় কথায় রেগে যেতে পারেন। এমনকী নিত্যদিনের সাধারণ কাজগুলি করাও এই রোগে আক্রান্ত মানুষের পক্ষে কষ্টকর হয়ে ওঠে। মূলত বয়স্কদেরই ডিমেনশিয়া হয়, কিন্তু ডিমেনশিয়া বার্ধক্যের স্বাভাবিক ধর্ম নয়। এটি একটি বিশেষ রোগ, যাতে বয়স্করা আক্রান্ত হন। 

কীভাবে বোঝা যাবে ডিমেনশিয়া হয়েছে?

এই রোগে আক্রান্তদের প্রাথমিক সমস্যাগুলি অনেকটা এই ধরনের হয়- স্মৃতিলোপ, রোজকার সাধারণ কাজ, যা তিনি বহু বছর ধরে করে আসছেন(যেমন- দাঁত মাজা, স্নান করা ইত্যাদি) সেগুলি করতে না পারা, কিংবা সময় বা স্থান অথবা উভয় গুলিয়ে ফেলা, চোখের সামনে যা দেখছেন তার মানে বুঝতে না পারা, কথা বলা বা লেখার ক্ষেত্রে সমস্যা, কোন জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে করতে না পারা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজনদের চিনতে না পারা ইত্যাদি। এছাড়া আরও নানা ধরনের উপসর্গ হতে পারে। রোগের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের সমস্যাগুলি রোগীর সাথে হতে থাকে। ধীরে ধীরে তা জটিল রূপ ধারণ করতে থাকে। এই প্রাথমিক উপসর্গগুলির মধ্যে এমন অনেক কিছুই রয়েছে, যেগুলোকে সাধারণ কথায় আমরা ভুলো মন বলে উপেক্ষা করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুধুই ভুলো মন বা আনমনা থাকা নয়, এর জন্য দায়ী ডিমেনশিয়া নামক রোগটি। 

ব্রিটেনে ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা ও গবেষণা

ইউকে-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সেই দেশে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অন্তত ৮ লক্ষ। তাঁদের চিকিৎসা বাবদ বছরে খরচ হয় ২৩ বিলিয়ন পাউন্ড, যা ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচের দ্বিগুণ। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বয়স্করা যাতে ভালো ভাবে থাকতে পারেন, তার জন্য বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও কমিউনিটি নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তার পরেও দেখা গিয়েছে, এই রোগাক্রান্ত বয়স্কদের অধিকাংশই জীবনের শেষ দিনগুলি অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় কাটান। কেন এই সমস্যা? ইউকে সরকার এই সিদ্ধান্ত এসেছে যে, এই রোগ সম্পর্কে না জানা এবং সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি এই রোগ সহজে নির্ণয় করতে না পারাও এই সমস্যার অন্যতম কারণ।

২০১২ সালের মার্চ মাসে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ডিমেনশিয়া সংক্রান্ত গবেষণা-কে “জাতীয় অগ্রাধিকার” বলে ঘোষণা করেছিলেন, এবং সেই খাতে সরকার বিনিয়োগ করবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ২০১৫ সালে সেই বিনিয়োগের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরে ১ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ-সহ ন্যাশনাল ডিমেনশিয়া স্ট্র্যাটেজি শুরু হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ডিমেনশিয়ার মতো রোগে আক্রান্তরা যাতে ভালো ভাবে থাকতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা। সেই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য যে লক্ষ্যগুলি স্থির করা হয়েছিল সেগুলি হল, প্রাথমিক ধাপে এই রোগনির্ণয়ের উপরে জোর দেওয়া, যে হাসপাতালগুলি এই রোগীদের পরিষেবা দেবে তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের উপযুক্ত যত্ন নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। 

ইউকে-এর একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ “ইমপ্রুভিং ডিমেনশিয়া কেয়ার ইন দ্য ইউকে- মিটিং দ্য ন্যাশনাল চ্যালেঞ্জ ইনসাইড গভর্নমেন্ট” অনুসারে, বেসরকারি ক্ষেত্রের পাশাপাশি একটি নতুন স্ট্র্যাটেজি চালানো হবে যা ২০টি “ডিমেনশিয়া-বান্ধব” শহর গড়ে তুলবে। এবং ডিমেনশিয়ার গবেষণা বাবদ বার্ষিক অন্তত ৬৬ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হবে।বর্তমানে ইউকে-তে বেশ কিছু ডিমেনশিয়া-বান্ধব কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, যারা এই রোগে আক্রান্তদের ভালো রাখার জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।