ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আরবদের সখ্যতার ইতিহাস

medieval mural
ID 155758545 © Lostafichuk | Dreamstime.com

মুসলমানদের সাথে ভারতের যোগাযোগ আজকের কথা নয়। ভারতের শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যেমন মুসলিম প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তেমনই মুসলিমদের উপরেও ভারতের কিছু প্রভাব ছিল। পারস্পরিক বিনিময়ে লাভ হয়েছিল দুই পক্ষেরই। বিজ্ঞান নিয়ে ভারত ও আরবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা শুরু হয়েছিল বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের সময় থেকে, সেই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত এবং চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি বই সংস্কৃত থেকে আরবিতে অনুবাদ করা হয়েছিল। তখন থেকেই ভারতের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মুসলিম বিজ্ঞানীদের উপরে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। গ্রীক শিক্ষার পাশাপাশি আরবরা হিন্দু বিজ্ঞানের প্রতি সমান ভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নতুন জিনিস শেখার পাশাপাশি সেই শাখায় নতুন গবেষণা চালাতেও এগিয়ে এসেছিল মুসলমানরা।

সিন্ধুর উপরে যখন খলিফা আল-মনসুরের (৭৫৩-৭৭৪) কর্তৃত্ব  ছিল, তখন ভারত থেকে আগত এক পণ্ডিত তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি সিন্ধিন্ড (অর্থাৎ সিদ্ধান্ত) নামে পরিচিত তারাদের গণনার কাজে দক্ষ ছিলেন এবং কারদাগাস (যেমন সিন্স) –এর সাহায্যে প্রতি অর্ধেক ডিগ্রি গণনা করার মাধ্যমে বিভিন্ন সমীকরণ সমাধান করার পদ্ধতি আয়ত্ত করেছিলেন, এছাড়াও গ্রহণের গণনা এবং তৎকালীন বিজ্ঞানের আরো কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। এই সমস্ত বিদ্যা লিখিত ছিল ব্রহ্ম-সিদ্ধান্ত নামক গ্রন্থে।খলিফা আল-মনসুর নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে সেই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় আরবিতে অনুবাদ করা হয়, এবং এই রচনা থেকে এমন পদ্ধতি প্রস্তুত করতে হবে যা বিভিন্ন গ্রহের গতি গণনার ভিত্তি হিসাবে কাজ করতে পারে। এই বিপুল দায়িত্ব সুদক্ষ ভাবে পালন করেছিলেন ইব্রাহিম আল-ফাজারী এবং ইয়াকুব ইবন তারিক। এই বইটির নাম আল-জাজ্আল সিনা আল-আরব(Al-Zīj ‛alā Sinī al-‛Arab), বা সিন্ধান্দ- আল-কবীর। 

এই সিদ্ধান্ত অনুবাদ সম্ভবত সেই বাহন ছিল যার মাধ্যমে ভারতীয় সংখ্যারীতি সম্পর্কে বাগদাদ প্রথম জানতে পেরেছিল। এই হিন্দু পণ্ডিতদের সহায়তায় আল-ফাজারী ব্রহ্মগুপ্তের অপর একটি বই, খণ্ডখাদ্যক অনুবাদ করেছিলেন এবং তার আরবি নামকরণ করেছিলেন আরকান্দ। উভয় গ্রন্থই ইসলাম জগতে জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং দুর্দান্ত প্রভাব প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই ভাবেই আরবরা প্রথমে হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হয়। আলেকজান্দ্রিয়ার বিজ্ঞানী টলেমির চেয়েও আগে তারা ব্রহ্মগুপ্তের  জ্যোতির্বিজ্ঞান আয়ত্ত করেছিলেন।

গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রীক ও সংস্কৃত গ্রন্থগুলিকে মুসলিম বিজ্ঞানীরা নতুন ক্ষেত্র উন্নয়নের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। আরব বিজ্ঞানের উপরেও স্থায়ী ছাপ রেখেছিল হিন্দু গণিত। আজ আমরা যাকে আরবি সংখ্যা বলে চিনি, যা মূলত ভারতীয় সংখ্যা ছিল।  আরবি ভাষায় সংখ্যা-কে বলা হয় হিন্দশাহ, যার অর্থ ভারত থেকে। ‘শূন্য’ লেখার উপায়-সহ সংখ্যা লেখার এই পদ্ধতি গণিতবিদদের আকর্ষণ করেছিল। ইরাকের আরব বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে মহম্মদ ইবন মুসা আল-খাওরিজিমি ৮৩০ সাল নাগাদ বীজগণিত নিয়ে গবেষণার জন্য এই নতুন সংখ্যা ব্যবহার করেছিলেন। ইংরেজী শব্দ অ্যালগোরিদম-এর উদ্ভব হয় তাঁর নাম থেকেই। 

খলিফা আল-মনসুরের উজির খালিদ বর্মাকির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচুর সংস্কৃত মেডিকেল, ফার্মাকোলজিকাল এবং টক্সিকোলজিক্যাল পাঠ্য আরবিতে অনুবাদ করা হয়েছিল। খলিফা হারুন আল রশিদ (৭৮৬-৮০৮) ভারতীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে আরও জ্ঞানলাভ করার জন্য সুশ্রুত দ্বারা রচিত সংহিতা গ্রন্থটি আরবি-তে অনুবাদ করার নির্দেশ দেন। ভারতের বিশিষ্ট বিদ্বান, চিকিৎসক এবং দার্শনিকদের বাগদাদে আমন্ত্রণ জানানোর প্রধানমন্ত্রী ইয়াহিয়া বিন খালিদ বার্মাকী বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিলেন। অনুবাদক নিয়োগের ক্ষেত্রে, খলিফা কোনও ধর্ম বা বর্ণের মধ্যে পার্থক্য করেননি।

মুসলমানরা বিভিন্ন সময়ে যাঁদের সংস্পর্শে এসেছে তাঁদের রীতিনীতি, বিজ্ঞান এবং ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের ইয়াকুব কিন্দি’র (৮৭৩) ভারতের বিবরণ থেকে জানা যায়, কীভাবে ওষুধ সংগ্রহ করতে এবং ভারতীয় ধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য ভারতে দূত প্রেরণ করা হত। আলি ইবন হিউসায়েন মাসুদি (৯৫৬) ভারত সফরে এসেছিলেন এবং হিন্দু বিশ্বাস, কিংবদন্তী থেকে তাঁদের ইতিহাস সম্পর্কে লিখেছিলেন এবং বিজ্ঞান জগতে তাঁদের কৃতিত্বের প্রশংসা করে তিনি লিখেছিলেন ” কৃষ্ণবর্ণদের মধ্যে সবচেয়ে চালাক”।  বাগদাদের বই বিক্রয়কারী ইবন আল-নাদিম, আল-বিরুনি, আল-আশারী, শাহরাস্তানী এবং আরও বহু উল্লেখযোগ্য লেখক তাঁদের বইয়ে পৃথক অধ্যায়ে ভারতীয় ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ৮৫১ সাল নাগাদ সুলেমান বণিক  ভারত ভ্রমণ করেছিলেন এবং চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং দর্শন সম্পর্কে তাঁদের দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন। পরবর্তী কালে সিন্ধুর উপরে বাগদাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে গেলে হিন্দু বিজ্ঞানের সাথে এই নিবিড় যোগাযোগের অবসান ঘটে।

মুঘল শাসনামলে ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্রাটদের আগ্রহের কারণে, বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান, কৃষি, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্র যথেষ্ট বিকশিত হয়েছিল। বেশ কয়েকটি এনসাইক্লোপিডিয়া এবং অভিধান লেখা হয়েছিল। এই অভিধান লেখার প্রয়োজন হয়েছিল কারণ, সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষার মধ্যে কথোপকথনের ফলস্বরূপ নিত্যনতুন ধারণা তৈরি হচ্ছিল। মুঘল শাসনের পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রভাব পড়তে শুরু করে।

বিজ্ঞানে হিন্দুরা যেমন গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিস্তৃত পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন; ঠিক তেমনই মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাগুলির মূল কাঠামো তৈরি করেছিল। মুসলমানরা ভারতে পৌঁছে তাঁদের নিজস্ব জ্ঞানের ভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছিল। মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া নতুন জ্ঞান হিন্দুরা গ্রহণ করেছিল। এরই ফলে হিন্দু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দ্রাঘিমাংশ এবং অক্ষাংশের মুসলিম গণনা এবং ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন বিষয় একাত্ম করে নিয়েছিলেন।