ভারতের স্বতন্ত্র সুরের ধারার প্রবক্তা হজরত আমির খসরু (রহ.)

Amir_Khusro

তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, সংগীতজ্ঞ, অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন সুফি সাধক। ফারসি এবং হিন্দি ভাষা-সাহিত্য তাঁর দক্ষতা ছিল বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। এই দুইটি ভাষার উপরে ভিত্তি করেই তিনি কবিতা এবং গান রচনা করেছেন। অসাধারণ গান এবং কবিতা লেখার জন্য তিনি তাঁর ভক্তদের মধ্যে সুপরিচিত ছিলেন ‘তুত-ই-হিন্দ’-যার অর্থ ‘হিন্দুস্তানের তোতাপাখি’ নামে। পরে অবশ্য ঐতিহাসিকেরাও তাঁকে এই নামে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করেছেন। তিনি আমির খসরু, পুরো নাম হজরত আমির খসরু (রহ.)। 

সংগীতজ্ঞ হজরত আমির খসরু (রহ.) ছিলেন ভারত বিখ্যাত অলি ও দরবেশ হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)- র অন্যতম শিষ্য। আমির খসরু (রহ.) একই সঙ্গে তুর্কি, ইরানী এবং ভারতীয় সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন। তৎকালীন ভারতীয় সংগীত ছিল গ্রিক সংস্কৃতি ও সংগীত প্রভাবিত। আবার ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গীতচর্চা ছিল ইরান এবং আরবদের সঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত। ভারতে গ্রিক সঙ্গীতের প্রভাব শুরু হয় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত বিজয়ের সময় থেকে। আমির খসরু (রহ.) এসব ধারার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম ধারা প্রবর্তন করেন। 

হজরত আমির খসরু (রহ.) একইসাথে ভারতীয় এবং পারস্য কবিতা ও সংগীতে পারদর্শী ছিলেন। পারস্য সংগীতের ‘পরদা’ এবং ভারতীয় ‘রাগ’ সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি ভারতীয় এবং পারস্য সংগীতের মিলন করে নতুন সংগীত প্রকরণের সৃষ্টি করেন। আমির খসরু(রহ.)-র সংগীতের একটি বিশেষ ভঙ্গিকে বলা হত ‘কাওল’ যা সুফি দরবেশদের মাহফিলে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়ে থাকত। 

আমির খসরু (রহ.) পারস্য এবং ভারতীয় সংমিশ্রণে কয়েকটি নতুন ‘তান’ ও ‘লয়’ সৃষ্টি করেন। ভারতীয় এবং পারস্যের পারস্পরিক সুরের মিশ্রণে তিনি ‘সূতার’ এবং অপর কয়েকটি ছন্দ আবিষ্কার করেন। পারস্য সংগীতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিশেষ আগ্রহ সহকারে অংশগ্রহণ করতেন। সে সময় সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও বিজয় লাভ অত্যন্ত মর্যাদার বিষয় ছিল।

তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ নায়ক গোপালকে তিনি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শোনা যায় আলাউদ্দিন খিলজির দরবারে আয়োজিত এক সংগীত প্রতিযোগিতায় আমির খসরু (রহ.) তাকে পরাজিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এ বিজয় তাকে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞের মর্যাদা প্রদান করে।  

তিনি অসংখ্য নতুন রাগ, তাল ও সঙ্গীত যন্ত্র আবিস্কার করেন। আমির খসরু (রহ.) কর্তৃক আবিষ্কৃত নব রাগগুলোর মধ্যে রয়েছে- সাহগাড়ি, ইয়ামানি,  ইসশাক, মুয়াফিক, গানাম, জিলাফ, ফারগানা, সারপর্দা, শিরুদাসত, ঘারা, মুজির, সানাম, জানগুলাহ, খেয়াল, আহমান ইত্যাদি। 

আমির খসরু (রহ.) শুধুমাত্র সঙ্গীতের নতুন নতুন স্বর, সুর ও তালের আবিষ্কারক ছিলেন না- তিনি বহু যন্ত্রেরও আবিষ্কারক। সেতারা, তবলা, রতবাব, দোলক ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কারে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এর মধ্যে সেতারা ও তবলা তাঁর নিজেরই আবিষ্কার বলে জানা যায়। বাকি বাদ্যযন্ত্রগুলো আরব ও পারস্য থেকে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন প্রসঙ্গের কথা বলতে বলতেই তাঁর ব্যক্তিজীবনের প্রতিও আলোচনা করা যেতে পারে।  

তাঁর জন্ম বর্তমান ভারতে অবস্থিত উত্তরপ্রদেশের ইহাত জেলার পাতিয়ালা গ্রামে। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে সুনির্দিষ্ট এবং প্রামাণ্য তথ্য এখনও ঐতিহাসিকদের কাছে আসেনি। তবে ১২৫২-৫৩-এর মধ্যে তাঁর জন্ম হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে থাকেন ঐতিহাসিকেরা। তার মূল নাম ছিল আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দিন মাহমুদ। তাঁর বাবা আমির সাইফুদ্দিন মাহমুদ ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত। মঙ্গোলদের আক্রমণের সময় তার বাবা ভারতবর্ষে চলে আসেন এবং তিনি মামলুক রাজবংশের সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের অধীনে পাতিয়ালা রাজ্যে জায়গিরদারি কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মা বিবি দৌলত নাজ ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজপুত রাওয়াত আরজের কন্যা। কম বয়সেই আমির খসরু পিতৃহারা হন। এরপর থেকে তিনি তার নানা ইমাদুল মুলকের নিকট লালিত পালিত হন। মাত্র ৮ বছর বয়সেই কাব্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা তাঁকে সাহিত্য-কাব্যচর্চায় অনুরাগী করে তোলে।

মাত্র আট বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে যান বালক আমির খসরু। কিন্তু তিনি দরবারের ভিতর প্রবেশ না করে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। তখন বালক আমির খসরু গুনগুন করে একটি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে কবিতা শুনতে পেয়ে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) পাল্টা কবিতা পাঠ আবৃত্তি বালক আমির খসরুকে অভিবাদন জানাতে দরজায় এগিয়ে আসেন। তখন বালক আমির খসরু বুঝতে পারেন তিনি সঠিক জায়গায় এসেছেন। এরপর আমির খসরু নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর প্রিয় শিষ্যে পরিণত হন। নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর দরবারে কাউয়ালি গজল গাইতেন আমির খসরু।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তুহফাতুস সিগার’ প্রকাশিত হয় মাত্র ষোলো বছর বয়সেই। কিছু সময়ে পরে তিনি গিয়াসউদ্দিন বলবনের ভাইয়ের ছেলে মালিক ছাজ্জুর সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নৈপুণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি কাব্যচর্চার মাধ্যমে রাজদরবারের সবাইকে আকর্ষণ করতে থাকেন। গিয়াসউদ্দিন বলবনের ছেলে নাসিরউদ্দিন বুহরা খান তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই কারণেই তিনি কাব্য ও সংগীত চর্চায় গভীর মনোনিবেশ প্রদান করার সুযোগ পান। এ সময় তিনি বুহরা খানকে নিয়ে ‘কিরান উস-সাদাইন’ নামের একটি মসনভি রচনা করেন। 

ইতিহাসের সময় পেরিয়ে আমরা জানি ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে খিলজি রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। এই সময়কালে সুলতান জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজির সচিব পদে তিনি নিযুক্ত হন। আমির খসরু (রহ.) – র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে সুলতান তাকে ‘আমির খসরু’ উপাধি প্রদান করেন। জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজিকে নিয়ে তিনি তার দ্বিতীয় মসনভি ‘মিফতাহুল ফুতুহ’ রচনা করেন। 

জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজি মারা গেলে আলাউদ্দিন খিলজি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সময় আমির খসরু (রহ.) শিল্প-সাহিত্যে তার প্রতিভা পুরোপুরি বিকশিত করার সুযোগ পান। এ সময় তিনি সুলতানের বীরত্বগাথা অবলম্বন করে ‘খাজিনাউল ফুতুহ’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন।   

তার লিখিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ওয়াসতুল হায়াত (১২৭৯), ঘুররাতুল কামাল (১২৯৪), খামসা-ই-খসরু (১২৯৮), সাকিনা, দুভাল রানি (১৩১৬), বাকিয়া নাকিয়া (১৩১৭), নুহ সিপার (১৩১৮), ইজাজ-ই-খসরু, আফজাল উল-ফাওয়াইদ (১৩১৯), তুঘলক নামা (১৩২০), নিহায়াত উল-কালাম (১৩২৫) ইত্যাদি। 

 ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন মাজারের পাশে গিয়ে বিলাপ করতে থাকেন আমির খসরু (রহ.)। এভাবে টানা ছয় মাস কান্না করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর পাশের কবরে শায়িত করা হয় প্রিয় শিষ্য আমির খসরু (রহ.)-কে। এইভাবেই একজন সুফি সাধকের চিন্তা চেতনা অনুপ্রাণিত করেছিল পরবর্তী প্রজন্মকেও।