ভারতে ইসলামী শাসনের বিজয়স্তম্ভ কুতুবমিনার

qutub minar

ভারতবর্ষের দিল্লি শহর জুড়ে আমাদের চোখে পড়বে ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। তার মধ্যে অবশ্যই কুতুবমিনার অর্থাৎ ইসলামি শাসনামলে তৈরি এই স্থাপত্যটির কথা আমাদের উল্লেখ করতে হয়। কুতুবমিনার দিল্লি শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এটিকে বিজয়স্তম্ভ রূপেও উল্লেখ করা যেতে পারে। ইসলামি শাসকদের ভারত বিজয়ের প্রায় সাতশ বছরের বিজয়স্মারকের নিদর্শন এই মিনারের মধ্যে দিয়ে প্রবহমান। ভারতের প্রথম মুসলমান শাসক কুতুবুদ্দিন আইবকের নির্দেশে মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১১৯২-১১৯৩-এর সময়কালে। এই প্রসঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক তথ্যের উল্লেখ করা যেতে পারে।

সুলতান মহম্মদ ঘুরির সেনাপতি কুতুব ১১৯২ সালে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে তরাইয়ের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করে, বলা যায় এই জয়ের মধ্যে দিয়েই ভারতবর্ষে ইসলামি শাসকদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দিল্লি জয়ের পরেই তিনি কুওয়াতুল ইসলাম নামে মসজিদ স্থাপন করেন। এই মসজিদের উত্তর-পূর্ব দিকে মিনার তৈরি হয়। মিনার তৈরির গোড়াপত্তন তাঁর হাতে হলেও, পরবর্তী সময়ে সুলতান ইলতুৎমিশের নেতৃত্বে মিনারের তৃতীয় এবং চতুর্থ তলাটি তৈরি হয়। শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের তত্ত্বাবধানে পঞ্চম তলাটি তৈরির মাধ্যমে মিনার নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়। ত্রয়োদশ শতকে তৈরি এই মিনারটি আফগানিস্তানের জাম মিনারের অনুকরণে নির্মিত। পাঁচতলা। এই মিনারের প্রতিটি তলায় সংযুক্ত রয়েছে ঝুলন্ত বারান্দা।

কুতুবমিনারকে কেন্দ্র করে মনোরম কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। যেখানে চোখে পড়বে আলাই মিনার, আলাই গেট, সুলতন ইসতুৎমিশ, সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন, আলাউদ্দিন খলজি ও ইমাম জামিনের সমাধি সৌধ এবং প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে রয়েছে ২৩ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি লৌভস্তম্ভ, যা আদতে মরচেবিহীন। মিনারটি লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে এবং এর গায়ে রয়েছে পবিত্র কোরানের আয়াত। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, সেই সময়ের স্থাপত্যে-শৈল্পিক নিদর্শনেও চোখে পড়ত আকর্ষণীয় ক্যালিগ্রাফির প্রভাব। মিনারের গায়ে খোদাইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক এই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতের কারণে মিনারটি বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তী শাসকদের হাতে পুণর্নিমিত হয়েছে এই স্মারকটি।

ফিরোজ শাহের শাসনামলে এর শীর্ষ দুই তলা বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সুলতানের উদ্যোগেই আবার নতুন করে তৈরি হয়। ১৫০৫সালে একটি ভূমিকম্পের কারণে মিনার অংশত ক্ষতি হলেও সিকান্দার লোদী এটিকে মেরামত করে। কুতুবমিনারের নামকরণ এবং এর নির্মাণের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে নানা জনের নানা মত। ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকেরই মত যে মূলত সংলগ্ন মসজিদের আজান দেওয়ার সুবিধার্থে মিনার তৈরি হয়, মিনারের এক তলা থেকে আজান দেওয়ার রীতি ছিল বলে মনে করা হয়। এছাড়া বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট হওয়ার কারণে শহরের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের কাজেও এর উপযোগিতা ছিল। কুতুবমিনারের নামকরণ নিয়েও নানা মতভেদ রয়েছে। স্থাপনার নাম আদৌ কুতুবমিনার কিনা এই নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ-ইংরেজ ঐতিহাসিকদের আগে এই নামটি কেউ ব্যবহার করেনি। প্রথম বর্ণনা পাওয়া যায় আমির খসরুর বিবরণীতে। তিনি একে বলেছেন ‘জামে মসজিদের মিনার’।

অন্যদিকে ইবনবতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তেও এই নামের উল্লেখ নেই। বাবরনামাতেও এই নামের উল্লেখ নেই, পরিবর্তে রয়েছে ‘আলাউদ্দিন খিলজির মিনার’ শব্দটি। ঐতিহাসিক আবুল ফিদাও ‘জামে মসজিদের আজানখানা’ বলে একে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীকালে অবশ্য অন্যান্য ঐতিহাসিকেরা যেমন-কানিংহাম, উলসলিহেগ, এন আর মুন্সি এর মিনারের নাম প্রসঙ্গে কুতুবমিনার কথাটি ব্যবহার করেন। কুতুবমিনার এমন নামকরণের ক্ষেত্রেও অনেকে দুটি যুক্তি দেখেছেন। এক, নামটি কুতুবুদ্দিন আইবকের নামানুসারেই করা হয়েছে। দুই, প্রখ্যাত সুফিসাধক কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নামানুসরণে এই স্মারকের নাম প্রদত্ত হয়েছে। 

ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন রূপে এই স্মারকের ভূমিকা যে উল্লেখযোগ্য সে কথা বলাবাহুল্য। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে দিল্লি পর্যটক কর্তৃপক্ষ থেকে তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে এই কমপ্লেক্সের ভিতরে।