ভার্টিকাল বাগানের মাধ্যমে আপনার বাসার দেওয়ালে আনুন সবুজের ছোঁয়া

wall garden
ID 81386349 © Thanate Rooprasert | Dreamstime.com

আমাদের জীবনের পরিসর প্রতিদিন একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। এই ছোটো পরিধির মধ্যেই আমাদের শখগুলোকে যত্ন করে বড়ো করে তুলতে হয়। আমাদের অনেকেরই বাগানের প্রতি একটা ভালোবাসা আছে কিন্তু জায়গার অভাবে সেগুলো এখন আর করে উঠতে পারিনা আমরা। এই কারণগুলোকেই মাথায় রেখে ফিলিপ ইয়েটস ভার্টিকাল বাগানের সৃষ্টিকর্তা, তৈরি করলেন ভার্টিকাল বাগান।

আপনিও মাত্র এই কয়েকটা কাজ করলেই নিজের বাড়িতেই বানিয়ে ফেলতে পারবেন দেওয়াল বাগান।

ছাদে বা বারান্দায় যেখানে দিনে অন্তত ৪-৫ ঘন্টা আলো পৌছয়, সেসব জায়গায় চাইলেই ফল বা শাক সবজি লাগিয়ে খুব সহজেই ভ্যাটিকাল গার্ডেন গোড়ে তোলা যায়। বিশেষত শীতকালীন ফুল যেমন পিটুনিয়া, প্যানসি, ভার্বেনা, ডায়ানথাস, অ্যাষ্টার, ফ্লক্স, স্যালভিয়া বা সারা বছর ফোটে, এমন ফুল যেমন, মর্নিং গ্লোরি, চাইনিজ টগর, টাইম ফুল (Portulaca) বোগেনিয়া, অ্যান্থুরিয়াম ইত্যাদি দিয়েও খুব সুন্দরভাবে তৈরী করা যায় ‘উল্লম্ব বাগান’। এছাড়াও বিভিন্ন শাকসবজি যেমন, লেটুস, ব্রকোলি, লালশাক, পালংশাক, ফরাস বিনস, লঙ্কা, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি দিয়েও ‘উল্লম্ব বাগান’ বানানো যায়। এতে যেমন পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়, তেমনি বাহারি রঙ-বেরঙের সবজি মনের মধ্যে এক অনাবিল স্ফূর্তির সঞ্চার করে। ঘরের ভিতর, লিভিং রুম বা অফিসেও চাইলে ছায়াবান্ধব পাতাবাহারি গাছ যেমন। মানিপ্ল্যান্ট, অ্যালোকেশিয়া, ফার্ন, স্পাইডার লিলি, অ্যান্থুরিয়াম, বোটলিলি, ড্রাসিনা, মনষ্টেরা, রিও প্রভৃতি গাছ দিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন বানিয়ে ভিতরের দেওয়ালগুলিকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলা যায়।

ধরা যাক, বাড়ির বারান্দায় একটি টবে একটি গাছ বড় হচ্ছে। ঠিক তার উপরেই ছোট্ট একটি পাত্রে আরকটি গাছ ঝুলিয়ে দেওয়া হল। এটিও কিন্তু ‘উল্লম্ব বাগান’-এর একটি উদাহরণ। খরচসাপেক্ষ বাগান না করতে চাইলে, জুতো রাখার পুরনো প্লাস্টিকের র‍্যাকে মাটি ভরে যদি কিছু বিরুৎ জাতীয় গাছ লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও একটি ‘উল্লম্ব বাগান’ হয়ে যাবে।

দেওয়াল পছন্দ

আমাদের এই বাগান প্রস্তুত করতে প্রথমেই পছন্দ করতে হবে নিজেদের সুবিধামতো একটা দেওয়াল। যেকোনো গাছ আপনি এতেই লাগাতে পারেন। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন যে দেওয়াল আপনি পছন্দ করবেন সেটা যেন প্রয়োজনমতো জল, বাতাস পায়। বিশেষ করে যদি আপনারা বিশেষ কোনো গাছ লাগান যার নিজস্ব কিছু চাহিদা আছে, সেক্ষেত্রে তার প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা দেখুন। প্যাট্রিক বেল্ন্সের উদ্ভিদবিজ্ঞানের বই আপনি এই বিষয়ে ফলো করতে পারেন।

ফ্রেম প্রস্তুতি

ভার্টিকাল বাগান করার আগে আমাদের একটা ফ্রেম প্রস্তুত করতে হবে। ফ্রেমের সজ্জা যেন স্যান্ডউইচের মতো হয়। যেমন ধরুন স্যান্ডউইচে থাকে স্যালাডের তিনটি স্তর তেমনি এতেও থাকে ফ্রেম, প্লাস্টিকের শিটিং এবং ফ্যাব্রিকের  স্তর। পুরো এই পদ্ধতিটা কিন্ত দেওয়ালে ঝোলানোর আগেই প্রস্তুত করতে হয়। ইদানীং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেমন প্লাস্টিক, লোহা, স্টিল বা কাঠের ফ্রেম বানিয়ে দেওয়ালে সেট করে তাতে পোর্টেবল টব ঝুলিয়ে ‘উল্লম্ব বাগান’ তৈরী করা যায়। পাশাপাশি দেয়ালের ধাপে ধাপে সিমেন্টের স্থায়ী বেড বানিয়ে বা পারগোলা, প্রসারিত দড়ি, খিলান, ধাতব গ্রীল ও ঝুলন্ত ধারক ব্যবহার করেও ঘরে খুব সহজে এটি বানানো যায়।

প্লাস্টিক শীট যোগ

প্লাস্টিকের মধ্যে দিয়ে বায়ুপ্রবাহ হয়। ভার্টিকাল বাগান প্রস্তুতির সময় প্লাস্টিকের শীট ব্যবহার করলে বায়ু ও জলের মাত্রা সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

সার এবং জলসেচ

আপনি যে দেওয়ালে গাছ লাগানো ঠিক মনে করেছেন সেখানে সঠিক এবং উপযুক্ত সার দেবার ব্যাবস্থা করুন। কোনো অসুবিধা ছাড়াই যাতে সেচ ব্যবস্থা ভালো হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এছাড়া যতটা সম্ভব তরল সার সেচ দেবার জলের সাথে দিলেও খুব ভালো হয়। আবার হুক পদ্ধতিরও ব্যবস্থা করতে পারেন। হুকের মাধ্যমে জলের উৎস থেকে জলসেচ সহজেই করা যাবে।

কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে ‘উল্লম্ব বাগান’ তৈরী হয়েছে বোর্ডের উপর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার গাছ দিয়ে। মাটির থেকে প্রায় ১১০ ফুট অপরে গিয়ে শেষ হয়েছে বাগানটির বিস্তার। এক্ষেত্রে বাগানের গাছগুলিকে বিন্দুসেচ পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করা হয়। এই পদ্ধতিতে একটি টিউবকে বোর্ডের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ও তার মধ্য দিয়ে সার মিশ্রিত জল প্রবাহিত হয়। টিউবের গায়ে বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র করা থাকে। ওই ছিদ্র দিয়ে সার মিশ্রিত জল বেরিয়ে গাছের গোড়ায় পৌছয়। তাছাড়াও সারা বছর ধরে বৃষ্টির জল জমিয়ে সেই জল ওই বাগানে ব্যবহার করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

পছন্দসই উদ্ভিদ লাগানো

সুন্দর জায়গা হলে উদ্ভিদও সুন্দর ভাবে বেড়ে ওঠে। সূর্যের আলো, ছায়া, আদ্রতা দেখে নিয়ে তবেই একটা দেওয়ালকে পছন্দ করবেন। কিরকম বায়ু খেলছে জায়গাটায় সেটাও দেখতে হবে। গাছ যদি সারাবছর  চিরসবুজ দেখতে চান তবে ঠান্ডা জায়গাই নির্বাচন করা দরকার।

ধরুন আপনি কোনো শীতকালের গাছ লাগাতে চান, অথচ আপনি তখন বাড়িতে থাকবেন না বাইরে চলে যাবেন। তখন যাতে গাছগুলো নষ্ট না হয়ে যায় সেজন্য আপনি যে অঞ্চলে বসবাস করছেন তার চেয়েও ঠাণ্ডা বেশি এরকম অঞ্চলের উদ্ভিদ লাগাতে হবে। শীতল ও শুষ্ক অঞ্চলের গাছ লাগানো বেশি ভালো। কারণ এতে নিয়মিত জল বা সার দেওয়ার প্রয়োজন পরেনা, উদাহরন স্বরুপ বলা যায় হোস্টার্স,আইবেরিস, ফ্লক্স,ফার্নস, ওয়েগেলা এমনকি ব্লুবেরি।

যদিও এসব বিদেশী গাছ আমাদের এখানে পাওয়া যায় না তবে ফার্ন বা কিছু অর্কিড লাগানো যেতেই পারে। তাছাড়া শহরের বড় নার্সারিতে গেলে দেওয়ালে লাগানোর গাছ অনেক পেয়ে যাবেন।

গাছপালার ডিজাইন 

উদ্ভিদকে সুন্দর ডিজাইনে রাখতে চাইলে অনেক রকম সুবিধা রয়েছে। খুব কম খরচেই এগুলো করা যায়।এক্ষেত্রে আপনি ফেব্রিক করতে পারেন, অথবা নানারকম ভাবে গাছগুলোকে রেজার ব্লেডের সাহায্যে কেটে ডিজাইন বানাতে পারেন।

এছাড়া যদি শেড দিতে চান তো ফার্ন গাছের শেড দিন, অসম্ভব সুন্দর দেখাবে। গাছের মূলের চারপাশে অর্ধবৃত্ত আকারে স্টেপল গানের সাহায্যে স্টেপল করতে হবে। গাছের মূল যাতে পচে নষ্ট না হয়ে যায় সেটারও ব্যবস্থা করতে হবে। মূল থেকে যেন বেশি মাটি না ঝরে,সেদিকে নজর দিন।

প্রাথমিক ভাবে শুরু করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এরপর যখন অভিজ্ঞ হয়ে যাবেন তখন নিজে থেকে পড়াশোনা করে আরও নিত্যনতুন রূপ দিতে পারবেন আপনার বাগানকে।