ভালোবাসার ভালো ভাষার খোঁজে

যে সকল সংস্কৃতির মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে তার ইসলাম কেন্দ্রিক বিভিন্ন শব্দ আরবি শব্দ থেকে ধার করেছে।

যেমন এই ভাষাগুলিতে ‘ভালোবাসা’ শব্দের যে অর্থ রয়েছে তার উৎসমূল হচ্ছে আরবি ভাষাঃ টাইগ্রিগনা, আমহারিক, তুর্কি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, গুজরাটি, বাংলা, মালয়, সোমালি, পসতু, আজারি, দারি, উজবেক।

আপনি যদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে আপনার পূর্বপুরুষদের ভাষা কি এই তালিকাভুক্ত আছে? অন্য সকল ভাষা কোথায় কথিত হয়? এই ভাষাগত পার্থক্য বিশ্বব্যপি মুসলিম মিল্লাতের বিভিন্ন সংস্কৃতি,মানুষ এবং ভাই-বোনদেরকে একত্রে সংযুক্ত করেছে।

আসুন প্রেমের সুতাটি টান দিই এবং দেখি এটি কোথা পর্যন্ত যায়। দেখা যাচ্ছে, আরবি ভাষার বেশ কয়েকটি শব্দের তিনটি বর্ণমূল থেকে উৎসারিত হয়, যার মধ্যে একটি হল ‘হুবিবি’। এই অক্ষরগুলি কাছাকাছি অর্থ সম্বলিত বিভিন্ন শব্দগুচ্ছ গঠন করে, যেমন: হাব্ব, হাবিব, মাহবুব, মুস্তাহাব, মুহাব্বা। এর মধ্যে কয়টি শব্দ আপনি বুঝতে পারছেন? বেশ কয়েকটি হয়ত আপনি বুঝতে পারবেন। বাকি দুটি বর্ণমূলের মধ্যে রয়েছে ‘উদ্দ’ এবং ‘আশক’ ।

ভালোবাসার শব্দগুলি ভাগ্যক্রমে এত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। এক ভাষা অন্য ভাষা থেকে তেমন করেই নতুন শব্দ ধার করে। যেমন করে আমি আমার বোনের কাছ থেকে পোশাক ধার করে থাকি: কারণ হয়ত তার পোশাকগুলো আমার থেকে উত্তম অথবা আমার কাছে উপযুক্ত কোনো পোশাক নেই।

তাই পূর্বে ভাষার অয়ারড্রবেও হয়ত বিভিন্ন শব্দের অভাব ছিল অথবা শব্দটি বর্ণনা করার জন্য শব্দটি আমদানি না করা পর্যন্ত ঐ ধরনের কোনো জিনিসের অস্তিত্ব ঐ ভাষায় ছিল না। ‘ওযু’ শব্দটি আরবি ভাষার ধর্মীয় বিষয়ের একটি উদাহরণ এবং ‘টেলিফোন’ শব্দটি গ্রীক এবং লাতিনের সমন্বয়ে তৈরি প্রযুক্তিগত বিষয়ের একটি উদাহরণ।

তার মানে কি আরবি ভাষায় চলন না আসা পর্যন্ত ভালোবাসার কোনো অস্তিত্ব ছিল না? অবশ্যই বিষয়টি এমন নয়। আরবিতে প্রেম শব্দের জন্য যে শব্দ ব্যবহৃত তা অন্য ভাষাগুলিতে ব্যবহৃত প্রেম শব্দের সহজাত হিসেবে থাকে, তাদের প্রতিস্থাপন না করে বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কের নিজস্ব শব্দ রয়েছে ‘সেভগি’ পাশাপাশি রয়েছে ‘ইশক’। হিন্দিতে প্রেমের জন্য প্রচুর শব্দ রয়েছে: ‘প্রেম’ এবং ‘প্রিয়া’ সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত এবং আরবি থেকে উদ্ভূত ‘মুহাব্বাত’ এবং ‘ইশক’।

তাহলে কেন একটি ভাষায় ভালবাসা প্রকাশের জন্য একাধিক শব্দের প্রয়োজন? আরবি ভাষাগত গার্মেন্টসের অয়ারড্রবে পোশাকগুলি অনেক সুন্দর। তারা জীবন-পরিবর্তনকারী বিশ্বাস এবং বক্তৃতা-পরিবর্তনকারী শক্তি দিয়ে সূচিত হয়। এই ভাষার পোশাকগুলি আধ্যাত্মিকতার সাথে বোনা হয় যা আমাদেরকে নিজস্ব পোশাক থাকা সত্ত্বেও সেগুলি পরতে বাধ্য করে।

ইসলামের প্রসারে বোনা হয় প্রেমের সুতা। মুসলমানদের ধার্মিকতার উদাহরণ দিয়ে এই ধর্মটি ছড়িয়েছিল। এটি এমন নীতি এবং মূল্যবোধ নিয়ে এসেছিল যার কারণে এটি এটি যেখানে গিয়েছিল সেখানেই গৃহীত হয়েছিল। সুতরাং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মালয় ভাষা এবং পশ্চিম আফ্রিকার হাউসা ভাষার অনেক শব্দ আরবি ভাষা থেকে গৃহিত হয়েছে। বিশেষ করে ন্যায়বিচার, দানশীলতা ইত্যাদি এবং ধর্মের সাথে সম্পর্কিত অনেক শব্দ আরবি ভাষা থেকে গৃহিত হয়েছে।  এই শব্দগুলি এই সমাজগুলিতে ইসলাম প্রচারের দিকে ইঙ্গিত করে।

ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং বিজয়ীরা বিশ্বজুড়ে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যের বেশিরভাগ অংশ মুসলমানদের শাসনের অধীনে ছিল, অনান্য অঞ্চলে ইসলাম প্রসারে আরও বেশি সময় নিয়েছিল।

এমনকি যেসব সমাজ ইসলাম গ্রহণ করেনি, তবে যারা মুসলিম ব্যবসায়ীদের সংস্পর্শে এসেছিল, তারা আরবি শব্দ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। মাদাগাস্কারের ভাষা মালাগাসিতে ‘সালামা’ শব্দকে তারা শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় ব্যবহার করে। পূর্ব আফ্রিকার কিসওয়াহিলি ভাষায় ৬ কোটি মানুষ তাদের শব্দভান্ডারের ৩০ শতাংশ আরবী ভাষা থেকে গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় ভাষাগুলিও আরবির প্রতি তাদের মুখাপেক্ষিতা প্রদর্শন করে। ইংরেজিতে শত শত ঋণ করা শব্দ রয়েছে, যার অনেকগুলি বিজ্ঞান এবং দর্শনের সাথে সম্পর্কিত, যেমন ‘বীজগণিত’, ‘রসায়ন’ এবং ‘ক্ষার’। অন্যান্যগুলি হল খাবার জাতীয় যেমন ‘লেবু’, ‘ক্যান্ডি’ এবং ‘চিনি’।

প্রেমের সুতো উন্মক্ত করলে দেখা যাবে, ভালোবাসার ব্যাপ্তিকে শুধু ভাষার দ্বারা যা প্রকাশ করা যায় না। ভাষা আমাদের আত্মপরিচয় এবং সাম্প্রদায়িক বোধের জন্য একটি মৌলিক উপাদান। ইসলাম আমাদের মধ্যে বহুল আলোচিত যে মূল্যবোধের সঞ্চার করেছিল তা গভীরভাবে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এটি একটি আত্মিক সংযোগ।