ভিটামিন সমৃদ্ধ মহার্ঘ মশলা কেশর

safron strands
ID 21437340 © Jurgajurga | Dreamstime.com

ক্ষীর, পোলাও কিংবা বিরিয়ানি… রান্নার গুণাগুণ বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে কেশরের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এর সুমিষ্ট গন্ধ অনেকাংশেই খাদ্যরসিকদের প্রাথমিক রসনা তৃপ্ত করে সে কথা বলাই বাহুল্য। মশলার মধ্যে সবথেকে দামি এবং উৎকৃষ্ট বলেই কেশর চিহ্নিত। তবে কেশরের অন্যান্য গুণাগুণ এবং বাজারে এর দাম এতটা বেশি কেন তা জানতে হলে আমাদের অবশ্যই জানতে হবে, কেশর কী? কোথা থেকে এবং ঠিক কী উপায়ে এই মশলার উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

কেশর হচ্ছে বেগুনি রঙের ছয় পাপড়ি বিশিষ্ট ফুলের পুংকেশর। একটি ফুল থেকে তিনটি পুংকেশর পাওয়া যায় মাত্র। মূলত হাতে করে গাছ থেকে ফুল তুলে কেশর আলাদা করতে হয়। হেমন্তের মাঝামাঝি দু’সপ্তাহ হল এর উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময়। সকালে সূর্য ওঠার সময় ফুল ফোটে, দিনের শেষে মলিন হয়ে যায়। হিসাব বলছে, এক কেজি ফুল থেকে ৭২ গ্রাম তাজা কেশর পাওয়া যায়। যেটা শুকিয়ে গেলে ১২ গ্রামে দাঁড়ায় মাত্র। সুতরাং, কেশরের প্রাথমিক মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে এই যুক্তিটি অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 কেশর ইংরেজিতে ‘স্যাফরন’ নামে বিশেষ পরিচিত। এই শব্দটির উৎপত্তি প্রসঙ্গে মনে করা হয় যে দ্বাদশ শতকের ফরাসি শব্দ ‘সাফরান’ থেকে এসেছে, যা আবরিতে ‘জাফরান’ নামেও পরিচিত। এই কারণেই আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে কেশরের আরেকটি নাম হল ‘জাফরান’। এই কেশর বিশ্বের অল্প কিছু দেশেই উৎপাদিত হয়ে থাকে, তবে ভারত, ইতালি, স্পেন, ইরান… এই চারটি দেশের জাফরান বা কেশর বিশ্ববিখ্যাত। একইসঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে জাফরান রপ্তানি করা হয়ে থাকে, তার প্রায় নব্বই শতাংশ জাফরানই আসে ইরান থেকে। ইরান এই জাফরান উৎপাদন প্রকল্পে সর্বোৎকৃষ্ট বলা যেতে পারে।

কেশরের দাম তুলনামূলক অন্যান্য মশলার থেকে বেশি বলেই এই মশলাতে ভেজাল জাতীয় পদার্থ মিশে থাকার সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করা যায় না। তাই দোকান থেকে জাফরান কেনার সময় আমাদের অতিরিক্ত সতর্কতা মেনে চলতে হবে। কী সেই সতর্কতা? কেশর আসল কী তা চেনার একটা উপায় হল, পুংকেশরের গড়ন মাথায় রাখা। অর্থাৎ প্রতিটি রেণুর মাথাটা একটু মোটা, তলাটা সরু। দুই আঙুলে ঘষে নিলে সুন্দর গন্ধ বেরোবে। হলদে-সোনালি রং লাগবে হাতে। বায়ুনিরোধক পাত্রে কেশর সংরক্ষণ করা যায়। তবে, শুকনো, আধো-অন্ধকার জায়গায় রাখতে হবে।

আলোচ্য অংশ জুড়ে আমরা মূলত কেশর কী? কেশর ঠিক কী পদ্ধতিতে সংরক্ষিত করা উচিত, এই নিয়ে আলোচনা করলাম… এখন আমাদের আলোচনার বিষয়টি হল কেশরের গুণগত পদ্ধতি বিচার করা বা এর উপকারিতার দিকটুকু আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে। 

বেশ কিছু ভোলাটাইল তেলে কেশর ব্যবহার করা হয়ে থেকে—যার মধ্যে স্যাফ্রানল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর আছে এ-ক্রোসিন। এই সব উপাদানের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণের জন্য ক্যানসার প্রতিরোধক হিসাবে কেশর ব্যবহার হয় ভেষজ চিকিৎসায়। অবসাদ, অনিদ্রার উপশমে, স্ট্রেস কমাতে কেশর কার্যকরী।  অ্যান্টিসেপটিক হিসাবেও কেশর ব্যবহার হয়। এতে আছে কপার, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম-সহ নানা খনিজ পদার্থ। পটাশিয়াম আছে বলে হার্টের পক্ষে ভাল, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ম্যাগানিজ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে। কেশরে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি ৬। যেটা খুব কম ফল বা সবজিতেই পাওয়া যায়। এই ভিটামিন শরীরের নার্ভ সিস্টেমকে ঠিক রাখে। শুধু নার্ভ সিস্টেম কেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তার ফলে যেকোনো রোগ থেকেই বাঁচতে সাহায্য করে।এ ছাড়াও কেশরে আছে ভিটামিন এ, সি ফোলিক অ্যাসিড। যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। 

আমাদের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনের এক অন্যতম সমস্যা হল হজমের সমস্যা… এই হজমের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে কেশরকে সঙ্গে রাখুন। রোজ একটু কেশরই খাবার হজম হতে সাহায্য করবে। তার ফলে অম্বল, গ্যাস, আলসার, কনস্টিপেশন এসব সমস্যা থেকেও আপনাকে অনেকটা দূরে রাখতে সক্ষম কেশর। সুতরাং দামের দিক থেকে বেশি হলেও এর গুণগত মানকে কখনওই অস্বীকার করতে পারি না।