ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে কঠোরতা কতটা প্রয়োজনীয়

jeremy-yap-eCEj-BR91xQ-unsplash
Fotoğraf: Jeremy Yap-Unsplash

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা ভুল করবোই। ভুল না করা মানুষের বৈশিষ্ট্য নয়। কাজেই আমরা যে বারবার ভুল করে যাবো, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তবে নিজের ভুলকে আমরা যতটা সহজভাবে নিতে পারি, অন্যের ভুলকে ততটা সহজে নিতে পারি না। নিজের হাজারটা ভুল চোখে পড়ে না, কিন্তু অন্যের দুই-একটা ভুলও আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না। আবার কেউ আমাদের ভুল ধরিয়ে দিলে আমরা অহংকার প্রকাশ করে ফেলি।
.
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘‘প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপ করে। পাপীদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম, যারা তাওবাহ করে।’’ (তিরমিযী)
.
সুতরাং আমরা যখনই গুনাহ করে ফেলবো, তখনই সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তাওবাহ করবো। আল্লাহ তা’আলা তাওবাহকারীকে ভালোবাসেন।

গুনাহকে ছোট মনে করা যাবে না। কেননা গুনাহকে ছোট মনে করলে বড় গুনাহর পথও একটু একটু করে খুলে যেতে পারে। শয়তান খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সে আমাদেরকে প্রথমেই বড় গুনাহ করতে প্ররোচিত করবে না। ছোট গুনাহ করতে করতে ধীরে ধীরে কখন যে বড় গুনাহর কাছাকাছি পৌঁছে যাবো, তা সে আমাদেরকে বুঝতেই দেবে না। তাই ছোট-বড় সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

আমাদের প্রিয়নবী কিভাবে ভুল সংশোধন করতেন সেই বিষয়ে আলোচনাঃ-

১। কৌশলী হন

লোকদের সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করণার্থে তীক্ষ্ণ মেধা এবং কুশলতা ব্যবহারের কথা না বলে, নবীজির মমতা আর নম্রতাকে শুধু আলাদাভাবে পাঠ করলে হবে না। তিনি অগ্রাধিকার বিবেচনা করে লোকদের সমস্যার সমাধান দিতেন। তিনি জানতেন কখন শক্ত হতে হবে আর কখন হতে হবে নরম।
যখন একজন যুবক আযানের সময় উদ্ধত আচরণ করেছিল, রাসূল তার নেতিবাচক শক্তির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন সমাজের উপকারে। মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা। মক্কার যুবক আবু মাযুরাহ এবং তার বন্ধুরা আযানের সময় বিলাল ইবনে রাবাহকে উপহাস করছিল। নবীজি এটা দেখে তাকে তলব করলেন। যুবকটি ভয়ে কাঁপতে লাগল। নবীজি তিরস্কারের বদলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তার কন্ঠস্বর শক্তিশালী কিনা? যুবক ইতিবাচক জবাব দিল। নবীজি তার সাথে আযানের বাক্যগুলো পড়ে সময় কাটালেন। ততক্ষণে আযানের বাক্যগুলো তার মুখস্থ হয়ে গেল। নবীজি তার বুকে হাত রাখলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। আবু মাযুরাহ নবীজির কাছে আযান দেবার অনুমতি চাইল এবং মক্কার নতুন মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে পথে পা বাড়াল, ইবনে মাজাহ।

২। দরকার হলে কঠোরতা দেখান

নম্রতা সুন্দর কিন্তু কঠোরতা ও কখনো কখনো কার্যকরী হতে পারে। ব্যক্তির সংশোধন এবং পরিশুদ্ধি প্রবণতা উসকে দিতে। নবীজি জানতেন কখন দৃঢ়হস্ত হতে হবে আর কখন দেখাতে হবে কোমলতা। যখন দুজন সাহাবীকে গীবত করতে দেখলেন রাসূল তাদের কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন। তাদের হুশিয়ারি দিলেন যে তারা তাদের গোশত খেয়েছে এমনকি তাদের দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে পর্যন্ত তা দেখা যাচ্ছে। তারা নবীজির কাছে ক্ষমা চাইল, এর বদলে নবীজি যার গীবত করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন।

৩। লোকদের মর্যাদার ব্যাপারে ছাড় দিন

ভুল সংশোধনের কালে আমাদের লোকদের মর্যাদানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল থাকতে হবে। উপহাস কিংবা কাউকে খাটো করার কোন সুযোগ নেই। নবীজি ভুলের সমালোচনা করতেন কিন্তু ভুল করা লোকদের দোষ দিতেননা। একবার মাদকাসক্তি ছাড়তে অক্ষম এক ব্যক্তিকে লোকেরা লানত দিচ্ছিল । নবীজি বললেন,
‘তাকে লানত দিওনা। আমি তার ব্যাপারে জানি যে সে আল্লাহ এবং তার রাসূলকে ভালবাসে’। বুখারী

৪। নম্র থাকুন

নবীজি তার চারপাশের লোকদের ভালভাবে বুঝতে পারতেন, তিনি বুঝতে পারতেন কখন কে সংবেদনশীল কিংবা বাজে অবস্থায় আছে। আর ভুল শুধরাতে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নম্র আচরণ করতেন। নবীজির সময় বেদুইনরা পরিচিত ছিল রূঢ় আর কিছুটা অসভ্য হিসেবে। একদিন প্রথমবারের মত মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে এক বেদুইন জোরে জোরে দোয়া করছিল, হে আল্লাহ! আমাকে এবং মুহাম্মদকে ক্ষমা করুন আর কাউকে ক্ষমা করবেন না। নবীজি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নম্রভাবে বললেন, তুমি এমন বিষয়কে (খোদার রহম* সীমাবদ্ধ করছ যা বিশাল হতে পারে।

এরপর লোকটি সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে মসজিদের মেঝে প্রসাব করতে শুরু করল। নবীজি হতবিহবল প্রত্যক্ষদর্শীদের শান্ত করলেন এবং লোকটিকে একা ছেড়ে দিতে বললেন। তিনি সাহাবাদের মনে করিয়ে দিলেন তাদের কাজ হল লোকদের জন্য সবকিছু সহজ করা, কঠিন করা নয়। নবীজির সাথে ঘটে যাওয়া ঐ ঘটনা স্মরণ করে বেদুইন পরে বলেছিল।

৫। ভুল খুঁজে বেড়াবেন না

নবীজি প্রায়ই সমাজনেতা এবং শিক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা পালন করতেন। সকল শ্রোতার উপকারে ভুল শুধরাতে তিনি সুকৌশলে সম্পৃক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রেখে কথা বলতেন। তিনি এভাবে বলতেন, ‘কি হল লোকদের, তারা এমন এমন কাজ করছে!’ এভাবে তিনি সাধারণ ভুল করা লোকদের সতর্ক করতেন, একই সাথে সুকৌশলে ভুলের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের হুশিয়ার করতেন যাতে তারা তওবা করে নিজেদের কাজকে শুদ্ধ করে নেয়। নবীজি অহেতুক গল্প আর গীবত করতে নিষেধ করেছেন।

নবীজি লোকদের মুখের কথাই মেনে নিতেন। তারা নিজেদের যেভাবে প্রমাণ করতে চায় সেভাবেই মেনে নিতেন, গোপনে তাদের ভুল-ত্রুটি খুঁজতে যাননি। নবীজি ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে লোকদের দেখতেন না বরং তাদের গতিবিধি নজরে রাখার বিপক্ষে ছিলেন। আমাদের উচিত মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানোর মাধ্যমে তাদের আরো বড় পাপ খুজে বের করা থেকে বিরত থাকা।