মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক ভাবে না হলেও সামাজিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে ইসলাম

Moscow Mosque
Moscow Cathedral mosque, Russia. The largest and highest in Europe Muslim mosque। ID 117815375 © Elena Koromyslova | Dreamstime.com

রাশিয়ায় জনসংখ্যার ২০ ভাগ মুসলিম। স্থাপত্য নকশায় অনিন্দ্য সুন্দর বেশ কয়েকটি প্রাচীন মসজিদ আছে দেশটিতে। শুধু মুসলমানই নয়, সব ধর্মের মানুষই মসজিদগুলো সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। রাশিয়ার কাজান ক্রেমলিনে অবস্থিত কুল শরিফ মসজিদটি।  তাতারস্তান ও কাজানের মূল মসজিদ এটি। মূলত ১৬ শতকের শুরুতে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। কুল শরিফ নামে সে সময়ের ধর্মীয় একজন স্কলারের নাম অনুসারে মসজিদের নামকরণ করা হয়। ১৫৫২ সালে কাজানকে রাশিয়ান বাহিনী থেকে রক্ষা করার সময় কুল শরিফ তার অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে মারা যান। ধারণা করা হয়, সেই সময় নির্মিত মিনারসংবলিত মসজিদটিতে গম্বুজও ছিল। মসজিদের নকশা ছিল ঐতিহ্যবাহী ভলগা বুলগেরিয়ার আদলে। নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রথম রেনেসাঁ যুগের সামগ্রী। রাশিয়া-কাজান যুদ্ধে মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স ইভান দ্য টেরিবলের হাতে ১৫৫২ সালে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে কাজান ক্রিমলিন আবার এটি আধুনিক নকশায় নির্মাণ করে। ২০০৫ সালের ২৪ জুলাই মসজিদটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখানে একসঙ্গে ৬০০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এখানে মোজাইকের নানা নকশা, অলংকার, ক্যালিগ্রাফিসহ আধুনিক অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে। কুল শরিফ মসজিদের আধুনিক নির্মাণে নানাভাবে সহায়তা করেছিল সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। মসজিদের ছয়টি মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ৫৫ মিটার। বলা হয়, এই মসজিদেই সবচেয়ে বেশি মিনার আছে। ২০০০ সালে মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। দ্বিতল এই মসজিদের দোতলায় জাদুঘর রয়েছে বলে বর্তমানে ‘ইসলামের জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিত কুল শরিফ মসজিদ। প্রচুর পর্যটক এবং দর্শনার্থীদের নিয়মিত সমাগম হয় এই মসজিদ প্রাঙ্গণে।

ইতিহাস বলে, মধ্য এশিয়ায় ইসলাম প্রবেশ করে প্রায় বারো শ’ বছর আগে ইসলামী খেলাফতের সময়। তখন মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরঘিজস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান ও আজারবাইজান ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সেসব এলাকায় আরবি ভাষা এবং পরে তুর্কি ভাষা বিস্তার লাভ করেছে। সেখানে কালচার ইসলামভিত্তিক হয়ে যায়। রাশিয়ায় ইসলাম প্রবেশ করে প্রায় হাজার বছর আগে। রাশিয়ায় কিছু কিছু এলাকাতে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম। দেশটির মুসলিম এলাকা ছাড়াও অন্যান্য এলাকায় মুসলিমদের সংখ্যা কম বা বেশি।

রাশিয়া একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মতো রাশিয়াও মধ্য এশিয়ার অনেক মুসলিম রাষ্ট্র ও এলাকা দখল করে নেয়। রাশিয়ার জার শাসনের সময় পঞ্চদশ শতাব্দীতে এবং তারপর এসব ঘটেছিল। কোনো উপনিবেশবাদী শক্তির অধীনে থাকলে দখলকৃত এলাকার অধিকারীদের অবস্থা ভালো থাকে না। মধ্য এশিয়ার মুসলিম এলাকাগুলোর অবস্থাও তেমনই ছিল।

রাশিয়ার অধীনে মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। তাদের ধর্মীয় অধিকার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তাদের অর্থনীতি শোষিত হচ্ছিল রাশিয়া কর্তৃক। এরপর ১৯১৭ সালে কমিউনিস্ট বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। তারা কমিউনিজম ও নাস্তিক্যবাদ চাপিয়ে দেয়। একটি মাত্র পার্টির রাষ্ট্র কায়েম করে।
কমিউনিস্ট রাশিয়ায় সব ধর্মের লোকজনের অবস্থাই খারাপ ছিল। সবচেয়ে খারাপ ছিল তৎকালীন মুসলমানদের অবস্থা। রাজনৈতিক পরাধীনতা এবং অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও ইসলামকে কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নাস্তিকতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়। ইসলামী শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কুরআন প্রকাশ ও প্রচার করা নিষিদ্ধ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। রাশিয়ায় কমিউনিজমের পতন হয়েছে।

বর্তমান রাশিয়া কর্তৃক মধ্য এশিয়ার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানকার রাশিয়ার মুসলিম এলাকাগুলো হচ্ছে- চেচনিয়া, ইংগুশেতিয়া, দাগেস্তান, তাতারস্থান ও কারাজাই চেরকেশিয়া। মুসলিম এলাকাগুলোর জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে দুই কোটি মুসলিম। ইংগুশেতিয়ার ৯৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম। দাগেস্তানের মুসলিম জনসংখ্যা ৯২ শতাংশ। তাতারস্থান ও কারজাই এলাকায় ৫০ শতাংশের বেশি মুসলিম। রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও মুসলিম আছে। রাশিয়ার সব এলাকা মিলে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ ভাগ।

বর্তমানে রাশিয়ায় মুসলমানরা প্রায় পুরোপুরি স্বাধীন। তাদের সব মসজিদ খুলে দেয়া হয়েছে। তারা ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন। নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। ইসলামী সাহিত্য প্রকাশ ও প্রচার করতে পারেন। বিশ্বের অন্যতম বড় মসজিদ কিছু দিন আগে মস্কোতে তুরস্কের সহায়তায় তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উপস্থিত ছিলেন।

এখন মধ্য এশিয়ার মুসলিমদের অবস্থা আলোচনা করছি। সেখানে রয়েছে কাজাখস্থান (৭০% মুসলিম), কিরঘিজস্থান (৮৬% মুসলিম), তাজিকিস্তান (৯৮% মুসলিম), উজবেকিস্তান (৯০% মুসলিম) এবং তুর্কমেনিস্তান (৯৩% মুসলিম)। এগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত রাশিয়ার দখলে ছিল। এই রাষ্ট্রগুলোর মোট জনসংখ্যা সাড়ে ৮ কোটি যার ৯০ শতাংশ মুসলিম।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এসব রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে। তবে এদের শাসকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাবেক কমিউনিস্ট। তারা তাই তাদের রাষ্ট্রকে সেকুলার ঘোষণা করেছেন। এর পরও কোনো কোনো রাষ্ট্র ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির সদস্য হয়েছে, ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিকভাবে ইসলামকে ‘স্বাধীন’ বলা যায় না। কিন্তু ভবিষ্যতে এসব এলাকায় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটলে ইসলামই মূল শক্তিতে পরিণত হবে। এখনই ইসলাম এসব দেশের মূল সামাজিক শক্তি। মুসলিমরা মোটামুটি স্বাধীনভাবে ইসলাম চর্চা করতে পারেন, ইসলামী শিক্ষা নিতে পারেন, কুরআন প্রকাশ করতে পারেন। রাশিয়ার এসব দেশের মুসলিমরা এখন হজ পালন করতে পারছেন। একমাত্র রাশিয়া থেকেই ২০১৮ সালে প্রায় ২০ হাজার মুসলিম হজ পালন করেছেন। মেয়েদের শিক্ষা বাড়ছে এবং হিজাবের ব্যবহারও বাড়ছে। এসব দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা মুসলিম বিশ্বে পড়তে যাচ্ছে এবং তারা ফিরে এসে কাজ করছে ইসলামের জন্য।