মসজিদের পাশে গুরুদুয়ারা, মুঘলদের স্মৃতিবাহক লাহোর

lahore
Wall Art of Badshahi Mosque in Lahore,Pakistan ID 46800568 © Pulpitis | Dreamstime.com

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় মুঘল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করেছিল। সেইসময় ইসলামী সংস্কৃতির ওপর প্রভাব পূর্বের থেকে অনেক বেশি প্রভাবিত করতে শুরু করে। সালটা ১৫২৬, প্রতিষ্ঠিত হলো তৎকালীন মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর লাহোর।

ইসলাম সংস্কৃতির পীঠস্থান এই শহর লাহোরকে, তখনকার পাঞ্জাবের রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়। মুঘল সম্রাট হিসেবে ১৫৫৬ খ্রীঃ-তে সিংহাসনে বসেছিলেন হুমায়নের পুত্র সম্রাট আকবর। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত প্রাসাদ, বাগান থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি ভাস্কর্য সুন্দর ভাবে সজ্জিত করে গড়ে তোলেন।

এই সময়েই তিনি লাহোরে প্রতিষ্ঠা করেন একটি দূর্গ। স্থানীয় ভাবে শাহী কিল্লা নামে পরিচিত এই দূর্গ লাহোরের উত্তরপশ্চিমে ইকবাল পার্কে অবস্থিত বর্তমানে। সর্বশ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাটের সৃষ্টি এই বিশ্ব ঐতিহ্যটি ২০ হেক্টর জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮১ খ্রীষ্টাব্দে ইউনেস্কো এই দুর্গকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বলে ঘোষণা করে। ১৬৭১ থেকে ১৬৭৩ সালের মধ্যে লাহোরে নির্মাণ করা হয়েছিল বাদশাহি মসজিদ। সম্রাট আওরঙ্গজেব এটির অনুমোদন দিয়েছিলেন। লাহোর দুর্গের বিপরীতেই এর অবস্থান। এই দুর্গের কিছু বিখ্যাত স্থানের মধ্যে রয়েছে শিশ মহল, আলমগিরি ফটক, নওলাখা প্যাভেলিয়ন ও মোতি মসজিদ।

পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ শহর লাহোরের পরিচিতি অন্য এক বিশেষ কারণেও আছে। লাহোর সুন্দর কারুকার্যখচিত কার্পেটের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। সুদক্ষ হাতে বোনা ও নিঁখুত কাজ করা এই গালিচা দেখলে পারস্যের ঐতিহ্যশালী গালিচার কথা মনে পরে যায়। এই বুনন শিল্পে লাহোরের জুড়ি সেভাবে আর নেই। এই শিল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরন হিসেবে বলা যায় যে পশমিনার গালিচা, যা দেখে দেখে পর্যটকরা অভিভূত হয়ে যায়। এই কার্পেটের বাণিজ্যের জন্য আর্থিক অবস্থারও বেশ উন্নতি ঘটেছে আঞ্চলিক শিল্পীদের। আকবরের এই দূর্গে সেইসময় থেকে কাশ্মীরি শাল বানানোর রীতিও চলে এসেছে। হিমালয়ের ছাগল, ভেড়ার লোম থেকে বোনা হয় নানা রকমারি কাশ্মীরি শাল। সম্ভবত এখানে যে কারিগররা কাজ করেন তারা আর্মুয়ার সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরবর্তী  মুঘল সম্রাটরা থাকাকালীন লাহোর  দুর্গের রমরমা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গ প্রতিটি সাম্রাজেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়। এই লাহোর দুর্গও তাতে কোন অংশে কম ছিলনা। ক্রমাগত জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকা লাহোর হয়ে ওঠে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের পীঠস্থান।

এর পর মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান হলে অপর প্রান্ত দিয়ে ঢুকল শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা। তারাও লাহোরের উন্নতিতে নিজেদের অবদান দিয়েছে। এবং ধীরে ধীরে মুসলমানদের পাশাপাশি শিখরাই হয়ে ওঠে লাহোরের প্রধান বাসিন্দা।

মুঘল আমলের লাহোরের প্রধান কেন্দ্র এই দুর্গের দুইটি ফটক ছিল। আকবরের সময় তৈরী প্রথম ফটকটি ছিল মসজিদ অভিমুখে, তিনি এর নামকরণ মাসিতি। দ্বিতীয় ফটকটি ঔরঙ্গজেব নির্মিত। এই আলমগিরি ফটকটি বাদশাহী মসজিদমুখী।বিভিন্ন কারণে মাসিতি ফটকটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বর্তমানে শুধু আলমগিরি  ফটককেই পর্যটকদের একমাত্র প্রবেশপথ করা হয়েছে।

মুঘল, ব্রিটিশ শাসনামলের স্মৃতিচিহ্ন এখনো বহন করে চলেছে লাহোর। লাহোর ফোর্ট, পাকিস্তান মিনার, শালিমার গার্ডেন, বাদশাহী মসজিদ, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা কলেজ সবই লাহোরে। বাদশাহী মসজিদের পাশে স্বগর্বে এখনো দাঁড়িয়ে আছে রণজিত্ সিংয়ের গুরুদুয়ারা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে চলেছে লাহোর জাদুঘর। কী নেই সেখানে। জাদুঘরে আছে হযরত হোসাইন (রা.)-এর হাতে লেখা কুরআন শরীফ। মুঘল এবং শিখ শাসনামলের দরজা, অনেক চিত্রকর্ম। আছে গৌতম বুদ্ধের ভাস্কর্য, হিন্দু দেবতাদের ভাস্কর্য, কালী মূর্তি, শিব লিঙ্গ। ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টস (এনসিএ) আর লাহোর জাদুঘরের একইসঙ্গে বেড়ে ওঠে। এ প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন চারুকলা প্রতিষ্ঠান।