SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মসলিন: হাওয়ার ন্যায় মিহি সেই রহস্যময় বস্ত্রের ইতিহাস

শিল্প ২৭ জানু. ২০২১
জানা-অজানা
মসলিন
© Anne Marie Hudon | Dreamstime.com

মসলিনের কথা আমি প্রথম শুনি করাচীর এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যেয়, ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি। বারান্দায় বসে স্কুলের হোমওয়র্ক করছিলাম, আব্বা পাশে বসে ছিলেন। আমার অভ্যাস ছিল পড়ার ফাঁকে ফাঁকে নানা বিষয় নিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করা। আব্বার অভ্যাস ছিল চা খেতে খেতে সেগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা। সেদিনের আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল এশিয়া মহাদেশে ব্রিটিশদের কলোনি স্থাপন। সেখান থেকেই মসলিন নিয়ে আলোচনার উৎপত্তি।

মনে আছে, আব্বা গভীর দুঃখের সঙ্গে মাথা ঝুঁকিয়ে বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশরা আমাদের মসলিন শিল্পকে পুরো ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে।’

আমাদের আদি বাড়ি পূর্ব পাকিস্তান, অধুনা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাজধানীর নাম ঢাকা। বুড়িগঙ্গার পাশে নবাবী রান্নার ঘ্রাণ আর নবাবী ঘরানার ইতিহাস বুকে নিয়ে অজস্র রিকশাতে চড়ে যে শহর এগিয়ে চলে। সেই ঢাকা একসময় বিখ্যাত ছিল মসলিনের জন্য।

‘কী করেছিল ব্রিটিশরা?’ আমার উৎসুক প্রশ্নের উত্তরে আব্বা জানিয়েছিলেন, নিজেদের মেশিনে বানানো সুতির কাপড় বিক্রির জন্য ঢাকা ও সেই সংলগ্ন অঞ্চলের তাঁতিদের মসলিন বোনা বন্ধ করে দিয়েছিল ব্রিটিশরা। কথিত আছে, তাঁতিরা যাতে বুনতে না পারে তাই তাদের হাতের বুড়ো আঙ্গুল কেটে দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের সময়ের সমস্ত বাঙালি ছেলে মেয়েরা এই গল্প শুনেই বড় হয়েছে। মসলিন ও তার হারিয়ে যাওয়ার গল্প যেন শিল্প, হত্যা ও বিস্মৃতিকে বুকে করে বয়ে চলেছে এতকাল।

মসলিনের ইতিহাস

মূলত উত্তম কার্পাস তুলো থেকে মিহি সুতো উৎপাদন করে যে সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র মসলিন বুনত বাংলাদেশের তাঁতিরা। কথিত আছে, মহান নবীর জন্মের প্রথম শতককাল থেকেই বঙ্গে বয়নশিল্প গড়ে ওঠে। তবে এর মধ্যে মসলিন বুননের জন্য বিখ্যাত ছিল ঢাকা, সোনারগাঁও ও জঙ্গলবাড়ি। ব্রিটিশদের অন্যায় নিয়মের আগে বাংলাদেশের প্রায় দুই হাজার তাঁতি মসলিন বুনে সরবরাহ করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। ইউরোপে সেই কাপড়ের আদর ছিল অভিজাতদের মধ্যে। এমনকি ফরাসী সাম্রাজ্ঞী মেরি আতোঁনেতের প্রিয় ছিল মসলিনের পোশাক।

মসলিন শব্দটি সম্ভবত মার্কো পোলোর বিবরণে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছে। ইরাকের মসুলে এক সুতিবস্ত্রের বাণিজ্যের বিবরণে তিনি প্রথম মসলিনের দেখা পান। বাংলায় মসলিনকে বলা হয় মলমল। ফ্যাশন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুজান গ্রিনের মতে, ফরাসী শব্দ ম্যুজ থেকে মসলিনের উৎপত্তি। ম্যুজের অর্থ দুগ্ধফেনানিভ।

মুঘল আমল ও মসলিন

সুলতানি আমল হোক কিংবা মুঘল আমল, মসলিন বরাবর ভারতীয় উপমহাদেশের অভিজাতদের পরিধান হয়ে রয়ে গিয়েছে। মুঘলরা মসলিনের কারুকার্যে প্রভূত উন্নতি ঘটিয়েছিল। সূক্ষ্ম মসলিনের উপর বুটি ও চিকনকারির কাজ তাদেরই অবদান। নানাপ্রকার মসলিনের নামকরণও তারা করে। এর মধ্যে বিখ্যাত হল-

  • আবরোয়ান- প্রবহমান জল
  • শবনম- ভোর রাতের শিশির
  • তাঞ্জেব- শরীরের অলংকার
  • নয়নসুখ- চোখের আরাম ইত্যাদি

আকবরের আমলে ঢাকা অবিভক্ত বঙ্গের রাজধানীর সম্মান পায়। আকবর ও তাঁর বেগমদের জন্য ‘মলমল খস’ নামক কাপড় বুনে দিত তাঁতিরা। ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রীষ্মে সেই কাপড়ের বেশবাসই আকবরকে শান্ত রাখত।

মসলিন তৈরির প্রক্রিয়া এত জটিল আর সময় সাপেক্ষ ছিল যে তা বাদশাদের জন্য তৈরি করেই দিন কাটতো তাঁতিদের। নিজেদের বিক্রির জন্য বাড়তি মসলিন তৈরির সময় পেত না তারা।

মসলিন ও বিশ্ব

অষ্টম শতক থেকে বঙ্গের সঙ্গে আরব বণিকদের বাণিজ্যের সূচনা হয়। মসলিন আরব বণিকদের হাত ধরে বসরা ও বাগদাদে পৌঁছয়। মক্কায় হজ যাত্রীদের মধ্যে ভীষণ প্রিয় ছিল মসলিনের কাপড়। এরপর আস্তে আস্তে পূর্বে জাভা ও চীনদেশে মসলিনের আদর শুরু হয়। তারপর গ্রিস হয়ে ইউরোপে পৌঁছয় মসলিনের গুণগান। ১৭৭২ সালের এক হিসাব থেকে জানা গিয়েছে, বাংলার নবাবকে পাঠানো হয়েছিল তিন লক্ষ টাকার মসলিন। ওদিকে ওলন্দাজ বণিকরা ১৭৮৭ সালে এক লক্ষ টাকার মসলিন ইউরোপে নিয়ে যায়। একই বছর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তিন লক্ষ টাকার ব্যবসা করে।

ইউরোপীয়দের কাছে মসলিনের পরিচয় ছিল, এমন এক বস্ত্র যা হাওয়া থেকে তৈরি হয়ে পানিতে মিলিয়ে যায়। বাস্তবিকই, মসলিনের সূক্ষ্মতা ছিল এমনই আশ্চর্যজনক।

মসলিন বানানো হত কীভাবে?

মেঘনার চরের ফুটি কার্পাস আর বোয়াল মাছের চোয়ালের দাঁত, মসলিন তৈরির জন্য এই দুটি উপকরণ অত্যাবশ্যকীয়। ফুটি কার্পাস পৃথিবীর আর কোথাও চাষ করা যায়নি। আর বোয়াল মাছের চোয়ালের চিরুনির মত ব্যবহার করে সেই তুলোকে সূক্ষ্ম করে ফেলার পদ্ধতি আর কোনও দেশের মানুষ আয়ত্ব করতে পারেনি।

সাধারণত মহিলারা সুতো কাটার ও সুতো আঁচড়ানোর কাজগুলো করতেন। এরপর যে পদ্ধতিগুলো পেরিয়ে মসলিন তৈরি হত তা হল-

সুতো নাটানো, টানাপড়েন, সান বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাঁধা এবং তারপর কাপড় বোনা। একটি কাপড় বুনতে সময় লাগত কমপক্ষে তিন মাস। তারপর সেই কাপড় বিশেষ ক্ষার ব্যবহার করে প্রবহমান নদীর জলে ধোয়া হত। তারপর শুকিয়ে ইস্ত্রি করে তৈরি হত সেই অদ্ভুত রহস্যময় বস্ত্র- যাকে বিশ্ব মসলিন নামে চেনে।

ইংল্যান্ডের সস্তা সুতো এদেশে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে থাকে মসলিন। সঙ্গে দেশীয় নায়েব পাইকদের অত্যাচারে তাঁতিরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গকে মূলত নিজেদের মেশিনে বোনা সুতোর বাজারে পরিণত করেছিল।

মসলিনের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে ‘সোনালি ঐতিহ্য মসলিন শাড়ি পুনরুদ্ধার’ প্রকল্পের সূচনা করে। এই প্রকল্পের প্রযুক্তির সাহায্যে কাপড় ও সুতো উৎপাদনের পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। সব ঠিক থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ আবার হৃত ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

বিশ্বে কাছে আবার বন্দিত হবে সেই অদ্ভুত বস্ত্র, যা হাওয়ার মতো মিহি ও পানির মতো অদৃশ্য।