মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল ক্বদর-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আকীদাহ ৩০ এপ্রিল ২০২১ Contributor
ফিচার
লাইলতুল ক্কদর
Photo : Dreamstime

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর মহিমান্বিত একটি রজনী। এ রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। এ রাতে এত অধিকসংখ্যক রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন যে, সকাল না হওয়া পর্যন্ত দুনিয়ার বুকে এক অনন্য শান্তি বিরাজ করে। মহান আল্লাহর ভাষায় লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “আমি একে নাজিল করেছি লাইলাতুল ক্বদরে। লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল ক্বদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (আল কুরআন-৯৭: ১-৫)

লাইলাতুল ক্বদর নামকরণের কারণ

লাইল শব্দের অর্থ রজনী বা রাত আর ক্বদর শব্দের অর্থ পরিমাপ করা, কোনো বস্তু উপযোগিতা অনুসারে পরিমিতরূপে তৈরি করা। শরীআতের পরিভাষায় ক্বদর শব্দটি তাকদির তথা বিধিলিপির অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ক্বদর শব্দের অর্থ তাকদির বা ভাগ্য। যেহেতু এ রজনী অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সম্মানিত তাই এ রজনীকে লাইলাতুল ক্বদর বলা হয়ে থাকে। আবার যেহেতু এ রাতে পরবর্তী এক বৎসরের অবধারিত বিধিলিপি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সে কারণেও এ রাতকে লাইলাতুল ক্বদর বলা হয়।

সুরা ক্বদর নাযিল হওয়ার পটভূমি

ইবনে আবি হাতেম (রাযিঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের সামনে বনী ইসরাঈলের জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করলেন যে, তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করে এবং জীবনের অধিককাল ইবাদতে রত থাকেন। এ সময়ের মধ্যে তারা আল্লাহর একটিও নাফরমানি করেননি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবান মোবারক থেকে এ কথা শুনতে পেরে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং নিজেদের ব্যাপারে (হায়াত কম হওয়ার কারণে) আফসোস করতে লাগলেন।

এমন সময় সাহাবায়ে কেরামের এ আফসোসের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট সুরা ‘ক্বদর’ নাযিল করেন।

লাইলাতুল ক্বদর-এর গুরুত্ব

লাইলাতুল ক্বদরের ফযিলত বোঝানোর জন্য আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ‘ক্বদর’ নামে আলাদা একটি সূরাই অবতীর্ণ করেছেন। এছাড়া বহু হাদিসেও লাইলাতুল ক্বদরের ফযিলত বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি তা (কুরআন) এক মোবারক রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থিরকৃত হয়।” (আল কুরআন-৪৪: ৩-৪)

হাদিসে বর্ণিত আছে, লাইলাতুল ক্বদরে জিবরাইল (আঃ) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ ইবাদতে মশগুল থাকে, তাদের জন্য রহমতের দু’আ করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “যদি তোমরা কবরকে আলোকময় পেতে চাও তবে লাইলাতুল ক্বদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত করো।”

এছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যদি কেউ ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াব লাভের নিয়তে লাইলাতুল ক্বদর কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদে অতিবাহিত করে তবে তার পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারি)

লাইলাতুল ক্বদর কবে?

আল্লাহ তা’আলার বিশেষ হিকমতে লাইলাতুল ক্বদরের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ কুরআন বা হাদিসে বর্ণিত নেই। অনেকেই মনে করেন ২৭ রমযানই লাইলাতুল ক্বদরের রাত। আসলে এ ধারণাটি সঠিক নয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও এ কথা বলেন নি যে, ২৭ রমযানের রাত ক্বদরের রাত। তবে শেষ দশকের বিজোড় রাত অর্থাৎ, ২১ রমযান থেকে নিয়ে ২৯ রমযান পর্যন্ত বিজোড় যে কোন রাতই এই মহিমান্বিত রজনী হতে পারে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

লাইলাতুল ক্বদরের তারিখের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমাকে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়েছিল, অতঃপর (বিশেষ হিকমতে) আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমুহে তা সন্ধান করো।” (বুখারি)

একদা উবায়দা (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে লাইলাতুল ক্বদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, রমযানের শেষ দশ দশকের বিজোড় রাতগুলোকে তালাশ করো। (বুখারি)

তাই ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমযানের রাতগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

কুরআন ও হাদিসে এ রাতের এত ফযিলত বর্ণিত হওয়ার পরও যারা এ রাত থেকে গাফেল থাকে তাদের সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হল।” (ইবনে মাজাহ)

লাইলাতুল ক্বদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায় সেজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ দশদশকের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন এবং তার উম্মতকেও ইতিকাফ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।