মহীশূরের শাহী কুতুবখানা থেকে যে খাজানা লুঠ করেছিল ইংরেজরা

mysore palace , india
The famous Mysore Palace , Mysore , India. Photo 32750953 © - Dreamstime.com

১৭৬১ সালে ওয়াদিয়ার রাজবংশের হাত থেকে মহীশূর (অধুনা কর্ণাটক) রাজ্যের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন হায়দার আলি। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, হায়দার আলি অশিক্ষিত ছিলেন, তবে বিদ্যা ও জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরোগ ছিল। সেই কারণে নিজের রাজ্যে পড়াশোনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতে আরম্ভ করেন। 

তাঁর বড় ছেলে টিপু সুলতান যাতে ছোটবেলা থেকেই সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে, সেই দিকে নজর ছিল হায়দার আলির। সুশিক্ষা পেয়ে বাবার মতোই বিদ্যানুরাগী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। টিপু সুলতান হিন্দি-উর্দু-কন্নড়ের পাশাপাশি, ফার্সি, আরবির  মতো ভাষা এবং কুরআন, ইসলামী আইনশাস্ত্র, অশ্বচালনা, তীরন্দাজি ও তলোয়ার চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন।  

হায়দার আলির মৃত্যুর পরে ১৭৮২ সালে টিপু মহীশূরের রাজ্যভার নিজের হাতে তুলে নেন। তাঁর আমলে রাজ্যে শিক্ষার বিস্তারে আগ্রহী টিপু মসজিদের ইমাম ও কাজীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রতিটি মসজিদে মাদ্রাসা গঠন করে শিক্ষাদান করার জন্য। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কারণে তিনি একটি কুতুবখানা নির্মাণ করেছিলেন। শ্রীরঙ্গপত্তনমে তাঁর লাল মহল প্রাসাদের কাছেই ছিল এই সুবিশাল গ্রন্থাগার। অন্তত ২০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ ছিল সেই কুতুবখানায়। শোনা যায়, বিজাপুর, গোলকোন্ডা, চিতোর, সাভানুর, কাডাপা-র মতো নানা জায়গা থেকে তিনি নানা ধরনের পাণ্ডুলিপি আনিয়ে নিজের সংগ্রহে যোগ করতেন। এমনকী ইউরোপ থেকেও তিনি প্রচুর আনিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর সংগ্রহে কন্নড়, মারাঠী, তেলুগুর মতো ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি ফার্সি, আরবী, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার বহু পাণ্ডুলিপি ছিল। 

জানা যায়, প্রাসাদের মধ্যে টিপুর নিজস্ব একটি গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে রাখা ছিল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখিত বহু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি। প্রতি রাতে শুতে যাওয়ার আগে, বেশ কিছু ক্ষণ বই পড়তেন। এমনকী দুপুরে ও রাতে খাবার সময়ে তাঁকে বই পড়ে শোনানোর বন্দোবস্ত ছিল। টিপু নিজে একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফার ছিলেন, ৪৫টি বই পাওয়া গিয়েছে যেগুলিতে তিনি নিজে ক্যালিগ্রাফি করেছিলেন বা তাঁর তত্ত্বাবধানে ক্যালিগ্রাফির কাজ হয়েছিল।  

১৭৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ইউরোপ থেকে একটি বই আনিয়েছিলেন, যার মধ্যে মূলত থার্মোমিটার সংক্রান্ত তথ্য ছিল। তিনি সেই বইটি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর সংগ্রহে ধর্ম, রাজনীতি এবং আরও নানা বিষয় সংক্রান্ত বই ছিল। টিপুর ব্যক্তিগত সংগ্রহে যে বইগুলি যোগ করা হত, সেগুলি চামড়া দিয়ে বাঁধানো হত। কিছু বইয়ের বাঁধাইয়ে রত্ন-খচিত কারুকাজও দেখা যায়। বই বাঁধাই করানোর জন্য তিনি আলাদা দপ্তর গঠন করে সেখানে দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ করেছিলেন। 

যে বইগুলি তিনি নিজে পড়তেন, সেগুলি তিনি নিজস্ব সীলের ছাপ দিয়ে চিহ্নিত করে রাখতেন। সীল-ছাপে হয় খোদাই করা থাকত, সুলতানাত-এ-খুদাদাদ (আল্লাহের দেওয়া সরকার), কিংবা টিপু সুলতানের স্বাক্ষর। বেশ কয়েকটি নবি মালিক নামের স্বাক্ষর-সহ সীল-ছাপ মিলেছে, যা ছিল টিপু সুলতানের অপর একটি নাম। তাঁর প্রতিটি সীল-ছাপ ছিল শৈল্পিক এবং অনন্য। টিপু তাঁর সংগ্রহের প্রতিটি বই নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন। কিছু বই তিনি একাধিক বার পড়েছেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়। তাঁর গ্রন্থাগারের অধিকাংশ বইতেই সীল-ছাপ মিলেছে, যা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, বই পড়তে তিনি কতটা ভালোবাসতেন।

ধর্মপ্রাণ টিপু সুলতানের সংগ্রহে পবিত্র কুরআনের ৪৪টি কপি ছিল। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল, সেটি হল মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ক্যালিগ্রাফি করা একটি কুরআন টিপু নিজের সংগ্রহে যোগ করেছিলেন। বর্তমানে এই কুরআনটি রাখা রয়েছে ব্রিটেনের উইন্ডসর ক্যাসেলের ব্রিটিশ রয়্যাল লাইব্রেরিতে। এছাড়াও তাঁর সংগ্রহে অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহের মধ্যে অন্যতম ছিল, মহাভারতের পার্সি অনুবাদ। মুঘল সম্রাট আকরের নির্দেশে, আবুল ফজলের তত্ত্বাবধানে এই অনুবাদটি করা হয়েছিল। 

১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে টিপুর মৃত্যুর পরে তাঁর অন্যান্য মূল্যবান জিনিসের পাশাপাশি কুতুবখানার বহু বই-ও লুণ্ঠন করেছিল ইংরেজরা। লুণ্ঠিত বইয়ের অধিকাংশই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লন্ডনের এশিয়াটিক সোসাইটি-তে। কিছু রাখা হয়েছিল তৎকালীন বম্বে, মাদ্রাজ, কলকাতায় অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গ্রন্থাগারে। ঔরঙ্গজেবের যে কুরআন টিপুর সংগ্রহে ছিল, সেটিও লুণ্ঠন করা হয়েছিল ও লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লন্ডনের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে টিপুর সংগ্রহের ৬০০টির বেশি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে টিপুর গ্রন্থাগার থেকে লুণ্ঠিত ৯৪টি দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি রাখা রয়েছে।