শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

মানবকল্যাণে নিয়োজিত অনন্ত প্রাণ স্যার ফজলে হাসান আবেদ

বিশ্ব Tamalika Basu ১৬-জানু.-২০২০
Sir Fazle Hasan Abed

বন্দুকের নলে বিপ্লবের উৎস নয়, হতদরিদ্র তৃণমূল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যে আসল উন্নয়ন ও বিপ্লবের জোয়ার বিশ্বে তার প্রমাণ রেখে গিয়েছেন বাংলাদেশের স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তাঁর এক জন্মদিনে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ও এর বাইরে লাখ লাখ মানুষকে নিজস্ব কাজের মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি ও মর্যাদা পেতে আপনি সাহায্য করেছেন। উন্নয়ন সম্পর্কে আমরা যা ভাবি, আপনি সে কাজটিই করেছেন বৈপ্লবিকভাবে।”

যে কজন বাংলাদেশি তাদের কর্মগুণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, ফজলে হাসান আবেদ তাদের একজন। ১৯৭২ সালে তার হাত ধরে যাত্রা শুরু করা ব্র্যাক এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও। ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ফজলে হাসান আবেদ।

১৯৫২ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে না পড়ে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। তখন তার ছোট চাচা সায়ীদুল হাসান ছিলেন লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের বাণিজ্য সচিব। তিনি আবেদকে স্কটল্যান্ডে গিয়ে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হতে বলেন। ১৯৫৪ সালে আবেদ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন। কিন্তু দুই বছর লেখাপড়া করার পরে তিনি এ বিষয়ে পড়া বাদ দিয়ে লন্ডনে গিয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে ‘কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টিং’-এর ওপর তিনি প্রফেশনাল কোর্স করেন ।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমশ দানা বাধতে শুরু করছিল। অপেক্ষা ছিল কেবল কালবৈশাখী ঝড়ের। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে, ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল।

পাহাড়সমান ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ হারালো ৫ লক্ষ মানুষ। সেই ঘটনাটিই বদলে দিয়েছিল স্যার ফজলে হাসানের জীবন। সেসময়ে মোটা অঙ্কের টাকার চাকরি ছিল তার। সেটা করতে করতেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করার প্রথম সিঁড়িটা পার করেছিলেন। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ‘হেল্প’ নামের একটি সংগঠন করে নিজেদের অর্থায়নে শুরু করেছিলেন ত্রাণ বিতরণ। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মনপুরা দ্বীপের অধিবাসীদের ঘরে ঘরে গিয়ে সাধ্যমতো ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। সেই যে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তখন থেকেই শুরু হলো নতুন এক যাত্রা। দারিদ্র্য বিমোচনের লড়াই, আর এই লড়াইয়ের নায়ক স্যার ফজলে হাসান আবেদ। বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক  পরিকাঠামোর সফল রূপকার।

শিক্ষাজীবন শেষে ফজলে হাসান আবেদ ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লন্ডন, কানাডা ও আমেরিকায় চাকরি করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭০ সালে আবেদ শেল অয়েল কোম্পানির চট্টগ্রাম অফিসে যোগ দেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পান। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আর দেশে থাকেননি। অস্ত্র হাতে নিজে দেশের জন্য কতটা করতে পারবেন, তা নিয়ে তার সংশয় ছিল। তাই চলে গেলেন ইংল্যান্ডে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরলেন, শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত তৈরি করতে, তহবিল সংগঠন করতে। করতেও পেরেছিলেন। বেশ সফলও হয়েছিলেন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে লন্ডনে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। ভেবেছিলেন, টাকার কমতি হতে পারে। কিন্তু যখন দেখলেন, মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হলো, টাকাগুলোও রয়ে গেল; তখন দেশে ফিরে এলেন।

ঝূর্ণিঝড়ের পুনর্বাসন কার্যক্রম চালাতে গিয়েই টের পেয়েছিলেন, শুধুমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে মানুষের জীবন বদলানো যাবে না। এর চেয়ে কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটিয়ে, তাদের মাধ্যমেই তাদের নিজেদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব, যা হবে টেকসই এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ফলপ্রসূ। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটাকে মেরামত করার কাজে নেমে পড়লেন তিনি। শুরুটা করেছিলেন সুনামগঞ্জের শাল্লা থানায়। এটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এর পিছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, এই এলাকার বেশিরভাগ লোকই ভারতে শরণার্থী হিসেবে ছিল। যখন ফিরলো, তাদের কিছুই ছিল না। আর দ্বিতীয়ত, এখানে সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর সুযোগ অনেক কম ছিল; বিশেষত খুব কঠিন ছিল।

স্বাধীন বংলাদেশে এটাই ছিল ব্র্যাকের প্রথম প্রকল্প। পরবর্তীতে অক্সফাম লন্ডনের হাত ধরে অর্থ পাওয়া এবং প্রকল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ব্র্যাকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ডায়রিয়ায় দেশব্যাপী খাবার স্যালাইন তৈরি করার বিষয় নিয়ে। মূলত এটা দিয়েই দেশব্যাপী, এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত পায় ব্র্যাক। এখানেই এগিয়ে যায় সংস্থাটি। ১০ বছর ধরে ১ কোটি ৩ লাখ পরিবারের সাথে কাজ করতে গিয়ে সংস্থাটি টের পায়, চাইলেই অন্য কোনো কর্মসূচি নিয়েও তারা পুরো বাংলাদেশের কাছে খুব সহজেই পৌঁছতে পারবে।

বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে স্যার ফজলে হাসান আবেদ শুরু থেকেই শিকড়ের মানুষ, মাটির মানুষ হয়ে কাজ করেছেন সবার সাথে। ঘুরেছেন পথে পথে। খুব কাছ থেকে দেখতে চেয়েছেন দেশের সমস্যাগুলো কীভাবে ৪-৫ বছরের বাচ্চা মেয়েগুলো তাদের চেয়ে ছোট ভাইদের কোলে নিয়ে ঘুরছে, কীভাবে মাকে গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করছে। অথচ, সেই বাচ্চা মেয়ের ২-৩ বছরের বড় ভাইগুলো কীভাবে খেলে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ, মেয়েরা যে খুব ছোট থেকেই পারিবারিক রীতিগুলো বুঝতে পারে, বাড়ির কাজগুলো গোছাতে পারে; এমনকি অভাবের সময়েও যে নারী কোনো না কোনোভাবে পরিবারের সবার মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে তা তিনি টের পাচ্ছিলেন। উন্নয়নখাতে যাকে বলা হচ্ছে ‘ম্যানেজমেন্ট অব পোভার্টি’। স্যার ফজলে হাসান আবেদের মনে হয়েছিল এই নারীদের মাধ্যমেই কাজটি আরও সহজ হতে পারে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এদেশের নারীরা সুশৃঙ্খল, সঞ্চয়ী এবং পারিবারিক। যেহেতু দারিদ্র্যের ভোগান্তিটা নারীরাই বেশি টের পেয়ে থাকেন, তাই তাদের মাধ্যমেই দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করলেন তিনি।

পরবর্তীতে শিশু ও নারীর স্বাস্থ্য, গর্ভবতী নারীদের সচেতন করা তোলা, শিশুমৃত্যুর হার কমানো প্রভৃতি সম্পর্কে একের পর এক সফল প্রকল্প বাস্তবায়িত করেছে স্যার আবেদের সংস্থা। ৪০ লাখ কন্যা সন্তানসহ মোট ৭০ লাখ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের কাজ করেছে ব্র্যাক। রয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, যারা পুরো দেশব্যাপী গবেষণায় প্রথমসারিতে। এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র; সব ধরনের পর্যায়ে স্যার ফজলে হাসান আবেদ কাজ করেছেন।