মানবদেহের অসংখ্য রোগ প্রতিরোধে উপকারী গমগাছের রস

স্বাস্থ্যকর খাদ্য Contributor
সুস্বাদু
উপকারী গমগাছের রস
© Elena Moskalenko | Dreamstime.com

মানবদেহের অসংখ্য রোগ প্রতিরোধে উপকারী গমগাছের রস, একথা শুনে আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন। কিন্তু শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে যারা চর্চা করেন, তাঁদের কাছে গমগাছের রসের উপকারিতা অজানা নয়! বর্তমানে অনেক ডাক্তারই রোগ প্রতিরোধে কচি গমগাছের টাটকা রস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। আজকাল সুপারমার্কেট বা নামীদামী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও প্রায়শই চোখে পড়ে টাটকা কচি গমগাছ বা ‘হুইটগ্রাস’। কিন্তু কী এই গমগাছ? এর উপকারিতাই বা কী? আজকের আলোচনায় আমরা মানবদেহের রোগের প্রতিরোধে কীভাবে উপকারী গমগাছের রস, তা নিয়ে আলোচনা করব।

কচি গমগাছ বা ‘হুইটগ্রাস’ কী?

সাধারণ গমগাছ বা ট্রিটিকাম অ্যাসেটিভাম-এর কল বেরনোর পর যে প্রথম পাতা গজায়, তাকেই হুইটগ্রাস বলে। প্রাচীন পারস্য ও ভারতীয় সভ্যতায় উৎসব, অনুষ্ঠানে গমগাছকে কাজে লাগানো হত। তবে কচি গমগাছ খাওয়ার উপকারিতার কথা তখনও পর্যন্ত অজানাই ছিল মানুষের। ১৯৩০ সাল নাগাদ আমেরিকান কৃষিবিদ চার্লস শ্ন্যাবেলের গবেষণায় গমগাছের উপকারিতার কথা জানা যায়। এরপরেই আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য দেশগুলিতে পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে গমগাছের রস খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়।

কী জন্য উপকারী গমগাছের রস?

কচি গমগাছের প্রভূত পুষ্টিগুণের জন্য আধুনিক নিউট্রিশনিস্টরা একে ‘সুপারফুড’ আখ্যা দিয়েছেন। ১ আউন্স বা ২৮ গ্রাম কচি গমগাছের রসে ৮৮০ মিলিগ্রাম প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিনের মধ্যে প্রায় ১৭ রকম অ্যামাইনো অ্যাসিড, যার মধ্যে মানবদেহের প্রয়োজনীয় ৮টি প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডই বিদ্যমান। পর্যাপ্ত পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবারের পাশাপাশি এতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন ই বা আলফা টোকোফেরল, ভিটামিন সি, এ, ভিটামিন বি যৌগ থাকে। এছাড়াও ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালশিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, জিঙ্ক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ ও সেলেনিয়ামের মতো খনিজ উপাদান থাকার কারণে নিয়ম করে কচি গমগাছের রস খেলে আপনি প্রভূত উপকার পেতে পারেন।

গমগাছ শরীর থেকে টক্সিন দূর করে

গমগাছে থাকা পরিপোষকগুলি শরীর থেকে নানারকম অশুদ্ধি এবং সঞ্চিত ক্ষতিকর টক্সিনগুলি বের করতে সহায়তা করে। এতে থাকা ক্লোরোফিল শরীরকে ডিটক্সিফাই করে এবং যকৃতের কার্যকারিতা বজায় রাখে। ফলে শরীর ঝরঝরে থাকে।

ক্যানসারকে দূরে রাখে

কচি গমগাছের রস ক্যানসার প্রতিরোধেও বিশেষ সহায়ক। ২০১৫ সালের এক সমীক্ষা অনুসারে গমগাছের মধ্যে অ্যান্টি-ক্যানসার কিছু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। ২০০৭ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির সময় গমগাছের রস দিলে তা শরীরে টক্সিনের মাত্রা দূর করে। এছাড়া কেমোথেরাপি জনিত বিষক্রিয়া কমাতেও এর জুড়ি নেই।

পরিপাকে সহায়তায় উপকারী গমগাছের রস

অল্প একটু খেলেই কি আপনার হজমের সমস্যা লেগেই থাকে? তাহলে কিন্তু কচি গমগাছের রস নিয়ম করে খাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। এতে প্রচুর পরিমাণে উৎসেচক থাকে যা খাবারের পরিপাকে এবং প্রয়োজনীয় পরিপোষকের শোষণে সাহায্য করে। ফলে খাবার দ্রুত হজম হয়। এছাড়া গমগাছের ডিটক্সিফাই করার ক্ষমতার ফলে গ্যাস, হজমের গোলমাল, পেটের অস্বস্তি, পেটখারাপ ইত্যাদি থেকেও মুক্তি মেলে।

ওজন কমাবে গমগাছের রস

রোজ সকালে উঠে খালিপেটে একগ্লাস করে গমগাছের রস খেলে তা মেটাবলিজমকে তরান্বিত করে। এবং এতে অতিরিক্ত ক্যালোরি বা ফ্যাট না থাকার কারণে দ্রুত ওজন কমাতেও উপকারী গমগাছের রস। ফলে যারা ডায়েট করছেন, তাঁরা নিয়ম করে একে খাদ্যতালিকায় রাখতেই পারেন। তাছাড়া গমগাছের রসে প্রচুর খাদ্য পরিপোষক ও ফাইবার থাকার কারণে আপনার পেটকে বেশিসময় ধরে ভর্তি রাখতেও এর জুড়ি নেই।

রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়

বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে, গমগাছের রস শরীরে খারাপ বা এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতেও বিশেষ উপকারী। গমগাছের রস নিয়ম করে খেলে তা ওজন কমানোর ফলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমায় এবং হৃদরোগের সম্ভাবনা হ্রাস করে। এছাড়া টাটকা গমগাছে থাকা ক্লোরোফিল দেহে রক্তকোষের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। রক্তকে শুদ্ধ করতে এবং শরীরে রক্ত চলাচল ঠিক রাখতেও উপকারী গমগাছের রস।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে উপকারী গমগাছের রস

রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গমগাছের রস বিশেষ সহায়ক। শরীরকে নানারকম ইনফেকশন ও রোগের থেকে দূরে রেখে আমাদের সুস্থ রাখে এটি। ফলে শরীরে এনার্জি থাকে ভরপুর। এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকার ফলে কোনও রোগ হলে সহজে সেটি থেকে সেরে ওঠাও সম্ভব হয়।

ডায়াবেটিস দূরে রাখে

আপনার যদি ডায়াবেটিস থেকে থাকে, তাহলে গমগাছের রস খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। কারণ গমগাছে থাকা বেশ কিছু যৌগের গঠন ইনসুলিনের প্রায় কাছাকাছি। ফলে নিয়ম করে গমগাছের রস খেলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া এটি খাবারের গ্লাইসিমিক ইনডেক্সের মাত্রা কমায়।

আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে কার্যকরী

কচি গমগাছের রসের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান আর্থ্রাইটিস জনিত কিছু প্রদাহের প্রশমন ঘটায়। সাধারণ ব্যথা, যন্ত্রণা, ফোলা, আড়ষ্টভাব কমাতেও এটি কাজে দেয়।

কীভাবে বানাবেন গমগাছের রস?

২৫০ গ্রাম কচি গমগাছ, সৈন্ধব লবণ, পাতিলেবুর রস পরিমাণ মতো

কচি গমগাছ আগে পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে নিন। হলুদ পাতা থাকলে সেগুলিকে ফেলে দিন। তারপর ব্লেন্ডারে সেগুলিকে রস করে নিন। এরপর ছেঁকে নিয়ে প্রয়োজন মতো পানি মিশিয়ে তাতে সৈন্ধব লবণ, লেবুর রস ইত্যাদি মিশিয়ে নিলেই তৈরি গমগাছের রস। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালিপেটে নাস্তা করার আধঘণ্টা আগে খেয়ে নেবেন।

মাথায় রাখুন

তবে গমগাছ দোকান থেকে কেনার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। সবসময় নিজের চেনা ও বিশ্বস্ত দোকান থেকেই গমগাছ কিনুন। যেহেতু এটি কাঁচা খাওয়া হয়, ফলে নানারকম ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আপনার পেটে চলে যেতে পারে। তাই কেনার সময় খেয়াল করে দেখবেন যাতে গাছগুলি ঠিক করে পরিষ্কার করা থাকে। সুবিধা থাকলে বাড়িতেই গমগাছ লাগান। রস করার আগে এগুলিকে ভাল করে ধুয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। গমগাছের রস প্রথমেই একগাদা খেয়ে নিলে পেটখারাপ, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি হতে পারে। ফলে আগে অল্প খেয়ে দেখুন। তারপর আস্তে-আস্তে পরিমাণ বাড়ান। নিয়ম করে খেলে দেখবেন কীভাবে উপকারী গমগাছের রস আপনার সমস্ত রোগ-ব্যাধি দূর করে আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করছে।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.