SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মানবিক দুর্বলতা দুরীকরণে ইসলামের শিক্ষা (১ম পর্ব)

আকীদাহ ২৩ জানু. ২০২১
মতামত
মানবিক দুর্বলতা

মানুষের অভ্যন্তরে এমন কতগুলি দোষত্রুটি ও দুর্বলতা আছে যেগুলি মানুষের ভিত্তিমূলকে ধ্বসিয়ে না দিলেও নিজের গাফিলতির কারণে এগুলি অন্তরের ভিতর লালিত হতে থাকলে তা ধ্বংসকর প্রমাণিত হয়। এ সকল ত্রুটির মাধ্যমে শয়তান সৎকাজের পথ রোধ করে এবং মানবিক প্রচেষ্টাকে ভালোর থেকে খারাপের দিকে নিয়ে যায় এবং সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এ কারণে এ সকল ত্রুটির উৎস এবং সেগসমস্ত মানবিক দুর্বলতা সংশোধনে ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল।

আত্মপূজা

মানুষের মানবিক দুর্বলতা সমূহের মধ্যে সবচাইতে বড় আত্মিক রোগটি হচ্ছে আত্মপূজা। এই প্রেরণাটি নির্দিষ্ট একটি পর্যায় পর্যন্ত দোষণীয় নয়; বরং নিজের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে এটি যথেষ্ট উপকারী। আল্লাহ তা’আলাও মানুষের প্রকৃতির মধ্যে তার কল্যাণের জন্যই এই প্রেরণাটি উজ্জীবিত রেখেছেন। এর ফলে সে নিজের সংরক্ষণ, কল্যাণ ও উন্নতির জন্যে প্রচেষ্টা চালাতে পারে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় যখন এ প্রেরণা আত্মপূজা ও আত্মকেন্দ্রীকতায় রুপান্তরিত হয় তখন তা ভালোর পরিবর্তে মন্দের উৎসে পরিণত হয়। এরপর এর অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে এক এক করে নতুন নতুন ত্রুটির জন্ম হতে থাকে।

আত্মপ্রীতির মানবিক দুর্বলতা

মানুষ যখন নিজেকে দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত এবং সমস্ত গুণের আধার মনে করে নিজের দুর্বলতার অনুভূতিকে ঢেকে দেয় এবং নিজের প্রতিটি দোষত্রুটির ভাল ব্যাখ্যা করে নিজেকে সর্বদিক দিয়ে উত্তম মনে করে, তখনই আত্মপ্রীতির চেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আত্মপ্রীতি প্রথম পদক্ষেপই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশোধন ও উন্নতির পথ বন্ধ করে দেয়।

অতঃপর যখন নিজের উত্তমের অনুভূতি নিয়ে মানুষ সামাজ জীবনে প্রবেশ করে তখন সে নিজেকে যা মনে করে রেখেছে অন্যরাও তাকে তাই মনে করুক এ আকাঙ্খা তার মনে জাগে। সে কেবল প্রশংসা শুনতে চায়। কারও পক্ষ থেকে সমালোচনা তা পছন্দ হয় না। তার নিজের কল্যাণার্থে যেকোনো উপদেশবাণীও তাকে পীড়িত করে। এভাবে এ ব্যক্তি নিজের সংশোধনের আভ্যন্তরীণ উপায়-উপকরণের সাথে সাথে বাইরের উপায়-উপকরণের পথও রোধ করে দেয়।

হিংসা-বিদ্বেষের মানবিক দুর্বলতা

আত্মপূজার দ্বিতীয় প্রকাশ হয় হিংসা ও বিদ্বেষের রুপে। আত্মপূজার আত্মপ্রীতিতে যে ব্যক্তি আঘাত হানে তার বিরুদ্ধেই মানুষ এ হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। ইসলামী শরীয়ত এই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সাবধান! হিংসা করো না। কারণ হিংসা মানুষের সৎকর্মগুলিকে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলে যেমন আগুন শুকনো কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।”

হাদীসে বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কঠোর নির্দেশ উদ্ধৃত হয়েছে, “তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পরকে হিংসা করো না, পরস্পরের সাথে কথা বলা বন্ধ করো না, কোনো মুসলমানের জন্যে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশী সম্পর্ক ছিন্ন অবস্থায় থাকা বৈধ নয়।”

কু-ধারণার মানবিক দুর্বলতা

আত্মপূজার আরেকটি প্রকাশক হল কু-ধারণার। কু-ধারণা সৃষ্টি হবার পর মানুষ গোয়েন্দা মনোবৃত্তি নিয়ে অন্যের দোষ-ত্রুটির সন্ধান করতে থাকে। কু-ধারণার তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষ নিজের ছাড়া অন্য সবার সম্পর্কে এ প্রাথমিক ধারণা রাখে যে, তারা সকলেই খারাপ। এবং সে বাহ্যতদৃষ্টিতে তাদের যে সমস্ত বিষয় আপত্তিকর দেখা যায় সেগুলোর কোনো ভালো ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে সর্বদা খারাপ ব্যাখ্যা করে থাকে।

মানুষ কারও সম্পর্কে প্রথমে কোনো খারাপ ধারণা করে। তারপর এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহের জন্যে ঐ ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিতে থাকে। কুরআনে এ দু’টি বস্তুকেই গুনাহ গণ্য করেছে। সূরায়ে হুজরাতে আল্লাহ বলেছেন,

“তোমরা অন্যের ব্যাপারে খুব বেশি ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ কোনো কোনো ধারণা গোনাহের পর্যায়ভূক্ত, আর অন্যের দোষ অনুসন্ধানে গোয়েন্দাগিরি করো না।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “সাবধান! কু-ধারণা করো না, কারণ কু-ধারণা মারাত্মক মিথ্যা।”

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাযিঃ) বর্ণনা করেছেন, “আমাদেরকে অন্যের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করতে ও অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমাদের সামনে কারও কোনো কথা প্রকাশ হয়ে গেলে আমরা পাকড়াও করবো।”

হযরত মু’আবিয়া(রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “তোমরা মুসলমানদের গোপন অবস্থার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে থাকলে তাদেরকে বিগড়িয়ে দেবে।”

চোগলখোরী

হিংসা-বিদ্বেষ ও কুধারণা যে আগুন জ্বালায় চোগলখোরী তাকে বিস্তৃত করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। স্বার্থবাদীতার প্রেরণাই হয় এর মধ্যে আসল কার্যকর শক্তি। চোগলখোর ব্যক্তি কারও কল্যাণকামী হতে পারে না। সে দুজনেরই বন্ধু সাজে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের অমঙ্গল চায়। তাই সে মনোযোগ দিয়ে দু’জনের কথা শুনে, কারও প্রতিবাদ করে না। কিন্তু তারপরই অপর বন্ধুর নিকট তা পৌঁছিয়ে দেয়। এভাবে সে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। ইসলামী শরীয়ত এ কাজটিকে সম্পূর্নরূপে হারাম গণ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোনো চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

তিনি আরও বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি হচ্ছে সবচাইতে নিকৃষ্ট যার দু’টি মুখ। সে এক দলের নিকট একটি মুখ নিয়ে আসে আর অন্য দলের নিকট আসে অন্য মুখটি নিয়ে।”

এ ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে, কোথাও কারও গীবত শুনলে সেখানেই তার প্রতিবাদ করতে হবে অথবা উভয়ের উপস্থিতিতে পরবর্তীতে বিষয়টির অবতারণা করে এমনভাবে এর নিষ্পত্তি করতে হবে যাতে করে এক পক্ষ এমন কোনো ধারণা করার সুযোগ না পায় যে, তার অনুপস্থিতিতে অন্য পক্ষ তার নিন্দা করেছিল। আর যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান কোনো দোষের জন্য গীবত করা হয়ে থাকে তাহলে একদিকে গীবতকারীকে তার গোনাহ সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে এবং অন্যদিকে ঐ ব্যক্তিকে দোষ সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে হবে।

(চলবে)