মানসিক সুস্বাস্থ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি

Mental Health

আমাদের সামাজিক জীবন, বুদ্ধি-বিবেচনা এবং আবেগের সমস্তটাই আবর্তিত হয় একটি মাত্র উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে – আল্লাহের কাজ করা। যারা তাঁর প্রতি আস্থা রাখেন, তাদের আল্লাহ জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রদান করেন, এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেখান। কিন্তু বাকিরা পৃথিবীর বুকে কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই দিশাহীন ভাবে ঘুরে বেড়ায়। আল্লাহ তাঁর পথ দেখিয়েছেন কুরআন এবং সুন্নাহ-এর মধ্যে দিয়ে। এই দুটি উৎসের মধ্যে সব ধরনের পরামর্শ, উৎসাহ এবং পথনির্দেশ রয়েছে, যা মেনে চললে যে কোনও ব্যক্তি একটি যথার্থ পরিপূর্ণ জীবন পেতে পারে।

সমস্যা হয় যখন আমরা জীবনের প্রকৃতি বুঝতে ভুল করি। আজ যিনি রাস্তায় হাঁটছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করছেন, বা চারপাশের নানা ধরনের কথোপকথন শুনেছেন, তিনি ভাবতে পারেন যে এই পৃথিবীতে আমাদের উদ্দেশ্য হল, যতটা সম্ভব আনন্দ এবং তৃপ্তি অর্জন করা। সেই কারণে আমরা বিলাসবহুল ছুটিতে যাওয়া, বা নিজের স্বপ্নের বাড়িটি কেনার জন্য যথেষ্ট অর্থ, বা নিখুঁত সন্তান লাভ করলে আমরা নিজেকে সুখী বলে মনে করি।

কিন্তু আসল কথা হল, জীবন নিখুঁত নয়। কিন্তু এই সরল সত্যটি আমরা সহজে মেনে নিতে পারি না বা স্বীকার করতে চাই না। ফলে জীবন যখনই কঠিন রূপ ধারণ করে, তখনই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে নেতিবাচকভাবে প্রভাব পড়তে শুরু করে।

জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হল, আমাদের পরীক্ষা করে। তাই কখনও আনন্দ, কখনও মন ভাঙা, কখনও আবার সাফল্য, হতাশা, ক্ষতি এবং আনন্দ চক্রাকারে আমাদের জীবনে আসে। যখনই জীবন কঠিন রূপ ধারণ করবে, তখনই বুঝতে হবে যে আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন। এবং তখন আমাদের কর্তব্য হল, সেই পরীক্ষায় উপযুক্ত ভাবে উত্তীর্ণ হওয়া। তাই জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়লে, সর্বদা পাঁচটি কথা মনে রাখবেন।

১. নিজের উপর থেকে আস্থা হারাবেন না

প্রায়শই আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। আমরা মনে করি যে, আমাদের সমস্যাগুলি খুবই ধ্বংসাত্মক, এর চেয়ে বড় এবং জটিল আর কিছু নেই। প্রত্যেক দিন, আমাদের আরও বেশি কষ্ট হয় এবং এই কষ্টের কারণে আমরা নিজেদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলি।

মুসলমান হিসাবে, আমরা বিশ্বাস করি যে মানসিক, শারীরিক বা আধ্যাত্মিক এই সংগ্রাম কাটিয়ে ওঠার সহজাত ক্ষমতা আমাদের আছে। নিজেদের কখনওই জীবনযুদ্ধে পরাজিত বলে ভাবা উচিত নয়। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের যতটা শক্তিশালী ভাবি, আমরা আসলে তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আল্লাহ জানেন যে, আমরা খারাপ সময় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম, এবং আমাদের জীবনে কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা এলে আমাদেরও অবশ্যই সেই বিশ্বাস রাখতে হবে।

২. সংগ্রামের মূল্য

এই পৃথিবীতে যত জন নবী ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেই মনোকষ্ট, অশান্তি ও অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবুও তাঁদের হৃদয়, চরিত্র এবং কর্ম সর্বদা সৎ ছিল, কখনও তাঁরা আল্লাহের পথ থেকে সরে আসেননি। তাঁরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন, আবার একই সময়ে সবচেয়ে বেশি সফলও হয়েছিলেন।

আমাদের এই সংগ্রাম মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। আমরা যে কষ্ট সহ্য করছি, তা কখনও কখনও এমন উপহার হতে পারে যা আমাদের আল্লাহের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে, আমাদের মধ্যে অনেকে তাঁর বিশ্বাসের প্রতি অবহেলা করতে ও অকৃতজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নানা যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তে, আমরা বুঝতে শুরু করি যে আল্লাহ সত্যই আমাদের দেখভাল করেন, পরিচালনা করেন ও সুরক্ষা দেন।

৩. কষ্ট আসলে সুদিনের বার্তাবাহী

আমরা কুরআনের প্রতিটি সূরা থেকে যে নীতিটি পাই তা হ’ল, সুদিন আসার আগে সর্বদা কঠিন সময় আসে। সাধারণত আমরা যখন ভাবতে শুরু করি, এরচেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না, ঠিক সেই সময় থেকেই আমরা লক্ষ্য করতে শুরু করি যে পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। যদি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আপনার পক্ষে আরও কঠিন হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে সুদিন আসার জন্য আর একটু বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে – কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দেবেন না।

৪. সুদিন আসবেই

দুর্ভোগ কখনও চিরকাল স্থায়ী হয় না। সুদিন অবশ্যই আসে, বিশেষ করে যাঁরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার সচেতন প্রচেষ্টা করে এবং তাঁকে অসন্তুষ্ট করতে পারে এমন যে কোনও বিষয় থেকে দূরে থাকে, আল্লাহ সর্বদা তাঁর পাশে থাকেন।

৫. সাহায্য প্রার্থনা করুন

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে, নিকটবর্তী কাউন্সেলর এবং সাইকিয়াট্রিস্টদের কাছ থেকে সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে যা আপনাকে এই বেদনা থেকে মুক্ত করতে এবং আশার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

সব শেষ বলব, আমরা এমন একটি বিশ্বে বাস করি যা মূলত আমাদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং অনুশীলনের বিরোধী, এবং এটি আমাদের পরিচয়বোধকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আমরা যদি আমাদের ধর্ম এবং আমাদের চারপাশে থাকা প্রলোভনের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব অনুভব করতে শুরু করি, তাহলে এই দ্বন্দ্ব আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করতে পারে। আমাদের ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবনও মাঝে মাঝে অশান্তির কারণ হতে পারে। জীবন যখন খুব কঠিন হয়ে উঠবে তখন আমরা আল্লাহকে বার বার স্মরণ করে এই বোঝা হালকা করতে পারি।