শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

মানসিক সুস্বাস্থ্যে নজর দিতে হবে

Man with outstretched arms facing a beautiful sunset.

মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে মন, শরীর আর সমাজের এক মেলবন্ধনের নাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে মানুষের চারপাশের অবস্থা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চ্যালেঞ্জ আর কাজের ধকল কাটিয়ে সফলভাবে সমাজ এবং নিজের জন্য অবদান রাখতে পারে। বয়স, লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্রভৃতি নানাবিধ প্রভাবক মানসিক অসুস্থতাকে প্রভাবিত করে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার হার তুলনামূলক বেশি।

পরিসংখ্যান বলছে নগরে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বয়সের কোটায় মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার হার সবচেয়ে বেশি ১৮-২৯ বছর বয়সি তরুণদের মাঝে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৮-২৯ বছর বয়সি শহুরে তরুণদের মাঝে ৪৭.৫ শতাংশ নানা মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং গ্রামের তরুণদের মাঝে এ হার ৩৪.৮ শতাংশ। মানসিক সুস্বাস্থ্যের নানা সূচকে নারীদের অবস্থান বেশ পিছিয়ে। গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত নারীদের মধ্যে মানসিক অসুস্থতার হার ৪০.৭ শতাংশ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুসারে দেশে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মানসিক অসুস্থতার হার শতকরা ১৩.৬ ভাগ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ হার ১৬.৮ ভাগ। এদের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ মানসিক রোগে ভোগার পরেও কোনো প্রকার চিকিত্সা নেয় না। মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ২ কোটি। কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ না পাওয়া, ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অপব্যবহার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শহরায়নের প্রভাব প্রভৃতি কারণে মানসিক রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের ফলে দেশে তরুণদের সংখ্যাধিক্যের কারণে জনসংখ্যার বড়ো অংশ মানসিক সমস্যায় নিমজ্জিত রয়েছে।

শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্তদের বৃহদাংশ কারণে-অকারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকছে। মানসিক সমস্যায় ভোগা বাবা-মা তাদের সন্তানদের পড়াশোনা সংক্রান্ত খোঁজখবর রাখছেন না এবং সন্তানকে কোয়ালিটি সময় দিচ্ছেন না। যার ফলে সন্তানদের সুস্থ বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে না। রাস্তা-ঘাটে নারীদের নিরাপত্তার বাজে পরিবেশ এবং গৃহস্থালি নারী নির্যাতনের কারণে বড়ো অংশের নারীরা মানসিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগের মধ্যে মানসিক রোগের ঝুঁকি দিনে দিনে বাড়ছে। মানসিক রোগের কারণে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। তরুণদের অকাল মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। শুধু আত্মহত্যাই নয়, মানসিক রোগের কারণে তরুণ নাগরিকদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, অস্থিরতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, মূল্যবোধহীনতার এক বিষম সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৪ সূচকে বলা হয়েছে অসংক্রামক রোগের কারণে অকাল মৃত্যুকে এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে হবে এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।

ক্রমবর্ধমান মানসিক রোগের সমস্যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান বাধা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ অ্যাটলাস অনুযায়ী যেখানে বিশ্বে প্রতি ১ লাখ নাগরিকের বিপরীতে ৯ জন মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে সেখানে বাংলাদেশে ২ লাখে মাত্র একজন মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে। মানসিক অসুস্থতা ঠেকানোর সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার সুচিন্তায় দক্ষতা অর্জন করা। মানসিক স্বাস্থ্যে যে যতটা যত্মবান মানসিক চাপকে দূরে ফেলে দিয়ে সে ততটাই সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। একজন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের পক্ষেই সম্ভব পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখা। মানসিক রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সম্মিলিত উদ্যোগের। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। মানসিক রোগের অনুসর্গ এবং উপসর্গ সম্পর্কে প্রত্যেক নাগরিককে যথাযথভাবে অবহিত করতে হবে। শিশুদেরকে সুচিন্তায় দক্ষ করে তুলতে হবে। মানসিক রোগ নিয়ে প্রচলিত স্টিগমা দূর করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা কারিকুলামে আত্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলেই নেতিবাচকতা দূরে ঠেলে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানসিক অসুস্থতা থেকে বেঁচে পুরোপুরি সুস্থ জাতি গড়ে উঠতে পারবে।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন